ভাষার শাসন

মাছুম আহমেদ
DUL_0115

ইদানীং বলতে শোনা যায়, ইংরেজী শেখার চেয়েও ম্যান্ডারিন শেখা বেশি দরকার। কেননা চীন হবে সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ। তাদের সঙ্গেই আমাদের আগামী ব্যবসা-বাণিজ্য সবচেয়ে বেশি হবে। এমনকি শিক্ষায়ও চীনের প্রাধান্য হবে অধিক। অর্থাৎ অর্থনীতি ক্ষেত্রে শাসক হতে যাচ্ছে চীন। সেক্ষেত্রে শাসকের ভাষাও হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা। মায়ের মতই এ ভাষা আমাদের কাছে আপন। মায়ের প্রসব বেদনার অতি কষ্টের অনুভূতি যেমন আমাদের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তেমনি আরেক বেদনার রঙ এসে মিশেছে আমাদের মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার অর্জনের আতুরঘরে। কিন’ প্রাণের সেই ভাষা কতটা শক্তভাবে দাঁড়াতে পারছে?
একটি ভাষা তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে যখন সেই ভাষার দেশটি অর্থনৈতিকভাবে
সমৃদ্ধশালী হয়। শিল্প-সাহিত্য এবং বিজ্ঞানচর্চার শক্ত ভিত্তি ও বিকাশের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে ভাষার শক্তি। একটি দেশ যখন অর্থনীতিতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে তখন দাসত্বের শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। তবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দরকার মেধার শক্তিও, অন্যথায় চিন্তার দাসত্ব বরণ ছাড়া বিকল্প থাকে না।
আমরা অর্থনৈতিকভাবে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি- এ কথা সত্য, তবে মেধায় কতটা এগুচ্ছি? আমাদের শিল্প-সাহিত্য, আবিষ্কার বিশ্বসভায় কতটা শাসন করতে পারছে? আমাদের কয়টা গ্রন’ সারা বিশ্বের জ্ঞান দুয়ারের কড়া নাড়তে পারছে? জ্ঞানরাজ্যে তোলপাড় করার মত কয়টি প্রবন্ধ আমাদের রয়েছে? এ প্রশ্নগুলোর হ্যাঁ-সূচক উত্তর যেসব দেশে রয়েছে তারাই তো বিশ্ব শাসনের আসনে বসে আছে। তাঁদের ভাষা শেখার জন্যই আমাদের যত প্রচেষ্টা। কারণ শাসকের ভাষা মানে তো শাসনেরও স্বাদ! কিন’ আমাদের ইতিহাস তো এ দর্শনের বিপরীত। আমরা শাসকের চাপিয়ে দেওয়া ভাষা প্রত্যাখ্যান করে ভাষার স্বাধীনতা অর্জন করেছি। তবে, সেই অর্জন, সেই স্বাধীনতা নিয়ে আমাদের সামর্থ্যের জায়গাটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারিনি।
সেই ভিত্তির জন্য চাই মেধার শাসন, জ্ঞানের শাসন।
আমাদের দরকার গবেষণাভিত্তিক উচ্চ শিক্ষা-ব্যবস’া। যেখানে বিজ্ঞানের আবিষ্কার আর মানবিক বোধ দুটোই আলোকিত হবে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই উন্মোচন ঘটবে। কিন’ বর্তমানে আমরা হয়ত এর উল্টো চর্চা করছি। বাণিজ্যের পথ খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার আর মানবিক শিক্ষাচর্চাকে অতি গৌণতায় স’াপন করছি। এ কারণেই হয়ত আমাদের কালোত্তীর্ণ শিল্প-সাহিত্য, বিশ্ব বদলানোর মতো বড় আবিষ্কার আলোর মুখ দেখছে না।
আমাদের মেধার ঘাটতি আছে- এ কথা বলা সঙ্গত হবে না। তবে, সেই মেধা কাজে লাগানোর পরিবেশ ও সুযোগ অর্থাৎ ব্যবস’ার ঘাটতি আছে সন্দেহ নেই। চর্চাহীন মেধা একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে। পরিবেশ ঘাটতি আর আশু বিনষ্টের আশংকায় মেধা পাচারও হয়ে যায়। দূরদৃষ্টির লোক সেই মেধা আমদানি করে বিশ্ব শাসনের জায়গাটা পোক্ত করে। এর নাম দেওয়া যেতে পারে রাজনীতি।
রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবেলা করতে হবে। এর জন্য মেধাভিত্তিক রাজনীতি দরকার। ভাষার শাসন প্রতিষ্ঠায় মেধাবিদের অবশ্যই রাজনীতিতে আসতে হবে। প্রজ্ঞাবানরা শাসক হতে না পারলে অন্যরা জ্ঞানই বা বুঝবে কী করে, মেধা বিকাশের সুযোগই বা নির্মাণ হবে কীভাবে!