ক্রাইস্টচার্চে দুই মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা, তিন বাংলাদেশীসহ নিহত ৪৯

ভাগ্য বাঁচালো টাইগারদের!

সুপ্রভাত ডেস্ক

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুইটি মসজিদে জুমার নামাজের সময় বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৯ হয়েছে বলে জানান পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ। গতকাল বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য দেন বলে জানায় বিবিসি, নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড। বুশ বলেন, ডিন্স এভিনিউর আল নূর মসজিদে ৪১ জন এবং লিনউড এলাকার অন্য মসজিদে সাত জন নিহত হয়েছেন। খবর বিডিনিউজের।
‘হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস’ায় আরো একজন মারা গেছেন।’ নিহতদের মেধ্েয তিনজন বাংলাদেশি।
হামলায় আহত অনত্মত ৪৮ জন ক্রাইস্টচার্চ হাসপাতাল চিকিৎসাধীন আছেন বলে নিশ্চিত করেছে হাসপাতাল কর্তৃপড়্গ। আহতদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। হাসপাতাল থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে খুব জরম্নরি না হলে লোকজনকে আহতদের দেখতে হাসপতালে না আসার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
‘এরই মধ্যে দুই শতাধিক মানুষ হাসপাতালে ভিড় জমিয়েছে।’ মসজিদে হামলার এ ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন’ এবং ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে বর্ণনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী অ’ডুর্ন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চিত ভাবেই পরিকল্পনা করে এ হামলা চালানো হয়েছে।’
হামলার পর শোক প্রকাশ করে
প্রধানমন্ত্রী অ’ডুর্ন বলেন, ‘এটা নিউজিল্যান্ডের অন্ধকারতম দিনগুলোর একটি। এখানে যে ঘটনা ঘটেছে সেটা পরিষ্কার ভাবেই অস্বাভাবিক এবং অপ্রত্যাশিত নৃশংসতা।’
দুই মসজিদে হামলায় জড়িত সন্দেহে চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে তিনজন পুরম্নষ এবং একজন নারী বলে জানান পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ। গ্রেফেতার ২৮ বছরের এক ব্যক্তির বিরম্নদ্ধে হত্যার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে জানিয়ে বুশ বলেন, শনিবার তাকে আদালতে উপস’াপন করা হবে।
হামলায় জড়ি সন্দেহে আটক এক ব্যক্তি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। তিনি বলেন, সন্দেহভাজন হামলাকারী ‘একজন চরম ডানপনি’ নৃশংস সন্ত্রাসী’। দুই মসজিদে হামলার পর ক্রাইস্টচার্চ কর্তৃপড়্গ নগরীর সব মসজিদ পরবর্তী নোটিস না দেওয়া পর্যনত্ম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। নগরীর সব স্কুলও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রত্যড়্গদর্শীদের বর্ণনায়
প্রত্যড়্গদর্শীরা স’ানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আল নূর মসজিদে গুলি শুরম্ন হলে তারা প্রাণ বাঁচাতে সেখানে থেকে দৌড়ে পালিয়ে যান। মসজিদের বাইরে রক্তাক্ত অবস’ায় লোকজনকে পড়ে থাকতে দেখার কথাও জানান তারা।
আল নূর মসজিদ এলাকায় মহান ইব্রাহিম নামে এক প্রত্যড়্গদর্শী নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডকে বলেন, ‘শুরম্নতে আমি ভেবেছিলাম বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে এমনটা হচ্ছে। পরে দেখি সবাই দৌড়াতে শুরম্ন করেছে। এখনো আমার বন্ধুরা মসজিদের ভেতরে আছে।’
অন্য এক প্রত্যড়্গদর্শী বলেন, হামলাকারী সামরিকবাহিনীর মত পোশাক পরে ছিল। হাতে থাকা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে সে ক্রামগত গুলি ছুড়তে থাকে।
আল নূর মসজিদে হামলাকারী তার হেলমেটে বসানো ক্যামেরায় গুলি চালানোর পুরো দৃশ্য সরাসরি সমপ্রচার করেছেন। প্রায় ১৭ মিনিটের ওই লাইভে অটোমেটিক রাইফেলধারী ওই ব্যক্তি নিজের নাম বলেছেন ‘ব্রেন্টন ট্যারেন্ট’। ২৮ বছর বয়সের শেতাঙ্গ ওই হামলাকারীর জন্ম অস্ট্রেলিয়ায়।
বন্দুকধারী ক্রাইস্টচার্চের ডিন্স এভিনিউতে আল নূর মসজিদের দিকে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় ‘লাইভ’ শুরম্ন হয়। একটি ড্রাইভওয়ের কাছে তিনি গাড়ি পার্ক করেন। গাড়িতে চালকের পাশের আসনে বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রচুর গুলি দেখা যায়। সেখানে পেট্রোল ভর্তি কয়েকটি ক্যানও ছিল।
ওই ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে দুইটি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মসজিদের দিকে হাঁটতে শুরম্ন করে বলে জানায় বার্তা সংস’া রয়টার্স। মসজিদে ঢোকার পথেই সে একজনকে গুলি করে। ভেতরে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি করতে শুরম্ন করে। সে বেশ কয়েকবার তার সেমি-অটোমেটিক রাইফেলটিতে গুলি ভরে এবং এলোপাতাড়ি গুলি করে।
এভাবে প্রায় তিন মিনিট ধরে গুলি করার পর সে মসজিদের সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। রাসত্মায় দিকে যাওয়ার সময় সে আশেপাশের গাড়ি লড়্গ্য করে গুলি ছোড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হামলার ভিডিও সরিয়ে নিতে কাজ করছে কেন্টার্বুরি পুলিশ।
পুলিশের পড়্গ থেকে কঠোরভাবে ওই ভিডিও শেয়ার না করার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়, ‘ক্রাইস্টচার্চে হামলার ঘটনার চরম বিপর্যয়কর ভিডিওগুলো অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে পুলিশ সচেতন এবং সেগুলো সরিয়ে নিতে কাজ করছে।’
ফেসবুক কর্তৃপড়্গ বন্দুকধারীর ফেইসবুক ও ইন্সটাগ্রাম একাউন্ট সরিয়ে ফেরার কথা জানিয়েছে। টুইটার থেকেও ওই ব্যক্তির একাউন্ট মুছে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে ক্রিকেট দল নিরাপদ
আল নূর মসজিদে বন্দুক হামলার সময় নিউজিল্যান্ড সফরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের কয়েকজন খেলোয়াড় জুমার নামাজ আদায় করতে সেখানে উপসি’ত ছিলেন। তারা সবাই নিরাপদ আছেন বলে বার্তা সংস’া রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন দলের কোচ।
নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের খবরে বলা হয়েছে, গোলাগুলি শুরম্নর পরপরই আল নূর মসজিদে পৌঁছেছিলেন বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা। তারা দ্রম্নত সেখান থেকে সরে যান। আজ ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ডের বিপড়্গে তৃতীয় টেস্ট খেলতে মাঠে নামার কথা ছিল বাংলাদেশ দলের। হামলার পর ওই ম্যাচটি বাতিল ঘোষণা করা হয়।

নিহতদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি
নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুই মসজিদে গুলির ঘটনায় নিহতদের মধ্যে অনত্মত তিনজন বাংলাদেশি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের অনারারি কনসাল ইঞ্জিনিয়ার শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, গুলিবিদ্ধ অবস’ায় আরো চার বাংলাদেশিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আরো একজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে স’ানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছ থেকে খবর পেয়েছেন তিনি।
নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের স’ায়ী দূতাবাস নেই, অনারারি কনসাল ইঞ্জিনিয়ার শফিকুর রহমান থাকেন অকল্যান্ডে। সেখান থেকে তিনি ক্রাইস্টচার্চের বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
তিনি বলেন, ‘শুক্রবার অনেকেই জুমার নামাজ পড়তে আল নূর মসজিদে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কযেকজন না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। কিন’ না পেয়ে খোঁজ শুরম্ন করেন। পরে হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ অবস’ায় কয়েকজনের ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে তিনজন মারা যান।’
নিহত বাংলাদেশিরা হলেন- লিংকন ইউনিভার্সিটির শিড়্গক ড. আবদুস সামাদ ও তার স্ত্রী এবং হোসনে আরা ফরিদ নামের এক গৃহবধূ। শফিকুর রহমান বলেন, ষাটোর্ধ্ব আবদুস সামাদের বাড়ি ময়মনসিংহে, এক সময় তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিড়্গক ছিলেন।
নিউজিল্যান্ড সফররত বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কয়েকজন খেলোয়াড়রা হামলার সময় আল নূর মসজিদে গিয়েছিলেন জুমার নামাজ পড়তে। ভেতরে গোলাগুলির বিষয়টি জানতে পেরে তারা বাইরে থেকেই দ্রম্নত নিরাপদে সরে যান।
গোলাগুলির ওই ঘটনার পর বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড তৃতীয় টেস্টটি বাতিল করা হয়। আজ ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভালে ওই ম্যাচ শুরম্ন হওয়ার কথা ছিল।