বৃষ্টি ও ঐন্দ্রিলা এবং একটি পোস্টার

মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ

এক.
ল্যাবের কাজ শেষে বিকেল চারটা নাগাদ একটু কলা ফ্যাকাল্টির ঝুপড়ির দিকে গেলাম। আলীর দোকানে দেখি ধোঁয়া ওঠা প্লেটভর্তি গরম গরম খিচুড়ি বিক্রি হচ্ছে তখনও। অর্ডার করতেই দুটো শসা কাটা, একটা কাঁচা মরিচ আর এক ফালি পেঁয়াজ প্লেটের এক কোণায় খিচুড়ির সাথে সাজিয়ে সামনে এনে দিল। টপাটপ খিচুড়ি সাবাড় করে চায়ের কাপে দুয়েকটা চুমুক দিয়েছি কি দি নাই অমনি টিনের চালে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এল।
বাইরে চিৎকার চেঁচামেচি করে আড্ডারত ছেলেমেয়ে সবাই ছুটাছুটি করে যে যেদিকে পারল দোকানের ভিতর ঢ়ুকে পড়ল। এমন সময় এক তরুণী স্কুটি চালিয়ে ঝড়ের বেগে ঝুপড়ির সামনে এসে থামল। তরুণী যে দর্শনীয় ভঙ্গিতে স্কুটি থেকে নামল তা কেবল সিনেমাতেই দেখা যায়। ঝুপড়ির চারপাশের সবক’টা চোখ যেন নিমিষেই তরুণীর দিকেই আটকে গেল।
রূপসী তরুণী আলীর দোকানের ঠিক বিপরীত পাশে পশ্চিম সারির এক দোকানে ঢুকে বেঞ্চিতে গিয়ে বসল। সেখানে আগে থেকেই কয়েকজন ছাত্রনেতা আড্ডা দিচ্ছিল। তরুণীটি তাদের কারও একজনের ঘনিষ্ঠ কেউ হবে হয়ত।
ওখানে আড্ডার মধ্যমণি হিসেবে হাবভাবে ও কথাবার্তায় যাকে প্রতীয়মান হচ্ছে তার বড় ছবি সংবলিত পোস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের এখানে-সেখানে দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে। সে যেখানে বসে আছে ঠিক তার সামনের জারুল গাছেও সাঁটানো তার ছবি সংবলিত একটা পোস্টার বৃষ্টিতে ভিজে চুপসে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার এবারের নতুন কমিটিতে সে সিনিয়র সভাপতি না এরকম একটা বড়সড় পদ পেয়েছে, তাই নিয়েই পোস্টার।
অহংকারী ভঙ্গিতে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ছোটখাট গড়নের ছাত্রনেতাটি মাঝে মাঝে আড়চোখে ছবিটির দিকে তাকাচ্ছে। মনে হয় ভিজতে থাকা পোস্টারের ছবির জন্য তার নিজেরও বেশ কষ্ট লাগছে এবং রাগ হচ্ছে খুব। ছবি ভিজিয়ে নষ্ট করতে থাকা প্রতিপক্ষ যদি বৃষ্টি নাহয়ে এখন অন্য কেউ হত তাহলে এতক্ষণে সে দা-চাপাতি নিয়ে বের হয়ে পড়ত ! বৃষ্টি বলেই এ যাত্রায় রক্ষে !
এই আলোচিত ছাত্রনেতাটি আমার স্কুল জীবনে খুব কাছের একজন বন্ধু ছিল। ভেবে অবাক হই, ক্লাসের সবচেয়ে বোকা ও নরমসরম টাইপের ছেলেটিই কিনা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচাইতে ডাকসাইটে ও দুর্ধর্ষ একজন ছাত্রনেতা হয়ে উঠেছে।
দুই.
বৃষ্টি থেমে গেছে। ছেলেমেয়ে এক এক করে কমতে শুরু করেছে। স্কুটিওয়ালীও ভেজা বাতাসে খোলা চুল উড়িয়ে কোথায় যেন চলে গেল। ওদিকে নন্দন লাইব্রেরির পাশের চায়ের দোকানটিতে জনাবিশেক ছেলেমেয়ে জটলা পাকিয়ে কিছু একটার যেন আয়োজন করছে। কাছে গিয়ে দেখা গেল পেছনে একটা বড় সাদা কাগজে গোটা গোটা হরফে লেখা-আজ পিঙ্কির জন্মদিন!
পিঙ্কি নামের মেয়েটি একটা কেক সামনে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার চেহারা আনন্দে ও উত্তেজনায় ঝলমল করছে ! তার বন্ধুরা সবাই কেক খাওয়ার অপেক্ষায় তাকে ঘিরে আছে। কেকের ওপর ইয়া বড় সাইজের দুটি মোম জ্বলছে। আশেপাশের দোকানে হয়ত ছোট ছোট বার্থডে মোম পাওয়া যায়নি, তাই পড়ার মোম দিয়েই কাজ চালিয়ে দিচ্ছে !
যার বার্থডে সে মোববাতিগুলো ফুঁ দিয়ে নিভিয়েই তবে কেক কাটবে সে নিয়ম, এখানে মোম বাতিগুলোর কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে সবাই কেক কাটা ও খাওয়াখাওয়ি নিয়ে মহাব্যস্ত হয়ে পড়ল ! একজনকে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছুটা লুকিয়ে চুপিয়ে ক্রমাগত কেক খেতে দেখা গেল। বেচারার পেটে মনে হয় অনেক খিদে, সারাদিন ক্লাসের ব্যস্ততায় লাঞ্চটাই হয়ত করা হয়ে ওঠেনি আজ, বান্ধবীর জন্মদিনের কেকেই তাই পেট ভরানোর চেষ্টা।
এখানে বাকিরাও কম যায় না, কে কার চেয়ে বেশি কেক খেতে পারে সে কম্পিটিশনে নেমেছে যেন আজ। বন্ধু-বান্ধবদের ছেলেমানুষি কাণ্ডকারখানা দেখে মেয়েটি হেসেই খুন। সে একে ওকে ড়েকে ড়েকে কেক খাওয়াচ্ছে আর ছবির জন্য অবিরাম পোজ দিয়ে যাচ্ছে।
মেয়েটি আনন্দে ছটফট করছে। আহ, আজ তার বড়ই সুখের দিন। আজ থেকে অনেক বছর পর সে যখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আর থাকবে না তখন আজকের এ স্মৃতিগুলো তাকে উদ্বেল করে তুলবে।
তিন.
সেদিন যে তার জন্মদিন ছিল সে কথা তার ঘুণাক্ষরেও মনে ছিল না। ওরা সেকথা ঠিকই মনে রেখেছিল। এর আগেরদিন ক্লাসে তার বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র করার মত করে তারা কি বিষয় নিয়ে যেন ফিসফাস করেছিল। পিঙ্কি মনে মনে তাদের ওপর একটু রাগও করেছিল। ওরা তাহলে তাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই ওসব গোপন বৈঠক করেছিল ? তাকে কিছু বুঝতে না দিয়েই তারা শহর থেকে আস্ত একটা কেক নিয়ে আসল ও কি সুন্দরভাবে বার্থডে পার্টিরও আয়োজন করে ফেলল।
পাগলগুলো এখন সব কোথায় কে জানে ? ওই যে দুষ্ট আজাদটা, মজার মজার জোক বলে সবসময় যে সবাইকে মাতিয়ে রাখত, আর প্রাণের সখিরা ওই যে তাসি, ঐন্দ্রিলা ওরা সব এখন কোথায় কে জানে ?
এ সব ভাবতে ভাবতে কখন যে তার দুগণ্ড বেয়ে দরদর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়বে..