বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী

জীববৈচিত্র্যের সাথে জীবনের বৈচিত্র্য, সবুজের বৈচিত্র্য, পৃথিবীর প্রাণের সংবেদনশীলতার বৈচিত্র্য, পৃথিবীকে যে প্রাকৃতিক সুখময়তা, স্বাচ্ছন্দ ও নান্দনিকতা দিয়েছে – তা-ই মাটি, পানি-বাতাস-প্রাণ আর আলোকময় পৃথিবীকে প্রাণের বাসযোগ্য, জীবনের চাষযোগ্য একমাত্র গ্রহে পরিণত করেছে।
পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ, যেখানে প্রাণ ও প্রাণির চর্চা ও পরিচর্যা আছে। জীবন ও প্রকৃতির মাঝে নিবিড়, নিগুঢ়, নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্কের এ পৃথিবীতে সবুজের সাথে প্রাণের, বাতাসের সাথে ঘ্রাণের, পানির সাথে বাষ্প ও মেঘের খেলা-মেলা ভেলা পৃথিবীর প্রাণে প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছে।
জীবন ও সৃষ্টিরহস্যঘেরা, রহস্যভরা পৃথিবীর নান্দনিকতা তার প্রাণে, তার সবুজে, তার আলো-বাতাসে। পৃথিবীতে প্রাণের স্পন্দন, সবুজের বন্ধন, পাখির গান, কীট-পতঙ্গের বাহারি বর্ণের উচ্ছলতা – বিহ্বলতা, বাতাসের বয়ে চলা, বলা না বলার ছন্দময়তা ছড়িয়েছে ছন্দ, বাড়িয়েছে সৌখিন্য।
পৃথিবী হয়েছে প্রাণের জন্য সুষমাময়, ছন্দময়, উপভোগ্য, উপযোগ্য।
জীববৈচিত্র্যই পৃথিবীকে প্রাণবৈচিত্র্য, ভাববৈচিত্র্য রসবৈচিত্র্য রসময়, কথাময় করে সবুজ জীবের উপযোগিতা বাড়িয়ে দিয়েছে। জীবের জন্য, জড়ের জন্য নিরাপদ, নির্ভেজাল বাস্তুতান্ত্রিক পৃথিবীর রহস্যময়তা তার বৈচিত্র্যে – বিশেষ করে জীববৈচিত্র্যে।
বর্ণিল, রসময়, গন্ধময়, ভাবময় পৃথিবীর বাস্তুতান্ত্রিকতা, জীববৈচিত্র্য বিভিন্ন কারণে চরমভাবে হুমকিতে পড়ে পৃথিবীর বৈচিত্র্যময়তাকে দারুণভাবে হুমকিতে ফেলে দিয়েছে বিভিন্নভাবে। ভোগবাদিতা এবং পরিবেশ বৈপরীত্য নানান কর্মকাণ্ডই এর উস্কানিদাতা, ইন্ধন জোগানদার। জীববৈচিত্র্যতার সাথে নিবিড় সম্পর্কযুক্ত অর্থনীতির প্রধান সূচক কৃষি, বন, মৎস্য এবং পর্যটন।
শিল্পের বহুমুখি বিকাশের সাথে দেশে দেশে যে ভাবে এবং যে প্রক্রিয়াতে জল, বায়ু-মাটি সবুজ এবং প্রাকৃতিক অমূল্য সম্পদসমূহের উপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে তা-ই প্রকারান্তরে এবং সরাসরি পরিবেশ ভারাসাম্যতার ধবংসলীলার অবশেষের উপর দাঁড়িয়ে পরিবেশ দূষণের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বময়। স্থলে-জলে-পাহাড়-পর্বতে।
বাতাস কার্বনের, সালফারের, নাইট্রোজেন ও বহুমাত্রিক রসায়নের বিষাক্ত বাষ্পে ভারি হয়ে বাড়িয়ে দিচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। তাড়িত করছে জলবায়ুর পরিবর্তনকে। পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ুর পৃথিবীর তাপমাত্রা, রং-রূপ-গন্ধ। বনভূমির উজাড় হওয়া, জলাভূমির বিনাশ হওয়া, উম্মুক্ত খালবিলের নিশ্চিহ্ন হওয়া এখন সময়ের চেয়েও দ্রুত গতির সামাজিক তথা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।
দেশে দেশে বনভূমি, জলাভূমি বিলীন হওয়ায় দারুণভাবে জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে।
ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটর প্রতিবেদনে দেশে দেশে যে শংকা ও সংখ্যার কথা পর্যালোচিত হয়েছে তা মানবতার বিপন্নতারই বিকল্পবার্তা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্বিপাকে পাকখাওয়া, লড়াকু মানুষের বৈচিত্রেভরা বাংলাদেশে সর্বশেষ হিসাবে একশত আট প্রকারের উদ্ভিদ ও প্রাণি-প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। ৩৩ প্রজাতির পাখি, ৩৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণি, ২১ প্রজাতির সবুজ গাছ এবং ২১ প্রজাতির মাছ বিপন্নতার শীর্ষে আছে। আর এসবের বিপন্নতার মূলে আমাদেরই কর্মকাণ্ড নিহিত। কৃষিকাজে কীটনাশকের বিচ্ছিন্ন ও ব্যাপক ব্যবহার সবুজের বিনাশ, পরিবেশদূষণআশ্রিত বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক কর্মকাণ্ড, ভূমিধস, ভূমি উজাড়, ভূমিক্ষয়, জলাভূমি নির্মূল, খালবিল, নদী, নালার অপমৃত্যু বা উন্নয়নজনিত মৃত্যু এবং এসবের সামগ্রিকতায় জলবায়ু দূষণ ও পরিবর্তনের প্রধানতম কারণ।
মানুষের সামগ্রিক সচেতনতার অভাবে জলজ, স্থলজ ও বৈশ্বিক প্রাণির অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ে আছে। বাস্ততান্ত্রিকতা, অভিযোজনে বহু প্রজাতির প্রাণি, উদ্ভিদকে কোনভাবেই টিকে থাকতে দিচ্ছে না। জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩ দেশেই এ অবস্থা কমবেশি বিরাজ করছে।
ঘন জনবসতির বাংলাদেশে অর্থনৈতিক স্তর পরিবর্তনের উচ্চাশা আমাদের বন সংকোচনের মধ্য দিয়ে এগুচ্ছে। বিভিন্ন প্রকার ময়ূর, বন্যহাঁস, সারস, টিয়া, ময়না, চিল, দাঁড়কাক, ঈগলকে আর দেখা যায় না। বিভিন্ন প্রজাতির বানর, কাঠবিড়ালি, বনরুই বিলুপ্তপ্রায়। চিতল, টেংরা, খলিসা, মেনি, কালিকা প্রভৃতি মাছও বিলুপ্ত।
মিঠাপানির রিজার্ভার, খাল-বিল বিলুপ্ত হওয়া, ভোক্তা বেড়ে যাওয়া এর অন্যতম কারণ। আমাদের প্রজন্মকে আমরা আমাদের ঐতিহ্যে পরিচিতিও দেইনি, সম্পর্কও গড়িনি। এ প্রজন্ম জানেই না যে, আমাদের কি কি ছিল। তাদের কোন কোন বিষয়বস্তুকে পরিচর্যা করা দরকার। অতীত, বর্তমান, কোন প্রকার ঐতিহ্য নিয়েই আমরা ভাবিত নই। উদ্বিগ্ন নই। তাবৎ দুনিয়ার মানুষের সাথে এখানেই আমাদের বিশাল ও বিস্তৃত ফারাক।
সুন্দরবন বিপন্ন, দেশের বনাঞ্চল বিপন্ন। নদী-খাল-বিল যা-ও আছে কম বেশি বিপন্ন। একটি প্রজাতি বিপন্ন হওয়া যদি আমাদের তাড়নায় নিজ নিজ অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার অনুষঙ্গ হতো, এতে আমরা তাড়িত হতাম।
বন্যপ্রাণিকে আমরা পণ্য করেছি। আমাদের ঐতিহ্যকে আমরা পণ্য করছি। মাটি, পানি সবুজের সাথে আমাদের রুচি, শুচি, বোধ, বিবেক পণ্যময় হয়ে যাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য আমাদের অস্তিত্বের সুরক্ষা ও অংশীদার। এটি অরক্ষিত করে আমরা সুরক্ষিত থাকতে পারি না।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃতি বৈপরীত্য নিয়ন্ত্রিত রাখতে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে পণ্যময়করণ থেকে মুক্তি দিতে হবে। এ মাটি, ভূমি, বাতাস, জল, জলার অংশীদার শুধু মানুষ নয়, অপরাপর সব প্রাণিও প্রজাতি। এ বোধে প্রতিটি বিবেক জাগ্রত হতে হবে।
হালদা, কর্ণফুলী, বান্দরবান, সুন্দরবন, আমাদের ঐতিহ্যের অংশ, তা আমাদের বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের বোধে শক্তভাবে প্রোথিত করতে হবে। পদ্মা, মেঘনা, সুরমা অথবা গারো পাহাড়, হাওড়-বিল আমাদের অহংকারের অতীত, গর্বের বর্তমান এবং ঐতিহ্যের ভবিষ্যৎ, তার জাগরণ তারুণ্যে ও বার্ধক্যে থাকতে হবে।
ঐতিহ্যের অহংকার, জাতিসত্তার গর্ব, দেশাত্মবোধের চর্চা, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার তাড়না আমাদের পরিবেশ ও সর্বপ্রকার বৈচিত্র্য দারুণভাবে সংরক্ষণে প্রেরণার উৎস হতে পারে। আসুন, এসবের মধ্যদিয়ে আমরা বাস্তুতান্ত্রিকতা ধারণ করি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করি। অস্তিত্ব সংরক্ষণ করি।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক

আপনার মন্তব্য লিখুন