ভাষাতাত্ত্বিক ও জাতীয়তাবাদী

আবু সাঈদ

ড. মুুহম্মদ শহীদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮৫ সালের ৯ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার পেয়ারা গ্রামে। তিনি ছিলেন একাধারে গবেষক, জ্ঞানতাপস, লোকসাহিত্যিক, অনুবাদক, ভাষাবিদ এবং সর্বোপরি বহুভাষাবিদ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের পাঠোদ্ধারসহ আলোচনা এবং বাংলা ধ্বনিবিজ্ঞান ও ভাষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং মৌলিক গবেষণা।
শিক্ষক হিসেবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য। তিনি প্রায় ১৮টি ভাষা জানতেন। ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘‘অর্ধডজন বড় বড় ভাষায় প্রবন্ধ লিখিতে, কথা বলিতে ও বই পড়িতে এবং প্রায় দেড়ডজন ভাষায় লিখিত পুস্তকাদি পাঠ করিয়া বুঝিতে ক্ষমতা অর্জন করিয়াছেন।” ভাষা শিক্ষা ছিল তাঁর কাছে খেলার সঙ্গীর মতো। তাঁর সাক্ষ্য অনুসারে, তাঁর বন্ধুরা যে সময় খেলাধুলা করে সময় পার করতেন তিনি সেসময় ভাষা শিক্ষায় মন দিতেন। নতুন নতুন ভাষা শেখার মধ্যে তিনি যে শুধু আনন্দ পেতেন তা নয়, এর পিছনে অবশ্য একটা দায়বোধও ছিল বলেও ধারণা করা যায়। মূলত অন্য ভাষা শিখে তিনি বাংলা ভাষার শক্তি ও ক্ষমতা এবং তার বৈজ্ঞানিকতা প্রমাণ করেছেন। যা পরবর্তীকালে শুধু ভাষাতত্ত্বে নয়, রাজনৈতিকভাবেও তিনি ব্যবহার করেছেন।
হাওড়ার মাইনর স্কুলে পড়ার সময় তিনি ইংরেজির সঙ্গে সংস্কৃত ভাষা নিয়েছিলেন। দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে সংস্কৃত নিয়ে মাত্র ১৯ বছর বয়সে এন্ট্রান্স পাস করেন। ১৯১০ সালে সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি,এ পাস করেন এবং ১৯১২ সালে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ পাস করেন। উল্লেখ্য যে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল তাঁর জন্যই তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগটি খোলা হয়।
১৯২৬ সাল থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত তিনি প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। সেখানে তিনি অপভ্রংশ ভাষা, তিব্বতী ও বাংলার বৌদ্ধধর্ম নিয়ে মৌলিক গবেষণা করেন। এসময় তিনি বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব নিয়েও গবেষণা করেন এবং ‘‘ লে শাঁ মিস্তক’’ নামক বইটি ফরাসি ভাষায় লিখে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৮ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। উল্লেখিত সময়ে তিনি উচ্চারণগত দিক থেকে বাংলা ধ্বনি বিশ্লেষণ করে ধ্বনিবিজ্ঞানেও ডিপ্লোমা নেন। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা শেখার প্রতি তাঁর যে আগ্রহ দেখা যায় তা প্রবাদতুল্য। প্যারি থেকে লিখিত একটি চিঠিতে তিনি জানাচ্ছেন, ‘‘আমাকে আমার ঞযবংরং উপলক্ষে বাঙলা ব্যতীত আসামী, ওড়িয়া, মৈথিলী, পূরবীয়া, হিন্দি, পাঞ্জাবী, গুজরাটী, মারাঠী, সিন্ধী, লাহিন্দা, কাশ্মিরী, নেপালী, সিংহলী ও মালদ্বীপি ভাষার আলোচনা করিতে হইতেছে। প্রাচীন ভাষার মধ্যে প্রাকৃত ও আবেস্তারও চর্চ্চা করিতেছি। বিরাট ব্যাপার সন্দেহ নাই কিন’ বিরাট কার্য্যের জন্য বিরাট আয়োজন চাই। তিব্বতীও শিখিতেছি।” ভারতীয় উপমহাদেশের এ ভাষাসমূহের সঙ্গে তিনি পরবর্তীকালে বাংলা ধ্বনিতাত্ত্বিক মেলবন্ধন করে তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন।
ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে ড. শহীদুল্লাহর উল্লেখযোগ্য বই ‘‘ বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত।’’ এ বইয়ে বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে ইতিহাস ভিত্তিক তাঁর ঐতিহাসিক মত ব্যক্ত হয়। এ বইয়ে তিনি প্রথম ঘোষণা করেন বাংলা ভাষা গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে জাত – ‘‘বাংলা গৌড়ী প্রাকৃতের পরবর্তী স্তর গৌড় অপভ্রংশ থেকে উদ্ভূত।” এর আগে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের মতকে প্রতিষ্ঠিত হিসেবে মনে করা হত।
আচার্য সুনীতিকুমার মনে করতেন, ‘‘ বাংলা ভাষা পূর্বমাগধী উড়িয়া ও আসামী ভাষার সহোদরা এবং এ তিনটি ভাষাই মাগধী প্রাকৃত থেকে উদ্ভূত।” বাংলা ব্যাকরণের ড. শহীদুল্লাহ বিজ্ঞানভিত্তিক বর্ণনা দেন। এ বিষয়ে ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ।” এ বইয়ে বাংলা ব্যাকরণকে তিনি ‘ধ্বনি প্রকরণ’’, ‘‘শব্দ প্রকরণ’’, ‘‘বাক্য প্রকরণ’’, ‘‘ছন্দ’’ এবং ‘‘অলংকার প্রকরণ’’-এ ভাগ করে বাংলা ভাষাকে ব্যাকরণভিত্তিক বর্ণনা করে ভাষাবিজ্ঞানে নতুন দ্বার উন্মোচন করেন।
ভাষাতত্ত্বের পরিধিতে তিনটি ধারা বিদ্যমান- প্রথমত তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব, দ্বিতীয়ত ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব এবং তৃতীয়ত বর্ণনাভিত্তিক ভাষাতত্ত্ব। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আগ্রহ এবং গবেষণার বিষয় ছিল তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে। ঐতিহাসিক বা বর্ণনামূলক ভাষাতাত্ত্বিকদের মতো তিনি একটি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেননি। তাঁর সময়টাও ছিল তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের। তবে ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বকে তিনি এড়িয়ে যাননি। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব ভারতে বিশেষভাবে চর্চিত এবং গুরুত্ব পায় স্যার উইলিয়াম জোন্স যখন আবিষ্কার করেন যে, গ্রীক, ল্যাটিনের সঙ্গে সংস্কৃত ভাষার আশ্চর্যভাবে ধ্বনিগত মিল রয়েছে। ড. শহীদুল্লাহ অন্যান্য ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার তুলনামূলক আলোচনা যেমন করেছেন তেমনি অনেক ‘‘লুপ্ত শব্দাবলী’’র পুনর্গঠনও করেছেন। এভাবে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত আঞ্চলিক বাংলা অভিধানে তিনি দেড় লক্ষাধিক শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করেন।
ভাষার প্রশ্নে এবং জাতিগতভাবে তিনি বাঙালির ঐক্যে আস’া রাখেন। এবং শব্দ বা ভাষাকে তিনি সামপ্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে স’ান দিতেন সবসময়। ‘‘পানি’’ বা ‘‘জল’’ শব্দের ব্যবহার এবং তার উৎপত্তি নিয়ে তিনি যে বক্তব্য দেন তা এ দুটি শব্দ নিয়ে যে বিরোধ তা মীমাংসিত হয়। তিনি বলেছেন,‘ ‘‘পানি’’ শব্দ এখন মুসলমানি বাংলা। কিন’ পালি প্রাকৃত অপভ্রংশ, প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সর্বত্র ইহার ব্যবহার ছিল।” শব্দ যে সমপ্রদায়গত নয়, বরং জাতিগত তা তিনি যেমন প্রমাণ করেছেন তেমনি ভাষার অসামপ্রদায়িকতার পক্ষেও সোচ্চার ছিলেন।
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই জিন্নাহ কর্তৃক উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার কয়েকমাস পরেই অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতির ভাষণে তিনি অবিলিত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘ আমরা হিন্দু এবং মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালী। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব সত্য। মা-প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছে যে তা মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-শাড়িতে ঢাকবার জোটি নেই।”
ভাষার যিনি শৃঙ্খলা মানতেন তাঁর পক্ষে ঐরকম অন্যায় মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। এ বক্তব্যে তিনি শুধু বাঙালির ভাষিক স্বতন্ত্রতার উপর জোর দেননি, একই সঙ্গে বাঙালির নৃতাত্ত্বিক স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের উপরও গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁর এ বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, ঐতিহাসিকভাবে আমরা প্রথমত বাঙালি তারপর হিন্দু বা মুসলমান। তিনি বিভিন্ন ভাষার বৈশিষ্ট্য শুধু উদঘাটন করেননি, আবিষ্কার করেছেন ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তিও। বাংলা ভাষার এ অন্তর্নিহিত শক্তির কথাই তিনি এ ভাষণে জোর দিয়ে প্রকাশ করেছেন যা পরবর্তীকালে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছে।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শিক্ষা, কর্ম ও পেশাগত জীবনে অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কিন’ সর্বাবস’ায় তিনি বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি এবং বঙালি চেতনায় উজ্জীবিত ছিলেন। তাঁর জীবনকালও অনেক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে কিন’ আদর্শের সঙ্গে তিনি আপোষ করেননি। ভাষার প্রশ্নে তাঁর ছিল দৃঢ় অবস’ান। কারণ ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি জানতেন বাঙালি জাতিসত্তার মূলে রযেছে বাংলা ভাষা। বাংলাভাষা এবং বাঙালিত্বের প্রশ্নে তাঁর যে আপোষহীনতা তা বাঙালির অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।