ভালোবাসারও উপলক্ষ থাকা চাই..

আশরাফুন নুর

আজ বিশ্ব ভালবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইনস ডে। প্রতি বছর সারা বিশ্বে ১৪ ফেব্রুয়ারি এই দিবসটি পালন করা হয়। বিশ্বে যতগুলো বিশেষ দিবস রয়েছে তার মধ্যে তরুণ-তরুণীদের কাছে এই দিনটি সবচেয়ে প্রিয়। সারা বিশ্বে এই দিনটিকে খুব আনন্দ, উৎসবের মধ্য দিয়েই পালন করা হয়ে থাকে। এইদিনে বিনোদন কেন্দ্রগুলো ভালোবাসার মানুষে ভরপুর থাকে, প্রিয়জনকে ফুল ও বিভিন্ন পছন্দের সামগ্রী উপহার দেওয়া হয়। দিনটিকে ঘিরে সারা বছর জুড়েই প্রেমিক-প্রেমিকারা কল্পনার জগৎ সাজাতে থাকে। ঋতুরাজ বসন্তের রেশ কাটতে না কাটতেই এই দিনটি আমাদের সামনে এসে পড়ে। সবাই চায় সব ব্যস্ততার পাশ কাটিয়ে এই দিবসে কিছুটা সময় তার প্রিয় মানুষের সথে কাটাতে। এ দিনটিকে ঘিরে তাদের মধ্যে নানা রকম উপহার, সাজসজ্জার প্রস’তি থাকে।
এই দিবসটি যুক্তরাষ্ট্র বা পাশ্চাত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল একসময়। তবে বর্তমানে বিশ্বব্যাপি আনন্দ-উৎসবের সাথে পালন করা হয়। আমাদের দেশেও একি সাথে আমরা পালন করে আসছি বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে। ৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে ভ্যালেন্টাইন ডে’র উদ্ভব হলেও এটি বিশ্বব্যাপি প্রথম দিকে খুব বেশি প্রচার ও প্রসার লাভ করেনি। যুক্তরাষ্ট্র তথা পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে জন্মদিনের উৎসব, ধর্মোৎসব সবক্ষেত্রেই ভোগের বিষয়টি হলো প্রধান। এমন কি গির্জার ভেতরেও মদ্যপানে তারা বিরত থাকে না। খ্রিস্টীয় চেতনা ভ্যালেন্টাইন দিবসের কারণে বিনষ্ট হওয়ার অভিযোগে ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার এ উৎসব নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এছাড়াও জার্মানি, অস্ট্রিয়ায়ও বিভিন্ন সময় এ দিবসটি জনগণ ও সরকারিভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। বর্তমান সময়ে এসে ভ্যালেন্টাইন্স দিবসের কদর বেড়েছে। বর্তমানে পাশ্চাত্যে এ উৎসব মহাসমারোহে উদযাপন করা হয়। তারা এই দিনে প্রায় কয়েক কোটি ডলার ব্যয় করে। ভালোবাসা দিবসের জন্য কার্ড, ফুল, চকোলেট ও অন্যান্য পছন্দের উপহার সামগ্রী ক্রয় করে।
এ ভালোবাসা দিবসের পেছনেও ইতিহাস আছে। এই ইতিহাস নিয়ে নানা মুনির নানা মতও রয়েছে। প্রাচীন রোমে ভ্যালেন্টাইন নামে একজন চিকিৎসক ছিলেন। অসুস’ মানুষের ওষুধ খেতে কষ্ট হয় বলে তিনি তেঁতো ওষুধ ওয়াইন, দুধ বা মধুতে মিশিয়ে খাওয়াতেন। এ চিকিৎসক খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। প্রাচীন রোমে খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাসীদের শাস্তি দেয়া হতো। একদিন রোমের এক কারা প্রধান তার অন্ধ মেয়েকে চিকিৎসার জন্য ভ্যালেন্টাইনের কাছে নিয়ে আসেন। ভ্যালেন্টাইন তার সাধ্যমতো মেয়েটিকে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন সময় হঠাৎ একদিন রোমান সৈন্যরা এসে ভ্যালেন্টাইনকে ধরে নিয়ে যায়। ভ্যালেন্টাইন বুঝে গিয়েছিলেন যে, তাকে মেরে ফেলা হবে একটি কারণে- খ্রিস্টান হওয়ার অপরাধে। ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি রোম সম্রাট ক্লডিয়াসের আদেশে ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তার আগে ভ্যালেন্টাইন অন্ধ মেয়েটিকে বিদায় জানিয়ে একটি চিরকুট লিখে রেখে গিয়েছিলেন। তাকে হত্যার পর কারা প্রধান চিরকুটটি দিয়েছিলেন মেয়েটিকে। তাতে লেখা ছিল-“ঋৎড়স ুড়ঁৎ ঠধষবহঃরহবচ (ইতি তোমার ভ্যালেন্টাইন)। ইতোমধ্যে ভ্যালেন্টাইনের চিকিৎসায় মেয়েটির অন্ধ দু’চোখে দৃষ্টি ফিরে এসেছিল। ভালোবাসার এ কীর্তির জন্য ৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে পোপ সেন্ট জেলাসিউস ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই থেকে এই দিনটিকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে হিসেবে পালন করে আসছে। ধীরে ধীরে তা সারা বিশ্বব্যাপি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমান বিশ্বের সব দেশেই এ দিবসটি খুব জাকজমকভাবে পালন করে। ভালোবাসা প্রকাশ করে প্রিয় মানুষদের সাথে। ভাল লাগা না লাগা নিয়ে অনেক কিছু শেয়ার করে এইদিনে। প্রিয় মানুষকে কাটায় এই দিনটি।
মা-বাবা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা যে কোন সম্পর্কের কথা বলি নাকে, সব কিছুর ভিত্তিই হল ভালোবাসা। ভালোবাসা মানে অন্যরকম একটি অনুভুতি যা শুধু হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়। কেবল ভালোবাসা আছে বলেই আমরা এখনো টিকে আছি এ পৃথিবীতে টিকে আছি। আমাদের মধ্যে প্রতিটি সম্পর্কই ভালোবাসা দিয়ে গড়া।
আমাদের দেশে বছরের অন্যান্য দিবসের মতো ভালোবাসা দিবসও জাকজমকপূর্ণভাবে পালন করে আসছে বেশ কয়েক বছর ধরে। অনেকে ভালোবাসা দিবসটিকে বাণিজ্যিক-বাহ্যিক মনে করে। আসলে এখানে ভালোবাসা দিবসটি উপলক্ষ মাত্র। এই উপলক্ষের কার্যাবলি সারা বছরব্যাপি থাকে- এটাই স্বাভাবিক। তাই ভালোবাসা দিবসকে আড় চোখে তাকানোর কোন কারণ নেই।
সারা বছরই মানুষ ভালোবেসে যায় অথচ তার একটা প্রতীকী দিন থাকবে না! উপলক্ষ থাকবে না! সবকিছুর উপলক্ষ বা প্রতীক থাকে। ভালোবাসার উপলক্ষও তো থাকা চাই। একটি দিন ভালোবাসার উপলক্ষ হলে ক্ষতি কী!