ভারতীয় লোকসভা নির্বাচন কী আছে মোদির ভাগ্যে?

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

.বাংলাদেশ, ভারত, পাকিসত্মত্মান আগে এক ও অভিন্ন ছিল। এখনও তিন দেশের মানুষ পরস্পর সম্পর্কে জানতে বুঝতে কম উৎসাহী নন। কোনও দেশে নির্বাচন হলে অন্য দু’দেশের মানুষ নিজ দেশের নির্বাচনের মতো খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করেন। পাকিসত্মত্মানে নির্বাচন হয়ে গেছে, এখন তেহেরিক-ই ইনসাফ প্রধান ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী। গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে নির্বাচনও হয়েছে, পুনরায় আওয়ামী লীগ জিতেছে এবং শেখ হাসিনা পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন এখনও হয়নি।
গত ১২ মার্চ ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার লোকসভা নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করেছেন। ১১ এপ্রিল থেকে ১৯ মে পর্যনত্ম ছয় দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর ২৩ মে ফলাফল একসঙ্গে ঘোষণা করা হবে। ষষ্টদশ লোকসভার মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে আগামী ২ জুন। তার মধ্যেই নতুন সরকার গঠিত হতে হবে। সপ্তদশ লোকসভায় ভোটার সংখ্যা ৯০ কোটি। এরমধ্যে নতুন ভোটার ৮ কোটি। বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স দৃশ্যত বিদ্যমান। এনডিএ’র নরেন্দ্র মোদিই নেতা এবং তিনিই তাদের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স-এর প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হচ্ছেন রাহুল গান্ধী। অবশ্য তারা ঘোষণা দিয়েছে, নির্বাচনের পরে প্রয়োজনে কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিতে আপত্তি করবে না।
এরই মধ্যে জনমত জরিপের কিছু কাজ হয়েছে। তাতে এনডিএ এগিয়ে আছে। পাকিসত্মানের বালাকোটে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক-এর পর নাকি নরেন্দ্র মোদির জনসমর্থন বেড়েছে। ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন নিয়েও আমার যে পর্যবেড়্গণ দীর্ঘদিন ধরে, তাতে আমার ইনটিউশন বলছে নরেন্দ্র মোদি সম্পূর্ণ ব্যর্থ সরকার। ২০১৪ সালে ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনে জনসাধারণকে যেসব প্রতিশ্রম্নতি দিয়ে ভোটে জিতে এসেছিলেন তার কিছুই পূরণ করতে পারেননি তিনি। ব্যর্থতার তো পুরস্কার হয় না। বালাকোটের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক তো পাকিসত্মানের পাল্টা স্ট্রাইকে মস্নান হয়ে গেছে।
মনমোহন সিং দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে নিজের সততার ভাবমূর্তি রড়্গা করলেও কিন’ সরকারের সততার ভাবমূর্তি রড়্গা করতে পারেননি। কারণ, তার সরকারের অংশীদার আঞ্চলিক দলগুলোর মন্ত্রীরা নিজ নিজ দফতর পরিচালনায় শতাংশে দুর্নীতিগ্রসত্ম ছিলেন। যে কারণে ভারতীয় ভোটারেরা এনডিএ’র অংশীদারদের ওপর যেন নির্ভর করতে না হয় সে বিবেচনায় নরেন্দ্র মোদির জনতা পার্টিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতিয়ে দিয়েছিলো।
ভারতীয় ভোটারদের বিশ্বাস স’াপনের একটা নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে নরেন্দ্র মোদিকে ধরে নিয়েছিলো। গত পাঁচ বছর নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় ভোটারদের হতাশ করেছেন চূড়ানত্মভাবে। ষষ্ঠদশ লোকসভা নির্বাচনে তিনি তার প্রদত্ত প্রতিশ্রম্নতির কিছুই রড়্গা করতে পারেননি। মোদি ড়্গমতায় আসার পর তার সরকার বিলিয়নিয়ারদের প্রিয়ভাজন হয়ে কাজ করছে বেশি। অথচ কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। কৃষকেরা এখন আত্মসচেতন হয়ে উঠেছে। ভারতীয় নেতৃবৃন্দ সচেতন না হলে কৃষকের লং মার্চেই তাদের সমাপ্তি সূচনা করবে। সে আলামত আমরা দূর থেকে হলেও লড়্গ করছি।
ভারতীয় সমাজে সত্যান্বেষী মানুষের সংখ্যাস্বল্পতা প্রকট। মানবতন্ত্রের বিকাশ নেই বিসত্মার নেই। বুদ্ধিজীবীরাও যুক্তি আর ভক্তির সমন্বয় করতে চায়।
যাহোক, লোকসভা নির্বাচনের কথায় আসি। উত্তর প্রদেশের লোকসভার আসন সংখ্যা ৮০টি। গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিলো ৭২টি। সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের আগে দুটি শক্তিশালী আঞ্চলিক দল বহুজন সমাজ পার্টি এবং সমাজবাদী পার্টি নিজেদের মাঝে সমান সংখ্যক আসন বণ্টন করে জোট গঠন করেছে। উত্তর প্রদেশে যাদব বেশি। যাদবেরা গোয়ালা। গোয়ালার দল হচ্ছে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি আর বহুজন সমাজ পার্টি হচ্ছে হরিজনদের দল। তাদের নেত্রী হচ্ছেন মায়াবতী। উত্তর প্রদেশে মুসলিম ভোটার উলেস্নখযোগ্য। মুসলমানেরা সাধারণত ভোট প্রদান করে থাকেন হয় মায়াবতীর বিএসপিকে, না হয় অখিলেশ যাদবের এসপিকে। এবারের নির্বাচনে উভয় দলের ঐক্যের কারণে হরিজন, যাদব কুল আর মুসলিমদের ভোট ভাগাভাগি হওয়ার সম্ভাবনা কম। সুতরাং বিজেপি এ লোকসভা নির্বাচনে ২০টার ওপরে আসন পাবে বলে মনে হয় না।
অখিলেশ আর মায়াবতী যদি রাহুলকে সঙ্গে নিতেন তবে বিজেপির আসন পাঁচ সংখ্যায় নেমে আসতো। রাহুল উচ্চ শ্রেণির হিন্দুদের ভোট পান। কর্নাটকে কংগ্রেস এবং জনতা দলের (দেবগৌড়া) ঐক্য হয়েছে। এ ঐক্য লোকসভা নির্বাচনেও অটুট থাকবে। সুতরাং কর্নাটকে বিজেপির একতরফা বিজয় সম্ভব নয়। বড় রাজ্যের মাঝে বিহারও একটা। এখন বিহারে জনতা দল (নীতিশ) ও জনতা পার্টির ফ্রন্ট সরকার। লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দলের জনপ্রিয়তা এখন নীতিশের চেয়ে বেশি। কয়েকটা উপনির্বাচনে লালু প্রসাদের বিজয় হয়েছে। মহারাষ্ট্রে শারদ পাওয়ারের (কংগ্রেস) এবং রাহুলের কংগ্রেসের ঐক্য আছে। মহারাষ্ট্রও বড় রাজ্য। তামিলনাড়ুতে আন্না ডিএমকে নেত্রী জয়ললিতার মৃত্যু হয়েছে। আবার ডিএমকে নেতা করম্নণানিধিরও মৃত্যু হয়েছে। আন্না ডিএমকে এখন রাজ্যের ড়্গমতায়। সম্ভবত এবারের নির্বাচনে স্ট্যালিন (করম্নণানিধির পুত্র) ও ডিএমকে ভালো ফল বয়ে আনবে। ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস’ান- তিন রাজ্যে বিজেপি কংগ্রেসের হাতে পরাজিত হয়েছিলো। এখন এ তিন রাজ্যে কংগ্রেসের সরকার। অন্ধ্রে চন্দ্রবাবু নাইড়ু এবং তেলেঙ্গানায় চন্দ্র শেখর রাওয়ের অবস’ান ভালো। তারা উভয়ে উভয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। পশ্চিম বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার।
সুতরাং আপাতত দেখা যাচ্ছে, বিজেপি জোট সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। দিন যত কাছে আসবে, তাতে আরও স্পষ্ট করে বলা যাবে মোদির ভাগ্যে আবারও কুরসি আছে কি নেই।
লেখক: রাজনৈতিক বিশেস্নষক ও কলাম লেখক