ভারতীয়দের কাছে চট্টগ্রাম মানেই সূর্য সেন

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা

বলিউডে কত সিনেমাই তো মুক্তি পায়। হাজার সিনেমার ভিড়ে একটি সিনেমা গোটা ভারতের ইতিহাসের কথা বলে। সেই সিনেমাটির নাম- চিটাগং। শুনতে অবাক লাগলেও এটিই সত্য।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তথা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বয়ে বেড়ানো সিনেমাটির নাম ‘চিটাগং’ কেন হলো- সেই বিস্ময় জাগাটাও অস্বাভাবিক নয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এই বঙ্গ থেকে যে একজনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিলো সাহসী বিপ্লব, তিনি সূর্যকুমার সেন। মাস্টারদা সূর্য সেন। তাঁকে ঘিরেই রচিত এই সিনেমা।
সিনেমার মতো ভারতীয়দের কাছে আজও চট্টগ্রাম মানে এক সূর্য সেন। সেই বিপ্লবীর স্মরণে আজ রাউজানে পা রাখতে চললেন ভারতের তেরতম রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। মাস্টারদার স্মৃতিবিজড়িত গাঁয় পড়বে ভারতের একসময়কার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যক্তির পদধূলি। এই নিয়ে আছে যেমন জোর প্রস্তুতি, তেমন মৃদু উত্তেজনা আর কৌতূহলও।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে চোখ রাখলে জানা যাবে ভারতীয়দের কাছে কতটা পূজনীয় এক সূর্য সেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে। বাংলাদেশের মতো ভারতেও বিভিন্নভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই বিপ্লবীকে। প্রায় শত বছর আগের সেই সূর্য সেনকে আজও উজ্জ্বল করে রেখেছে দেশটি।
‘চিটাগং’ সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে ২০১২ সালের ১২ অক্টোবর। বিখ্যাত অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ি অভিনয়ে তুলে ধরেছেন আপাদমস্তক সূর্য সেনকে। বিপ্লবীর জীবন-যুদ্ধ এবং চট্টগ্রাম থেকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন উঠে এসেছে সিনেমায়।
এখানেই শেষ নয়। চিটাগং-এর আগেও সূর্য সেনকে নিয়ে ভারতে সিনেমা হয়েছে। সেই সিনেমার নাম- ‘খেলে হাম জি জান সে’। কেন্দ্রীয় চরিত্রে সূর্য সেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অভিষেক বচ্চন। সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত সিনেমাগুলো একটাপর্যায়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তথা ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসেরই প্রতিনিধিত্ব করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কলকাতার একটি মেট্রো স্টেশনের নামকরণ হয়েছে চট্টগ্রামের বিপ্লবীর স্মরণে। কলকাতা মেট্রোর বাঁশদ্রোণী স্টেশনটির নাম দেওয়া হয় ‘সূর্য সেন মেট্রো স্টেশন’।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯২৮ সালে কলকাতার পার্ক সার্কাসে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির যে অধিবেশন হয়, সেখানে চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করেন সূর্য সেন। তাঁর সঙ্গে অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিং, নির্মল সেন এবং আরও কয়েকজন ছিলেন। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন সূর্য সেন। ১৯২৯ সালে মহিমচন্দ্র দাশগুপ্ত এবং বিপ্লবী সূর্য সেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সভাপতি এবং সম্পাদক নির্বাচিত হন।
তাঁর গ্রেপ্তারের সঙ্গেও কলকাতার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং পরিকল্পনা প্রণয়নের কারণে বহুবার পুলিশের দৌঁড়ের মুখে ছিলেন সূর্য সেন। অনেকটা সময় তিনি কলকাতায় আত্মগোপন করে কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। একপর্যায়ে ১৯২৬ সালে সূর্য সেন পলাতক অবস্থায় কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটের এক মেসে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভারতের বোম্বে (বর্তমানে মুম্বাই) ও কলকাতা, পাকিস্তানের করাচির পাশাপাশি চট্টগ্রামের নামও বড় করে উচ্চারণ করেন ভারতীয়রা। নির্মিত দুই সিনেমাও এঁকে দিয়েছে সেই চিহ্ন। সূর্য সেন আজও জ্বলজ্বল করছে ভারতের ইতিহাসের পাতায়। ভারতীয়দের কাছে নামটি আজও ভাস্বর। দেশটির সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির এই সফরও তারই ধারাবাহিকতা।