বৃহৎ শক্তিগুলির নিষ্ক্রিয়তা মিয়ানমারকে বেপরোয়া করে তুলছে

সুভাষ দে

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জাতিগত নিধনযজ্ঞটি এখন অনেকটা সম্পূর্ণ হতে চলেছে, রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলিতে এখন ‘কবরের শান্তি’ বিরাজ করছে।
গত আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে মাসাধিককাল ধরে মিয়ানমার সেনা ও নিরাপত্তাবাহিনীর নৃশংস ও ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে ৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্ত এলাকায় পালিয়ে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে মারা গেছে কয়েক হাজার নিরীহ মানুষ। পালানোর সময় নিরীহ মানুষদের গুলি করা হয়েছে, আঘাত করা হয়েছে নানাভাবে। সীমান্ত এলাকায় স্থলমাইন পুঁতে দেয়া হয়েছে। সীমান্ত অতিক্রমের সময় মিয়ানমার নিরাপত্তাবাহিনী ও স্থানীয় মাস্তানরা তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে, এর আগে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে, লুঠ করা হয়েছে সকল সম্বল, নারীদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন হয়েছে সীমাহীন। জাতিসংঘ একটি নিরপরাধ জনগোষ্ঠীর এই মর্মন্তুদ পরিণতিকে মিয়ানমার সরকার কর্তৃক জাতিগত নিধনের ‘টেক্সটবুক’ উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছে, এত দ্রুত জাতিসংঘ এ ধরনের ইস্যুতে কঠোর মন্তব্য করেছে তার উদাহরণ সম্ভবত নেই।
সম্প্রতি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এবং নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের ‘রোহিঙ্গা সংকটে’ উদ্বেগও মিয়ানমারকে তার দলন-নিপীড়ন থেকে বিরত রাখতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক চাপে মিয়ানমার বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও জাতিসংঘকর্মীদের রাখাইনে কয়েকদিন আগে ঢুকতে দিয়েছে। ঢাকায় একজন মন্ত্রীকেও পাঠিয়েছে আলোচনার জন্য, এসবই মিয়ানমার সরকারের বিশ্বকে ধোঁকা দেয়ার চাল মাত্র। এতসবের মধ্যেও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর থেমে থেমে নির্যাতন চলেছে, ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। এখনও প্রতিদিন বাংলাদেশে ৪/৫ হাজার করে রোহিঙ্গা ঢুকছে। সাম্প্রতিক আশ্রয় নেয়া ৫ লক্ষাধিক, গত বছরের প্রায় ১ লাখ এবং এর আগে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়াসহ রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১০ লাখের মতো হবে।
এছাড়া পাকিস্তান, ভারত, সৌদিআরব, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের নানা দেশে আগে থেকে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ৬ থেকে ৭ লাখের মতো হবে। এভাবে দেখা যাচ্ছে মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক এসব রোহিঙ্গাকে কয়েক দশক ধরে বাস্তুচ্যুত করেছে মিয়ানমার সরকার। একটি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নাগরিক অধিকারবিহীন, মৌলিক ও মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ তাদের বিশ্বের সবচাইতে ‘ভাগ্য বিড়ম্বিত’ ‘রাষ্ট্রবিহীন’ নাগরিক আখ্যাও দিয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাস করা একটি জনগোষ্ঠী স্বদেশভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে দেশে দেশে ঠাঁই খুঁজে বেড়াচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বিশ্ব সম্প্রদায়, বাংলাদেশের প্রশংসা করছে। ত্রাণও পাঠাচ্ছে, ভাল কথা, কিন্তু যারা এ জনগোষ্ঠীর জীবনে মহাবিপর্যয় এনেছে এবং একটি শান্তিকামী দেশের ওপর যে দায় চাপিয়ে দিয়েছে সে দেশটির বিরুদ্ধে যে কঠোর ভূমিকা নেয়ার কথা তা নিচ্ছে না বরং বড় দেশগুলি হিসাব কষছে তাদের স্বার্থ কতটুকু সুরক্ষিত করা যায় মানবতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে।
রাশিয়া-চীন একসময় সমাজতন্ত্রের দর্শনে বিশ্বাসী ছিলো। শোষণ মুক্তির সংগ্রামে শোষিত, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের সেই দর্শন এখন পুঁজি আর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে আটকা পড়েছে অবশ্য এই দুটি দেশ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে এখন সরে এসেছে। যে ভারত ‘পঞ্চশীলা’ নীতির সমর্থক, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী ভারত এখন কট্টর জাতীয়তাবাদী, উগ্রধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের প্রচারক সেজেছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে চীন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সমর্থন করেছে, আজ মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে সমর্থন করছে- এতে আশ্চর্য হবার কি আছে! বাংলাদেশ ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের উগ্র আঞ্চলিকতবাদী, সহিংস গোষ্ঠীর তৎপরতা রুখে দিয়ে ভারতের স্বার্থ নিরাপদ করেছে অথচ ভারত আজ বাংলাদেশের পাশে না দাঁড়িয়ে মিয়ানমারের উগ্র জাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিস্ট শক্তিকে সমর্থন করছে।
পাকিস্তানও আজ রোহিঙ্গা সম্যসায় নিশ্চুপ। তারা চীনকে রুষ্ট করতে চায় না, তাই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম নিধনযজ্ঞে তার নিস্পৃহ ভূমিকা। আমাদের নাগরিক সমাজ কিংবা গণমাধ্যম পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে একেবারেই নিশ্চুপ। ‘সার্ক’ আঞ্চলিক জোট ভুক্ত দেশসমূহের বাংলাদেশের এই সংকটে দেশটির পাশে থাকা বাঞ্ছনীয় ছিলো। কেন এই জোট নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে তা জানার অধিকার জোটভুক্ত দেশের জনগণের রয়েছে। ভারত কিংবা পাকিস্তান এই দু দেশের একগুঁয়েমি আর উত্তেজনার খেসারত কেন দেবে অন্য রাষ্ট্রগুলি?
‘আসিয়ান’ ভুক্ত দেশগুলিও রোহিঙ্গা সংকটে চুপচাপ রয়েছে। এখানে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি প্রাধান্য পাচ্ছে- কেন? ভিয়েতনামের মতো সমাজতান্ত্রিক দেশটিও টুঁ-শব্দ করছে না। ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র, ‘আসিয়ান’ গ্রুপ অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে এই দেশটি, তাহলে কেন কাছের দেশের একটি জনগোষ্ঠীর বিপর্যয়ে এরা মিয়ানমার সরকারকে কিছু বলছে না?
ওআইসি কেন ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারছে না? আমেরিকা দু’ একটি কথা বললেও মিয়ানমার সরকারকে ঘাঁটাবে না কেননা চীনকে ঐ অঞ্চলে সে মোকাবেলা করতে চায়, মিয়ানমারে তার বিনিয়োগ এখন বাড়তে শুরু করেছে। শান্তিবাদী দেশ জাপান একেবারেই কোন কথা বলছে না এই ইস্যুতে।
অথচ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের ভূমিকা বিশ্বে প্রশংসিত, সেই সাথে জাতীয় উন্নয়ন, অগ্রগতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, বহু মত-পথের ধর্ম-সংস্কৃতি নিয়ে এগোচ্ছে, ছোট বড় সকল দেশের সঙ্গে তার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত উন্নত। তা হলে কেন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়াবেনা এসব দেশ। মিয়ানমারের ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলিকে কেন সমর্থন করবে তারা?
শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ইস্যুতে সঠিক পথেই চলেছেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক, গণমাধ্যম তাঁর ও বাংলাদেশের কূটনীতিকে ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বলছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রবর্তিত পররাষ্ট্র নীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরীতা নয়”- এটি শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করছেন।
বৃহৎশক্তির চাপ কিংবা অযৌক্তিক মনোভাব তিনি জাতীয় নীতির আলোকে মোকাবেলা করছেন। ফলে বিশ্বে তাঁর ভূমিকা উজ্জ্বল হয়েছে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের মনে রাখতে হবে যে এটি বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা নয়, এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, এর সৃষ্টি তাদের হাতে, তাই এই সংকট সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে, প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে তাদের কেননা মিয়ানমার জাতিসংঘের সকল মৌলিক ও মানবিক সনদ, নীতিমালা একতরফাভাবে লঙ্ঘন করছে।
জাতিসংঘ যদি সমস্যা-সংকট সমাধানে ইরান-উত্তর কোরিয়া কিংবা তারও আগে লিবিয়া, সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে, মিয়ানমারের বেলায় তা হবে না কেন? বাংলাদেশকে তাই ধৈর্য ধরে কোনপ্রকার উস্কানির ফাঁদে পা না দিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক