ব্রাত্যজনের রবীন্দ্রসঙ্গীত ও একটি প্রস্তাব

আখতার হোসেন খান

অমিয় দেব, তুলনামূলক সাহিত্যের দিকপাল ও স্বনামধন্য লেখক, কোলকাতার সল্টলেকে একবার সিঁড়ি দিয়ে নিজ ফ্লাটে ওঠার সময়ে পাশের বাড়ি থেকে আসা রবীন্দ্রসংগীতের কলি শুনে হঠাৎ এক ঘোরের রাজ্যে পৌঁছান। পরে তাঁর রবীন্দ্রনাথ-বিষয়ক অগ্রসারির বই ‘বিপুল তরঙ্গ রে’-তে তাঁর অনুভূতি এক মূল্যবান প্রবন্ধাকারে স্থান নেয়। বিভিন্ন ওয়েব-সাইটে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে গিয়ে বাণিজ্যিকভাবে কম পরিচিত কয়েকজন শিল্পীর গান আমার হঠাৎ ভালো লাগে; এবং সেই ভালো লাগা নিয়েই অনুলিখিত অনুচ্ছেদগুলো।
আসলে গান ভালো-লাগা বা কোনো বিশেষ গান কোনো বিশেষ মুহূর্তে ভালো-লাগার বিষয়টি ব্যাখ্যার অতীত। যিনি শোনেন, তিনিই হয়তো তা ব্যাখ্যা করতে পারবেন। অথবা সব সময়ে হয়তো পারবেনও না। গায়ক/স্রষ্টা গানটি গেয়ে বা তার সুর করে দিয়ে সংখ্যাতীত শ্রোতাদের সম্পদ করে দিয়ে যান। আর সময়ে-অসময়ে বা সব সময়ে শুনে শ্রোতারা নিজ পছন্দের নিক্তিতে তার বিচার করেন, গানকে প্রাসংগিকতা ও স্থায়িত্ব দেন, অজান্তেই তার প্রচারকর্মী হয়ে যান।
আমার প্রিয় লেখক সুধীন্দ্রনাথ দত্ত রবীন্দ্রনাথকে আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতির ‘জনক’ নামে অভিহিত করেছেন; এবং অন্যত্র বলেছেন, আমাদের কথ্য ভাষা তাঁরই সৃষ্টি। কিন্তু তাঁর গান নিয়ে মন্তব্য পাই ‘ট্যাগোর এ্যাজ এ লিরিক পোয়েট’ নামের এক ইংরেজি প্রবন্ধে: মূলের বাক্যরীতি অনুসরণ করে অনুবাদে তা এরকম: ‘‘তাঁর সঙ্গীত অবশ্য সংক্ষিপ্ত ও সুরেলা হওয়ার দ্বৈত গুণসমপন্ন্ন; এবং এই সমাহার তাদেরকে তাঁর কাব্যিক রচনার অগ্রভাগে স্থান দিয়েছে।” একই লেখায় তিনি মহাকবির ভাষাকে ‘জাদুময়’ আখ্যা দিয়ে আরও বলেন: ‘‘রবীন্দ্রনাথের আগে কোনো কবি জানতেন না কীভাবে বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণ হতে সঙ্গীত নিঙরাতে হয়”। ‘কাব্যিক রচনার অগ্রভাগে’ কথাটা তাৎপর্যপূর্ণ ও দিক-নির্দেশক।
এই ‘অগ্রভাগে’ থাকার বক্তব্য কি রবীন্দ্রনাথেই পাই না? বহু-চর্চিত, বহু-উদ্ধৃত সেই আত্মোপলব্ধি :‘এই পার্থিব জীবন ও পৃথিবীর মানুষকে আমি ভালোবেসেছি। এই ভালোবাসা রেখে গেলাম আমার গানের সুরে গেঁথে। মানুষ যদি মনে রাখে, এই গান দিয়েই রাখবে” (রবীন্দ্র-সঙ্গীত-কোষ: সুরেন মুখোপাধ্যায়)। অগ্রজপ্রতীম অবসরপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক অধ্যাপক নুরুল আনোয়ার বলতে পছন্দ করেন, মহাকবির গান ছাড়া মানবজীবনই অপূর্ণ; তিনি তাঁর বইয়ের শিরোনাম করেছেন, ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত বাঙালি সংস্কৃতির শীর্ষ পরিণতি’।
বর্তমান যুগের প্রযুক্তি অবশ্য অকাতরে, নির্বিবাদে, অনায়াসে রবীন্দ্রনাথের গান শোনার ও হাল্কা-গুরু মন্তব্য করার অবারিত দরোজা খুলে দিয়েছে সাধারণ শ্রোতাদের জন্য। ওয়েব-সাইটে প্রথমে শুনি পারমিতার কণ্ঠে প্রকৃতি পর্বের ‘মধুগন্ধে-ভরা’ গানটি (ভৈরবী/দাদ্‌রা) । এই গানটি অনেক জ্যেষ্ঠ ও স্বনামধন্যগায়কের কণ্ঠেও শুনেছি, কিন্তু পারমিতার কণ্ঠে এসে এটি এক অতুলনীয় সরল-সংযত-সংহত রূপ নিয়েছে, গানটির শব্দমালা শক্ত, তৎসম ও যুক্তাক্ষর-বহুল (যেমন, ‘মেঘমুক্ত সহাস্য শশাঙ্ককলা সিঁথিপ্রান্তে জ্বলে’), কিন্তু তাঁর শব্দোচ্চারণ নিখুঁত, সুর আসলেই মধুগন্ধে-ভরা। গানটির একটি ক্রিয়াপদ ‘পিয়ে’; রবীন্দ্রনাথে কি এর প্রয়োগ আর খুব একটা আছে? আমার শৃংখলামুক্ত কানে পারমিতার কৃতিকে মনে হয়েছে অনির্বচনীয়।
ওয়েব-সাইটে শ্রোতাদের পক্ষ থেকে অনেক ভালো মন্তব্যের সাথে নানান প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ বক্তব্যও সেখানে থাকে। শ্রোতাদের ওই স্বভাবসুলভ সরল প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, তার একটা দৃষ্টান্ত সারা বিল্লাহর কণ্ঠে অতুলনীয় ভঙ্গিতে গাওয়া ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ (কাফি/একতাল; সুরান্তরে আখরযুক্ত কীর্তন/দাদ্‌রা)। সারার কণ্ঠে এই গানটির ধরন-ঢং অভিনব; এক অভূতপূর্ব আবেশ বিহ্বল করে শ্রোতাকে। গানটি শুনে ওয়েব-সাইটেই একাধিকজনের মন্তব্য: ‘আমি পাগল হয়ে গেছি’। আরও কয়েকজন গানটির একটি চরণ ‘কী করিলে বলো পাইব তোমারে’ উদ্ধৃত করে গায়িকার প্রতি এক ধরণের তীর্যক চ্যালেঞ্জই ছুড়ে দিয়েছেন।
গায়িকা হিসেবে সুবর্ণা চৌধুরীকে খুব একটা টেলিভিশন বা রেডিওতে মেলেনি। তাঁর দুটি গান- ‘আমি তখন ছিলেম মগন গহন ঘুমের ঘোরে’ (কীর্তন/দাদ্‌রা) আর ‘ওই আসন তলের মাটির পরে’ (লোকজ কীর্তন/কাহারবা) -ওয়েবসাইটে হঠাৎই পাই; এবং অবসরপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক অমিয় দেবকে যেমন সিড়ির ধাপ দিয়ে উঠতে উঠতেই অনেক কথা এনে দেয় পাশের বাড়ি থেকে আসা সুর, আমার অপ্রস্তুত মানসেও প্রায় তাই-ই ঘটে এই গান দুটি শুনে, আমি এদের গ্রাস থেকে নিস্তার পাইনি; বারে বারে শুনতে থাকি । এমন নয় যে সুবর্ণা চৌধুরী ওই দুটি গানই গেয়েছেন। তাঁর সুকণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের অনেক গানই ওয়েবসাইটে আছে, আছে তাঁর নিজের লেখা, সুরারোপিত ও কণ্ঠ-দেয়া কয়েক ডজন গান। একাধারে গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীর সংখ্যা আমাদের ভুবনে খুব বেশি নেই; এই বিচারে, কম পরিচিতির পরেও তিনি উল্লেখ্যদের মধ্যেরই একজন ।
কিন্তু এই গান দুটি কেন অতিরিক্ত ভালো লাগে? অধ্যাপক নুরুল আনোয়ারের ব্যাখ্যা, এদের কীর্তন-ভিত্তিই এই অতিরিক্ত ভালো লাগার মূলে। শত শত বছরের ভিতর দিয়ে এসে বাঙালী আত্মা কীর্তনের জন্য প্রস্তুত হয়েছে, কীর্তন তৈরী করেছে, কীর্তনকে গ্রহণ করেছে। কীর্তন যেমন আমাদের নিজস্ব সম্পদ, তেমনি এর একটা উপমহাদেশীয় ভিত্তিও আছে, আছে বৈদিক শিকড়। বাংলা একাডেমীর অভিধানানুযায়ী কীর্তন হচ্ছে: ‘গানের পদ্ধতি’। বুদ্ধদেব বসু ’কালিদাসের মেঘদূত’ লিখতে যেয়ে মনিয়ের উইলিয়ামসের সংস্কৃত-ইংরেজি অভিধানের সাহায্য নিয়েছিলেন। ওই অভিধানটি খুলে মিলল কীর্তনের এই অর্থগুলো: উল্লেখ করা, পুনরাবৃত্তি করা, বলা, খ্যাতি, সৌধ, মন্দির।
প্রথম বাংলা মহাকাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সাথে কীর্তন শব্দটি জড়িয়ে থাকলেও তার পদগুলোতে প্রচলিত অর্থের কীর্তন নেই । ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বঙ্গসন্তান চৈতন্যদেব ও তাঁর ভক্তিবাদ, বাংলার বৌদ্ধ ঐতিহ্য, আর মধ্যযুগের কবিতা ও গান কীর্তনকে সমৃদ্ধ করেছে। যামিনী রায় সংক্রান্ত এক ইংরেজি প্রবন্ধে সুধীন দত্ত জানাচ্ছেন, ‘চৈতন্য ভক্তিবাদে এমন কুশলী হয়ে উঠেছিলেন যে তাঁর সামনে কৃষ্ণ নাম বললে তিনি নিমেষে পুলকের মূর্চ্ছায় নিঃসাড় হতেন; এবং তাঁর ভক্তেরা তাই তাঁদের প্রভুকে এক আগ্রহভরা পাহারায়ই রাখতেন’। গান দিয়ে রবীন্দ্রনাথ কি এক পুরো জনগোষ্ঠীকেই মূর্চ্ছার কাছাকাছি অবস্থায় রেখে যাননি?
রবীন্দ্রনাথের একটা উদ্ধৃতিতে দেখেছি, তিনি কীর্তনকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের উপরে স্থান দিয়েছেন (বাংলা একাডেমির ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ দ্রষ্টব্য)। সুবর্ণা চৌধুরীর গাওয়া ওই গান দুটির কথা একসাথে এজন্যই বলা যে এই ধরণের হৃদয়স্পর্শী গান সারা ভাষাগোষ্ঠীকে নাড়ায়।
গায়িকার কৃতিত্বতো আছেই, অনেক প্রতিষ্ঠিতকেও তিনি সম্ভবত ছাড়িয়ে গেছেন, কিন্তু সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব এই কীর্তন-ভিত্তির। প্রথমটিতে ‘আমার স্বপ্নস্বরূপ’ এর পরে যে-টান বা পরেরটিতে ‘তোমার চরণ-ধুলায় ধুলায় ধূসর হব’-এর ‘ধুলায় ধুলায়, ধূসর’-এর উপর যে-অভ্যাঘাত, তা হৃদয়-জুড়ানো, মন-ভোলানো ।
আর কবিত্বতো রবীন্দ্রনাথের সেই স্বপ্নপুরীর শব্দমালা: প্রথমটিতে ‘প্লাবন-ঢালা’ বা বনের আগে ‘ক্ষুব্ধ’ শব্দটির ব্যবহার খুব বেশি কি আছে? এখানে, এবং তুলনীয় অন্যত্র, রবীন্দ্রসঙ্গীত আত্ম্‌ার গীত হয়ে উঠে। রবীন্দ্রনাথ পল্লীসামগ্রী কীর্তনকে শুধুই নগরজীবনেই আনেননি, তাকে এক অভূতপূর্ব পরিশীলন ও নির্যাস দিয়েছেন এবং সম্ভবত, নিজেই হয়ে উঠেছেন আমাদের জন্য এক আধুনিক চৈতন্যদেব ।
এত সব কথার পরে তাই এই প্রস্তাবটি রাখছি: কীর্তনকে একটা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হোক। আমরা পশু-পাখি-ফল-মূলকেওতো স্বীকৃতি দিয়েছি।