ব্রিটিশবিরোধী ইতিহাস ছুঁয়ে গেলেন প্রণব মুখার্জি

নিজস্ব প্রতিবেদক
পাহাড়তলীতে তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাব পরিদর্শন শেষে বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আবক্ষমূর্তিতে পুস্পস্তবক অর্পণ করেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি -পিআইডি

ঘড়িতে তখন সাড়ে দশটা। ভারতের সাবেক ও প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি গতকাল নগরীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু থেকে পৌঁছান দামপাড়া পুলিশ লাইনে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার তাঁকে স্বাগত জানান। এরপর তিনি পরিদর্শন করেন দামপাড়া পুলিশ লাইনে অবস্থিত তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর অস্ত্রাগার। যেটি স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল লুট করে দামপাড়া রিজার্ভ পুলিশ ব্যারাক দখল নেন অগ্নিযুগের বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন। এখানের দু’টি স্থাপনা পরিদর্শনকালে তাঁকে বিপ্লবের ইতিহাস ও স্থান সম্পর্কে বর্ণনা দেন নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার দেবদূত মজুমদার। এরপর তিনি চলে যান পাহাড়তলী রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এলাকার তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাবে (বর্তমানে রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলীর অফিস)। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। এ ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত স্থানটিও নিবিড়ভাবে পরিদর্শন করে তিনি রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আবক্ষমূর্তিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে তিনি শেষ করেন চট্টগ্রাম সফর।
গতকাল সকাল সাতটায় তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাবে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিরাপত্তাকর্মীরা ক্লাবটির চারপাশে অবস্থান নিয়ে নিশ্চিত করছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। চারপাশ বেশ সুসজ্জিত। রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চোখে-মুখে আনন্দের ছটা। বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ দপ্তরটি যেহেতু তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাব, তাই তা সজ্জিত করে রাখা হয়েছে। এ কারণে দপ্তরে ঢুকতে না পারা কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে তাদের আনন্দিত হবার কারণ জানতে চাইলে ঐ দপ্তরের হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ আলী বলেন. ‘এমন ঐতিহাসিক স্থানে আজ পর্যন্ত কোনো ভিআইপি আসেননি। ভারতীয় সাবেক এ রাষ্ট্রপতি আজ আসছেন, খুশি তো হবোই। আমাদের ইতিহাস রক্ষার জন্য, ইতিহাস স্মরণে রাখার জন্য এমন মুহূর্ত যেন বারবার আসে আমরা তেমনটাই চাই।’
প্রণব মুখার্জি গত মঙ্গলবার সকালে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসেন। এ সফরে তাঁকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডক্টরেট অব লিটারেচার (ডি.লিট) ডিগ্রি দেয়। এরপর থেকে তিনি শুরু করেন এ উপমহাদেশের স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস ছুঁয়ে দেখা। গাড়িবহর সাথে নিয়ে চলে যান ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের বসতভিটা পরিদর্শনে। সেখানে তিনি সূর্য সেনের আবক্ষমূর্তিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং উদ্বোধন করেন নবনির্মিত বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন স্মৃতি পাঠাগার। এরপর তিনি রেডিসন ব্লুতে ফিরে একদিনের দেখা চট্টগ্রাম, উপমহাদেশীয় বিপ্লব ও স্বাধীনতায় চট্টগ্রাম এবং আধুনিক রাজনীতিতে এ উপমহাদেশের অবস্থা নিয়ে সুধী সমাবেশ করেন। এ সফরে তিনি চট্টগ্রামে তাঁর মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জিকেও নিয়ে আসেন ঐতিহাসিক স্থানগুলো স্মৃতির পাতায় তুলে নিতে। অতঃপর তিনি ও তাঁর মেয়ে ঢাকা যাবার উদ্দেশে গতকাল বেলা ১২টায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রওনা দেয়।
সকাল নয়টা নাগাদ ইউরোপিয়ান ক্লাবে আসা সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ইউরোপিয়ান ক্লাবকে জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেবো। আশা করি, এটি দ্রুততার সাথে বাস্তবায়িত হবে। এছাড়া রাউজানে চুয়েট পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করা হবে। সেখানে যে স্টেশনটি নির্মিত হবে সেটি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের নামে করা হবে।’