বেড়ায় আড়াল করে ভরাট হচ্ছে জলাশয় এবার ভরাট চলছে বিবিরহাটের নাজিরপুকুর

ভূঁইয়া নজরুল
najir-pukur,boro-bari-(2)

টিন ও বাঁশের বেড়ায় ভরাট হচ্ছে নগরীর জলাশয়গুলো। এসব বেড়ার আড়ালে ভেতরে রাতের আঁধারে মাটি ফেলে ভরাট করা হয় পুকুর। একইসাথে পুকুরের চারপাশের বসতি থেকে গৃহস’ালি ময়লা আবর্জনা ফেলে পানিকে ব্যবহার অনুপযোগী করে পরিত্যাক্ত ডোবায় পরিণত করা হচ্ছে পুকুরগুলোকে।
নগরীর অক্সিজেন-হাঁটহাজারী সড়কের বিবিরহাট বড়বাড়ি এলাকায় গতকাল সকালে গিয়ে দেখা যায়, কোথাও টিনের আবার কোথাও বাশের বেড়া দিয়ে বেষ্টনি দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে একটি পুকুর। পুকুরজুড়ে ময়লা আবর্জনার ছড়াছড়ি। পুকুরের পানিও তাই অপরিষ্কার।
পুকুরঘাটে কাপড় ধুতে আসা প্রায় ৪৫ বছর বয়সী এক নারী জানান, এটি ঐতিহ্যবাহী নাজিরপুকুর। আয়তনেও অনেক বড় ছিল। কিন’ পুকুরের ভেতরে টিনের বেড়া দিয়ে ভরাট করতে করতে চারপাশে এখন ঘর-বাড়ি গড়ে তোলা হয়েছে। পুকুরে বাকি যে অংশটি রয়েছে সেটিও পর্যায়ক্রমে ভরাটের প্রক্রিয়া চলছে। এখন পানিসহ পুকুর পাড় কাঠাপ্রতি ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা করে বিক্রি করা হচ্ছে। যাদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে তাদেরকে দখল দিতে ভরাটের এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, পুকুরটির ভরাট বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরেও স’ানীয়দের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ করা হয়। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক নাজনীন সুলতানা তা পরিদর্শনও করেন। তিনি বলেন, ‘পুকুরের চারপাশে জলঘাটা (মহিলাদের গোসল করার জন্য বেষ্টনি) দেয়ার নাম করে টিনের বেড়া দেয়া হয়েছে। আর সেই বেষ্টনির ভেতরে বালি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে পুকুরটি। একইসাথে পুকুরের চারপাশে ময়লা ফেলে পুকুরের পানিকে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে পুকুরের ভরাটকারীদের পুকুরের ভেতর থেকে টিন সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।
নগরীর পুকুর ও জলাশয়গুলো একইভাবে বিলীন হয়ে যাচ্ছে জানিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মী জানান, টিনের ঘেরা কিংবা বাশের বেষ্টনি দেয়ার নাম করে, আবার কোথাও জলঘাটা দেয়ার নাম করে প্রথমে পুকুরের ভেতরে খুঁটি গাড়া হয়। এরপর সেই খুঁটির ভেতরের অংশে বাহির থেকে মাটি ও বালি এনে ভরাট করা হয়। একইসাথে পুকুরের চারপাশ থেকে ময়লা আবর্জনা ফেলে পুকুরটি ধীরে ধীরে ভরাট করে ফেলা হয়। নগরীর শুলকবহর এলাকার মসজিদ পুকুর, মোহাম্মদপুরের বড় পুকুর, রামপুরের হাজারদীঘি, দক্ষিণ কাট্টলীর পদ্ম
পুকুর এভাবে ভরাট করা হয়েছে।
এদিকে বিএস শিটে নির্ধারিত আয়তনের পুকুর ছিল এমন স’ানে কোনো ভবনের অনুমোদন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) দেয় না জানিয়ে সিডিএ’র ভারপ্রাপ্ত প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ স’পতি শাহীনুল ইসলাম খান বলেন, ‘এটা ঠিক যে পুকুরের মালিকরা কৌশলে পুকুর ভরাট করে সেমিপাকা ঘর তৈরি করছে। কিন’ আমাদের কাছে ভবন অনুমোদনের জন্য এলে পুকুরের স’ানে ভবনের অনুমোদন পায় না। সেটা ভরাট করলেও বিএস শিটে বা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে পুকুর রয়েছে।’
সিডিএ’র কাছে আসার আগেই তো পুকুর শেষ হয়ে যাচ্ছে- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, একারণেই নগরীর পুকুরগুলো দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি হলে পানি ধারণের জায়গা থাকে না এবং নগরীতে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগে রূপ নেয়।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, নগরীতে পুকুর ও জলাশয় পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলে নগরীতে গরমের তীব্রতাও কম অনুভব হয়। বর্তমানে নগরগুলো হিট চেম্বারে পরিণত হওয়ার পেছনেও রয়েছে এভাবে পুকুর ও জলাশয়গুলো বিলীন হয়ে যাওয়া।
পুকুর বা জলাশয় ভরাট নিয়ে আইনে কী আছে
জলাশয় সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী পুকুর-দীঘি ভরাট নিষিদ্ধ। ভূমির রেকর্ডে (আরএস, বিএস) কোনো জলাশয় থাকলে তা কোনোভাবেই ভরাট করা যাবে না। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) পুকুর ভরাট বন্ধ করার জন্য একটি নির্দেশনা দিয়েছে। সেই নির্দেশনায় ১৫ কাঠা আয়তনের কোনো বড় জলাশয় কোনোভাবেই ভরাট করা যাবে না। ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে স্পষ্ট বলা রয়েছে, শূন্য দশমিক ২৫ একর (১৫ কাঠা) আয়তনের বড় পুকুর বা জলাশয়ে কোনোভাবে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়া যাবে না।