বৃহত্তর বাংলার কবি জসীমউদ্‌দীন

বিমল গুহ

বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে বাংলা কাব্যজগতে জসীমউদ্‌দীনের আগমন। তখন বাংলা কবিতার আকাশে ররীন্দ্রনাথ এক উজ্জ্বলতম আলোকস্তম্ভ। সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথের কাব্যপ্রবণতার বিপক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন সমকালীন তরুণ কবিরা। কবিতাকে তাঁরা নতুন বাণীভঙ্গিতে, নতুন চেতনায়, নতুন প্রতীক ও মননশীলতায় ভিন্নতর করার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছিলেন। বিষয়ে ও বিন্যাসে এই তরুণদের কাব্যভাবনাও ছিলো নতুন। বাংলা কবিতার এই পালাবদলের কালে কাব্যাঙ্গনে এলেন ভিন্নকণ্ঠের কবি- জসীমউদ্‌দীন। কবিতায় নাগরিকতার বদলে গ্রামবাংলার দিকে পা বাড়ালেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের সর্বগ্রাসী প্রভাবকে স্বীকার করেও স্বপ্রণোদিত হয়ে পল্লীর প্রকৃতি ও পল্লীর আবহমান সংস্কৃতিকে কবিতার উপাদান হিসেবে গ্রহণ করে জসীমউদ্‌দীন সেই সময়ে চমক সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে ছিলো স্বাজাত্যবোধের চেতনা ও অহংকার।
রবীন্দ্র-পরবর্তী প্রতিবাদী তরুণ কবিরা প্রায় সবাই ছিলেন ‘কল্লোল’ যুগের প্রতিনিধি কণ্ঠস্বর এবং তাঁরা ছিলেন বাংলা কবিতার বৈচিত্র্য সাধনে নতুন সুরের সাধক। জসীমউদ্‌দীনও ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, ‘কল্লোল’ পত্রিকায় লিখেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাব্যপ্রভাব থেকে মুক্তিলাভের সাধনায় প্রতিবাদী তরুণদল যেভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে নতুন কবিতার পরীক্ষানিরীক্ষায় ব্রতী হয়েছিলেন; নতুন বিষয় ও বাণীভঙ্গির জন্য বিশ্বসাহিত্যের পাঠ গ্রহণ করেছিলেন; জসীমউদ্‌দীন সে-পথে না গিয়ে হাত পাতলেন পল্লীপ্রকৃতি ও বাংলার ঐতিহ্যের বিশাল ভাণ্ডারের কাছে। গ্রামবাংলার জীবনাচরণ তাঁর কাছে যেন এক পরিপূর্ণ জগৎ। জসীমউদ্‌দীনের কাব্যভাবনা ছিলো দেশীয় পরিমণ্ডল-আশ্রিত, তবে তাঁরও ছিলো বিষয়বস্তুর স্বাতন্ত্র্য। রবীন্দ্র-পরিমণ্ডলে থেকেও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের জন্য আলাদাভাবে চিহ্নিত করা গিয়েছিলো জসীমউদ্‌দীনকে। যদিও সমকালের জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে প্রমুখ কবি থেকে তাঁর মেজাজ ও কাব্যোপলদ্ধির বেশ দূরত্ব ছিলো। জীবনানন্দ ছিলেন ইতিহাস-সচেতন আধুনিক মননের কবি। গ্রামীণ প্রকৃতি জীবনানন্দের কবিতায় নতুন চিত্রকল্পে নতুনরূপে উদ্ভাসিত হয়েছে। সমকালের অন্য অনেকের মধ্যে এই প্রবণতা ছিলো। তবে এঁদের কারো রচনায় গ্রামীণ প্রকৃতি ও লোকজীবন জসীমউদ্‌দীনের মতো সাবলীলভাবে উঠে আসেনি। বিষ্ণু দে লোকজীবনে দেখতে পেয়েছিলেন বাস্তব জীবনের এক অপরাজেয় জীবনীশক্তি। কিন্তু জসীমউদ্‌দীনের গ্রাম হাজার বছরের ঐতিহ্যসমৃদ্ধ সহজ সরল লোকজীবন-পরিবেশ, যার সাথে সম্পৃক্ত ছিলো লোকসাহিত্যের সজীব উপকরণ।
আধুনিক যুগমানসের সকল ক্ষেত্রে যখন নাগরিক জীবন স্থান করে নিচ্ছিলো, তখন জসীমউদ্‌দীন আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার সাথে গেয়ে গেছেন লোকজীবনের জয়গান। এ প্রসঙ্গে সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়ের উক্তিটি স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছেন- ‘অন্যেরা পল্লীকে দেখেছেন নগরের বাতায়ন পথে। রোমান্টিক বাতাবরণ সৃষ্টি করে তার একটা মোহময় রূপের ছবি তাঁরা সর্বসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন তা ঠিক; কিন্তু তা কখনই আত্মারযোগে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেনি। কবিতার প্রকাশকলায় এঁরা ছিলেন রবীন্দ্রানুসারী। সুতরাং অনেকটাই নাগরিক রুচির অধিকারী। পল্লীপ্রকৃতির স্বভাবধর্মের যথার্থ প্রতিফলন তাঁদের কাব্যের ভাষায় তাই অনুপস্থিত। এখানেই অন্য কবিদের উপর জসীমউদ্‌দীনের জিত।’ কারণ, তিনি উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন- পল্লীপ্রকৃতির গভীরেই আমাদের বাঙালিসত্তা ও সংস্কৃতির শিকড় প্রোথিত।
জসীমউদ্‌দীন তাঁর কাব্যচর্চার শুরু থেকেই সচেতন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন তাঁর মেজাজ ও প্রকাশভঙ্গির ভিন্নতার জন্য। তিনি যখন পল্লীর মানুষের ভাষাভঙ্গিকে তাঁর কবিতার আশ্রয় করে নিচ্ছিলেন, তখন রবীন্দ্রবলয় অতিক্রমী আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান ধারার উন্মেষকাল। বাংলা কাব্যপ্রবাহ যে-আধুনিকতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে, তার ব্যতিক্রমকণ্ঠ যখন পুরানো কাব্যভূমি থেকে গভীর তাৎপর্য নিয়ে উচ্চারিত হলো- সেই ব্যতিক্রমটাই মানুষের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করলো। আধুনিক শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত হয়েও, পৃথিবীর উন্নত দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে পরিচিত থেকেও জসীমউদ্‌দীন নিজ দেশের মাটির গন্ধকে গায়ে মেখেছেন গৌরবের সাথে। বলতেই হয়, অত্যন্ত সাহস ও প্রত্যয়ের সাথে। তাঁর সাহস এই যে, তিনি বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রাণস্পন্দনটি ধরতে পেরেছিলেন। কবিতায় তিনি যে-শাশ্বত বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে এনেছেন- তাতেই ধ্বনিত হয়েছে সাধারণ মানুষের প্রাণস্পন্দন। সমাজের অবহেলিত জনগোষ্টীকেও তিনি স্থান করে দিয়েছেন আধুনিক সাহিত্যে- এ ভাবনাই যেন কঠিন। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাহিনীকাব্যের নায়িকা হিসেবে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের এক উক্তি উদ্ধৃত করা যায়। তিনি বলেছেন- ‘জসীমউদ্‌দীন ব্যতীত আর কোন আধুনিক বাঙালি কবি নমুদের ঘরের কালো মেয়েকে কাব্যের নায়িকা করেননি। দৃষ্টিভঙ্গির এই স্বচ্ছতাই জসীমউদ্‌দীনের স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য।’ নাগরিক মনস্কতার সর্বাত্মক প্রভাবের কালে পল্লীজীবন ও পল্লীপ্রকৃতির মায়ায় আকৃষ্ট হয়েছিলেন জসীমউদ্‌দীন। গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে জসীমউদ্‌দীন কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন জীবনের সত্যকে।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, লোকাচার, লোকমানসের বিভিন্ন অনুষঙ্গ জসীমউদ্‌দীনের চেতনায় যে-প্রভাব ফেলেছে, তা প্রকাশিত হয়েছে তাঁর রচনায়। লোকজীবন-আবহের সঙ্গে হৃদয়ের আর্তি আর ভালোবাসা মিলিয়ে কবিতায় তিনি ঐতিহ্যের গুরুত্বকেই প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। গ্রামীণ সমাজভাবনাকে কাব্যে সঞ্চারিত করে তিনি আমাদের চেতনাকে ছুঁয়ে গেছেন, যে কারণে তিরিশের সেই প্রবল পাশ্চাত্য-প্রভাবের বেড়ি ডিঙিয়ে সাধারণ কাব্যশৈলীর সেই উচ্চারণ স্থায়ীরূপ পেয়েছে আমাদের কাব্যসাহিত্যে। গ্রামকে তিনি খণ্ডিতরূপে দেখেননি, দেখেছেন স্থির বিশ্বাসে পরিপূর্ণ এক বিশ্বরূপে। জসীমউদ্‌দীন বাঙালির কাছে স্মরণীয় কবিতায় লোকজ উপকরণ ব্যবহারের জন্যই শুধু নয়- লোকমানসের ভাব, ভাষা, কল্পনাপ্রবণতা ও মেজাজকে যথার্থভাবে বুঝতে পেরেছিলেন বলেই। আধুনিক যুগযন্ত্রণা, জীবনজটিলতা থেকে তিনি একটু দূরেই থেকেছেন; কাব্যের ভাষাভঙ্গিতে বিশেষ কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেননি। কিন্তু বিষয় ও প্রকরণে ঐতিহ্য সংরক্ষণের অগ্রণী ভূমিকা ছিলো তাঁর। পল্লীর পরিবেশ ও আবহের যথার্থ কাব্যরূপদানে তাঁর প্রচেষ্টা আশ্চর্যজনকভাবে সফলতা লাভ করেছে।
সুজলা সুফলা বাংলার রূপ বাঙালির আজন্ম আকর্ষণ। বাংলার পল্লীপ্রকৃতি এখনো সেই অপরূপ রূপে বিরাজমান। বাংলার লোকশিল্প ও সাহিত্যে প্রাচীন ঐতিহ্য এখনো প্রভাব বিস্তার করে আছে। আমাদের চেতনায় স্থায়ী হয়ে আছে আমাদের কৃষ্টি, আমাদের লোকাচার। আধুনিক যুগমানসের সকল প্রভাবকে ছাড়িয়ে পল্লীর শান্তরূপের ধ্যানে মগ্নথাকা যে-কারো পক্ষে প্রায় অসম্ভব। জসীমউদ্‌দীন এ ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর গ্রামকেন্দ্রিক নদীমাতৃক বাংলার সজীব প্রকৃতিকে একান্ত আপন করে ধরে রাখতে পেরেছিলেন বলেই। লোকসাহিত্যের ঐতিহ্যকে যুুগের মর্জিমাফিক প্রয়োগ করেছেন আধুনিক সাহিত্যে, সেটা ছিলো জসীমউদ্‌দীনের নাড়ির টান। লোকসমাজের প্রতি অসীম দরদ ও মমত্ববোধ তাঁর কাব্যে ফুটে উঠেছে। যে কারণে সেই পরিবর্তনশীল কাব্যপরিবেশে, জসীমউদ্‌দীনের সৃষ্টি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিভূ হয়েছে, গৃহীত হয়েছে মানুষের কাছে।
জনগণের জন্য রচিত হয় সাহিত্য। সুতরাং বৃহত্তর জনসাধারণের সাথে সংযোগ থাকলেই সাহিত্যের উদ্দেশ্য সফল হয়। সাহিত্যের লৌকিক প্রবণতাকে তাই কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। এর সহযোগেই রচিত হয় জাতীয় সাহিত্যের স্বরূপ। লোকজ জীবন-উপকরণ পরিমার্জিত ও সংশোধিত রূপে আধুনিক সাহিত্যের উপজীব্য করেছেন বলেই তাঁর প্রয়াস বাংলার মানুষের কাছে গ্রহণীয় হয়েছে। ভাষা, ছন্দ ও অলংকার ব্যবহারে আধুনিক
আধুনিক শিল্পমানসিকতার পরিচয় যেমন তাঁর কাব্যে পাওয়া যায়, তেমনি জীবনের অভিজ্ঞতাকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ব্যবহারেরও পরিচয় বিধৃত হয়েছে তাঁর রচনাভঙ্গিতে। তাঁর নিজস্ব জীবনদৃষ্টি ও প্রয়োগ কৌশলের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের জন্যই জসীমউদ্‌দীনের কবিতার স্থান আমাদের সাহিত্যে আলাদা।
দেশে দেশে বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, সব সাহিত্যেই লোকজ উপকরণের ঐতিহ্যকে ঘিরে রচিত হয়েছে চিরকালীন সৃষ্টিসম্ভার। স্ব স্ব সাহিত্য ভাণ্ডারকে তা সমৃদ্ধ করেছে। প্রাচীন লোকগাথা, রূপকথা, প্রবাদ ইত্যাদির মধ্যেই প্রাচীন সাহিত্যের ভিত্তি রচিত এবং বৃহত্তর সমাজগোষ্ঠীর সাথে এর সম্পর্ক ওতপ্রোত। প্রকৃত অর্থে যে-কোন জাতির ঐতিহ্য ও ইতিহাস লোকজ-উপকরণ-নির্ভর হয়ে থাকে। জসীমউদ্‌দীনের ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘সকিনা’ ইত্যাদি কাহিনীকাব্য লোকগাথার প্রেরণাসমৃদ্ধ এবং আধুনিকতার গুণসমৃদ্ধ। এগুলি মূলত লোকঐতিহ্যেরই অনুসৃতি। জসীমউদ্‌দীনের কবিমানসে লোকজীবন ও লোকঐতিহ্য কোন কিছুর প্রতিক্রিয়ার ফসল নয়, বরং তা বৃহত্তর বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে নিবিড় ও প্রত্যক্ষ পরিচয়ের ফল- যা জসীমউদ্‌দীনের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য। এ কারণেই জসীমউদ্‌দীন আমাদের প্রাণের কবি, বৃহত্তর বাংলার কবি।