বৃটেনে তারেকের পরিচয় কী?

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা

বাংলাদেশ বনাম অধ্যাপক গোলাম আযম মামলার রায় ঘোষণার সময় নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে বেশকিছু সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ঐতিহাসিক সেই রায়ে বলা হয়েছিলো, ‘অকাট্য না হলেও পাসপোর্টই আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশি নাগরিকত্বের প্রমাণ’। কেউ যখন ভিনদেশে অবস’ান করবে, পাসপোর্টই একমাত্র পরিচিতি। সেই পরিচিতি নিয়ে এখন তুমুল প্রশ্ন দেশের অন্যতম বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের দেওয়া একটি বক্তব্যই এই আলোচনার সূত্রপাত। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্তরাজ্যে গিয়ে শাহরিয়ার বলেছিলেন যে, পাসপোর্ট সমর্পণ করে তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন। প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা দেখা দেয়।
এ বক্তব্যের জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে উড়িয়ে দিয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী উষ্মা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান তারেক। নোটিশে তার আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল উল্লেখ করেন, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এ বক্তব্য রাখা হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে হেয় করতেই এ বক্তব্য, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বক্তব্য। ১০ দিনের মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার করে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় তাদের সবার বিরুদ্ধে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা করা হবে।’
তবে ১০ দিন নয়; লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর দিনেই এ বিষয়ে নিজের বক্তব্য নিয়ে হাজির হন শাহরিয়ার আলম। গতকাল সকালে দেশে ফেরার পর সন্ধ্যায় গুলশানে নিজের বাসায় সংবাদ সম্মেলন করেন প্রতিমন্ত্রী। এ সময় তিনি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০১৪ সালের জুন মাসের ২ তারিখে ব্রিটিশ হোম অফিস (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে তারেক রহমান, স্ত্রী জোবায়দা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান ও মঈনুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির পাসপোর্ট হস্তান্তর করার বিষয় উল্লেখ করা হয়। সেখান থেকে ওই পাসপোর্ট লন্ডনে বাংলাদেশের দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে। পাসপোর্টগুলো এখন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সেখানে রক্ষিত আছে বলেও জানান তিনি।
বিভিন্ন সময়ে তারেকের পাসপোর্ট নবায়নের তথ্য তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালে ওই পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। এরপর যুক্তরাজ্যে যান ছয় মাসের ভিসা নিয়ে। লন্ডনে গিয়েই তিনি দুই বছর মেয়াদি পাসপোর্ট নবায়নের উদ্যোগ নেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। এরপর তিনি আর মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেননি।
পাসপোর্ট জমা দেওয়ায় তারেক রহমানের নাগরিকত্ব থাকল কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশে পাসপোর্ট ছাড়া থাকার বিষয়টি ভিন্ন। এখন তো তার কাছে বাংলাদেশের কোনো পরিচয়পত্র থাকল না। কেননা তার কাছে স্মার্ট পরিচয়পত্র নেই। ২০০৮ সালে এটি ছিল না। একমাত্র পরিচয়পত্র ছিল পাসপোর্ট। সেটিও তিনি জমা দিয়েছেন।
শাহরিয়ার আলম প্রশ্ন করে বলেন, ‘লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে সবুজ পাসপোর্ট জমা দিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন তারেক রহমান। সেই তারেক রহমান কীভাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন?’
তারেক রহমান বৃটেনের নাগরিকত্ব নিয়েছেন কি-না, এই প্রশ্নের জবাবে শাহরিয়ার আলম বলেন, সে বিষয়ে তাকেই (তারেক) জিজ্ঞেস করুন। তবে সে দেশে তারেক নাগরিকত্বের কোনো আবেদন করেননি বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী।
এ আইনজীবী বলেন, বৃটেনের নাগরিকত্ব গ্রহণের তো প্রশ্নই আসে না। তিনি বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ একটি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। অতএব, অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের প্রশ্নই আসে না। তিনি ওই দেশের অভিবাসন আইন অনুযায়ী বৈধভাবে ওখানে আছেন।
অন্যদিকে, তারেক রহমানের পাসপোর্ট সমর্পণ নিয়ে যখন আলোচনার ঝড়, তখন প্রসঙ্গক্রমে সামনে চলে আসছে তিন বছর আগের একটি ঘটনা। ২০১৫ সালের ২৩ জুন হাইকোর্ট প্রশ্ন রেখেছিলেন, এক ব্যক্তির নামে চারটি পাসপোর্ট ইস্যু করা হয় কীভাবে? ২০০০ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে তারেকের নামে চারটি আলাদা পাসপোর্ট ইস্যু হয়েছিলো বলে জানিয়েছিলেন সেই সময়ের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস। অবশ্য সেই চারটি পাসপোর্টের বিষয়ে তথ্যগত অগ্রগতি আর দেখা যায়নি।
এখন যে পাসপোর্ট নিয়ে আলোচনার ঝড়, সেই পাসপোর্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে রক্ষিত আছে বলেই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর শক্ত অবস’ান। এমনকি বাংলাদেশে ফেরার জন্যে তারেক এবং তার স্ত্রী-কন্যার কাছে কোনোরকম বৈধ পরিচয় নেই বলেও বক্তব্য দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। নিয়ম অনুযায়ী তারেককে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে হলে প্রথমে বাংলাদেশি নাগরিকত্বের আবেদন করতে হবে বলেও স্মরণ করিয়ে দেন প্রতিমন্ত্রী। ফলে এ নিয়ে চলমান রাজনীতিতে বিএনপি আরেকটু বেকায়দায় পড়তে যাচ্ছে বলেই মনে করেন অনেকে।
সংবিধানের প্রথম ভাগে ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে উল্লেখ রয়েছে- ‘বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে। বাংলাদেশের জনগন জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবে।’
সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তারেক রহমানের বর্তমান পরিচিতি কী- তা নিয়ে প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরেও। প্রবাসে ব্যক্তির একমাত্র পরিচয় যখন পাসপোর্ট, আর সেই পাসপোর্ট যখন সমর্পিত হয়, তখন তার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক।