জাতিসংঘ দিবস

বিশ্ব মানবতার ভরসাস্থল জাতিসংঘ

মো. আবুল হাসান, খন রঞ্জন রায়

জাতিসংঘ বিশ্বের প্রায় দুই শতাধিক রাষ্ট্রের শান্তি, উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবেশ, মানবাধিকারসহ নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করে। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এটি আন্তর্জাতিক উচ্চতার একটি অনন্য সংস্থা। বিশ্বের যেখানেই যুদ্ধ বিগ্রহ, হিংসা, হানাহানি, দ্বন্দ্ব, সংঘাত সেখানেই জাতিসংঘের পক্ষ থেকে নেয়া হয় অভিভাবকের ভূমিকা। বৃহত্তর স্বার্থে এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনঃগঠন ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে, বিরোধ-বিবাদ নিরসনে, শান্তি রক্ষায়, বিভিন্ন দেশে এইডস, জিকা ভাইরাসের মতো মারণ্যব্যাধির বিরুদ্ধে প্রচারণা, অর্থসহায়তা দেওয়া, ক্ষুধা-দারিদ্রোর বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে।
১৯৪৫ সালের ১৫ এপ্রিল এ সংস্থার নীতিমালা তৈরীর লক্ষ্যে আমেরিকার সানফ্রাসিসকোতে মিলিত হবার সিদ্ধান্ত হয়। সানফ্রাসিসকোতে ৫০ জাতির প্রতিনিধিরা মিলিত ৪৯ জন বিশ্বখ্যাত রোটারিয়ানের নেতৃত্বে জাতিসংঘের চার্টার নির্ধারণ করেন। ১৯৪৫ সালের ২৬ জুলাই ৫১টি দেশের স্বাক্ষরে চার্টার পাশ হয়। এ চার্টারের ভিত্তিতে পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ জন্মলাভ করে।
জাতিসংঘের ৬টি মূল সংস্থা রয়েছে। এর মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ।
নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনক্রমে সাধারণ পরিষদের গোপন ভোটে জাতিসংঘের মহাসচিব নিযুক্ত হন। পাঁচ বছরের জন্য নিযুক্ত হন মহাসচিব। মহাসচিব জাতিসংঘের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা। মহাসচিবকে বিশ্ব শান্তির অভিভাবকও বলা হয়। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মহাসচিবগণ হলেন-
নরওয়ের ট্রিগভেলি, সুইডেনের দাগ হ্যামারশোল্ড, মিয়ানমারের উ থান্ট, অস্ট্রিয়ার কুট ওয়াল্ডহাইম, পেরুর পেরেজ দ্য কুয়েলার, মিশরের বুট্রোস বুট্রোস ঘালি, ঘানার কফি আনান, দক্ষিণ কোরিয়ার বান কি মুন।
জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেন। ১৯৭৯-৮০ সনে বাংলাদেশ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৮৫-৮৬ সালে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ৬৯০০ জন শান্তিসেনা জাতিসংঘের ৪২টি মিশনে কর্মরত। আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাকে জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করতে বাংলাদেশ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এসব বিষয়ে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পুরস্কার পেয়েছে বাংলাদেশ।
বর্তমান রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলছে। বাংলাদেশে জাতিসংঘের ১১টি সংস্থা কাজ করছে। জাতিসংঘের অনেকগুলো কমিটিতে বাংলাদেশ যুক্ত রয়েছে।
এসডিজি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বিশ্বজুড়ে গরিবি হটাতে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ থেকে হাতে নিয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৯৩ দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান পনেরো বছর মেয়াদি ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করেন জাতিসংঘ সদর দফতরে। বিপুল করতালি আর হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে গৃহীত হয় ১৬৯টি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। লক্ষ্যমাত্রাটি সুদুরপ্রসারী ও গণকেন্দ্রিক, বিশ্বজনীন রূপান্তর সৃষ্টিকারী লক্ষ্য ও টার্গেট অন্তর্ভূক্ত, ‘গ্লোবাল গোলস’ বা ‘২০৩০ এজেন্ডা’ হিসেবে অবহিত ১৫ বছর মেয়াদি এজেন্ডাটির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ২০১৬ এর ১ জানুয়ারি থেকে।
২০৩০ সালের লক্ষ্য এজেন্ডায় সবার ও সব দেশের জন্য প্রযোজ্য ১৭টি লক্ষ্য অন্তর্ভূক্ত: (১) সব ধরনের দারিদ্র দূর করা (২) ক্ষুদা দূর করা (৩) সবার জন্য স্বাস্থ্যকর জীবন ও কল্যাণ নিশ্চিত করা (৪) সবার জন্য অন্তর্ভূক্তিমূলক ও মানসম্মত এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চত
করা (৫) নারীদের সম-অধিকার এবং তাঁদের ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা (৬) সবার জন্য টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও পয়নিস্কাশনের ব্যবস্থা করা (৭) সবার জন্য সুলভ, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করা (৮) সবার জন্য স্থায়ী, অন্তর্ভূক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনেতিক কার্যক্রম উৎসাহিত, পরিপূর্ণ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং উপযুক্ত কর্মের নিশ্চয়তা প্রদান করা (৯) স্থিতিশীল অবকাঠামো তৈরি, অন্তর্ভূক্তিমূলক এবং টেকসই শিল্পায়ন ও উদ্ভাবন উৎসাহিত করা (১০) অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা (১১) নগর ও জনবসতিগুলো অন্তর্ভূক্তিমূলক, নিরাপদ, স্থিতিশীল ও টেকসই করা (১২) টেকসই উৎপাদন ও ভোগ নিশ্চিত করা (১৩) জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার বিরূপ প্রভাবের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা (১৪) পরিবেশ উন্নয়নে সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা (১৫) স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন ও টেকসই ব্যবহার, মরুকরণ প্রতিহত এবং ভূমির মানে অবনতি রোধ ও জীববৈচিত্র্যের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা ১৬) টেকসই উন্নয়নে শান্তিপূর্ণ এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজ তৈরি, সবার জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ এবং সর্বস্তরে কার্যকর, দায়বদ্ধ ও অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, (১৭) টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পদ্ধতিগুলো শক্তিশালী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জোরদার করা। এই ১৭টি লক্ষ্যের অধীনে রয়েছে সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট, সময়বদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য ১৬৯ টি টার্গেট । টার্গেট বাস্তবায়নে প্রয়োজন বিশ্বব্যাপী দক্ষ শ্রমশক্তি বা ডিপ্লোমা পেশাজীবী।
জাতিসংঘ পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি রোধ, অস্ত্রসজ্জা হ্রাসে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে। যুদ্ধ, উত্তেজনা ও সহিংসতা বন্ধে জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সাথে ভারসাম্যমূলক ভূমিকা পালন করছে। শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জাতিসংঘ মানবজাতির ভরসাস্থল। বিশ্বে সকল সদস্য রাষ্ট্রের উচিত জাতিসংঘকে শক্তিশালী করা এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের উন্নতিকল্পে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সাহায্য করা।
লেখকদ্বয় : ডিপ্লোমা শিক্ষা আন্দোলনের সংগঠক