বয়লার বিস্ফোরণ : কর্তৃপক্ষের অবহেলার শিকার হচ্ছেন শ্রমিকরা

গত রোববার সকালে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী সীমা অটো রি-রোলিং মিলে বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনায় ৯ শ্রমিক দগ্ধ হয়েছেন। কাজের এক পর্যায়ে বয়লারটি বিস্ফোরিত হলে কর্মরত শ্রমিকরা ছিটকে পড়েন এবং মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। তাদের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে বিস্ফোরণটি ঘটতে পারে। অভিযোগ আছে এই মিলে আগেও এমন দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ২০১২ সালে ফার্নেস বয়লার বিস্ফোরিত হলে আবুল বাশার নামে এক শ্রমিক নিহত ও দশ শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
গত ৩ জুলাই গাজীপুর-কাশিমপুরের নয়াপাড়া এলাকায় মাল্টিফ্যবস পোশাক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে ১৩ শ্রমিক নিহত ও অর্ধশতাধিক শ্রমিক আহত হন। এই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, বয়লারের প্রেসার গেজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায়, ডেলিভারি লাইন বন্ধ থাকায় এবং বয়লার অপারেটদের উপযুক্ত তদারকির অভাবে বয়লারটি বিস্ফোরিত হয়। গত বছর সেপ্টেম্বরে টঙ্গীতে বয়লার বিস্ফোরণ ও তাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২২ শ্রমিক নিহত ও শতাধিক শ্রমিক ও পথচারী আহত হন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় আমেনা গার্মেন্টসের ছয়তলায় স্টিম বয়লার বিস্ফোরণে ২০ শ্রমিক আহত হন। ২০১৬ সালের ২২ জানুয়ারি গাজীপুরের পুবাইল এলাকায় স্মার্ট মেটাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি নামের একটি টায়ার কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ হলে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন। এই ঘটনায় আহত হন আরও পাঁচজন।
দেশে বয়লার বিস্ফোরণ এবং তাতে নিহত আহতের সম্পূর্ণ চিত্র নয় এটি। এছাড়াও প্রতিবছর বিভিন্ন কারখানায় এ ধরনের অবহেলার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে এবং তাতে শ্রমিকদের মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আসল কথা হলো, দেশে শিল্প-কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা এখনো সম্ভব হয়নি। কারখানার মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের গাফেলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণে প্রতিবছর অনেক শ্রমিক কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। শ্রমিকদের পক্ষে বলার জন্য যথাযথ ও সংগঠিত শক্তি সক্রিয় না থাকায় অনেক সময় শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হন।
যে কোনো কর্মস্থলে শ্রমিক-কর্মচারীদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। উন্নত বিশ্বে সকলে ‘সেফটি ফার্স্ট’ নীতিতে কর্মপরিবেশ তৈরি করতে গিয়ে প্রথমে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন সকলের নিরাপত্তার। আর আমাদের দেশে শ্রমিকদের কাজ করতে হয় চরম নিরাপত্তাহীনতায়। নিয়মিত দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দেশে নিয়মিতভাবে বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে এবং তাতে প্রতিবার নিরীহ শ্রমিক প্রাণ হারাচ্ছে। এমন দুর্ঘটনার সংবাদ প্রথম দুয়েকদিন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হলেও পরে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ভাগ্যে কী ঘটে তার আর জানার উপায় থাকে না।
উদাসীনতা ও গাফেলতির কারণে মিল মালিকদের খুব বেশি ‘ঝামেলায়’ পড়তে হয় না বলেই বোধহয় কারখানাগুলোতে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্ঘটনা লেগেই থাকে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন খুবই জরুরি। আর কতকাল জীবন দিয়ে শ্রমিকরা জানিয়ে যাবে যে, যাদের রক্ত ও ঘামে এদেশ উন্নত হচ্ছে, তাদের প্রতি আমরা কী অমানবিক উদাসীনতা ও উপেক্ষা প্রদর্শন করছি।