নিজ দেশের বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে কতটুকু জানো?

বিশ্ববিখ্যাত বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের গল্প

Untitled-1

ছোটবেলা থেকে আমরা বিজ্ঞান সম্পর্কিত যত বই পড়ে এসেছি, প্রায় সব বইতেই বিজ্ঞানী মানেই আমেরিকা, জার্মানী, ইংল্যান্ড প্রভৃতি রাষ্ট্রের বিজ্ঞানীকে দেখতাম। আলবার্ট আইনস্টাইন,আইজ্যাক নিউটন, ম্যাক্স প্ল্যাংক এর মতো বড় বড় বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণা কর্ম দ্বারা বিজ্ঞানের দুনিয়ায় বিপ্লবের পর বিপ্লব বয়ে এনেছিলেন। বিখ্যাত কোনো বিজ্ঞানীর নাম বলতে বললে আইনস্টাইন, নিউটন, হকিং এর নামই বলা হয়। বাংলাদেশে কি কোনো বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী নেই?
এই প্রশ্নটি অনেকের মাথায়ই আসে। আজকের লেখায় মূলত বিশ্ববিখ্যাত কয়েকজন বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর জীবন ও তাদের গবেষণা কর্ম নিয়ে আলোচনা করবো। তার আগে একটি কথা বলে নেই, বিশ্বখ্যাত বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের আমরা খুব একটা না চিনলেও অন্যান্য দেশে তাদের বেশ ভালো পরিচিতি আছে। এর কারণ আমাদের দেশের মিডিয়াকে এই দিকে খুব একটা মনোযোগ দিতে দেখা যায় না। তবে ইদানীং মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বেশ ভালো বিজ্ঞান বিষয়ক মিডিয়া কভারেজ দিচ্ছে।

জগদীশ চন্দ্র বসু
প্রথমেই শুরু করলাম স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুকে দিয়ে। তিনিই বাংলার প্রথম বিজ্ঞানী যার সারা পৃথিবীতেই ব্যাপক সুনাম রয়েছে। মোটামুটি আমরা সকলেই তাকে চিনি এবং জানি। ১৮৫৮ সালে ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে পদার্থবিদ এবং উদ্ভিদবিজ্ঞানী। গাছের যে প্রাণ আছে সেটা সর্বপ্রথম তিনিই আবিষ্কার করেন। তার গবেষণার কারণেই জানা সম্ভব হয়েছে যে, গাছের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ইত্যাদির অনুভুতি আছে।
মাইক্রোওয়েব নিয়ে তার গবেষণা পদার্থবিজ্ঞানের একটি বিপ্লবই বলা যায়। তিনিই প্রথম ৫ মিলিমিটার ক্রমের তরঙ্গ তৈরি করেন যা বর্তমানে রাডার, টেলিভিশন, মহাকাশ যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া রেডিও নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা তিনিই শুরু করেছিলেন।
সম্মননাসমূহ
জগদীশ চন্দ্র বসু ভারতীয় উপমহাদেশ ও ইউরোপ হতে ব্যাপক প্রশংসা, বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন এবং বিভিন্ন সম্মানজনক পদে আসীন ছিলেন। সেগুলোর মাঝে উল্লেখযোগ্য হলঃ
১। নাইটহুড, ১৯১৬
২। রয়েল সোসাইটির ফেলো, ১৯২০
৩। ভিয়েনা একাডেমি অফ সাইন্স-এর সদস্য, ১৯২৮
৪। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস-এর ১৪তম অধিবেশনের সভাপতি, ১৯২৭
৫। লিগ অফ ন্যাশন্স কমিটি ফর ইনটেলেকচুয়াল কো-অপারেশন এর সদস্য
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ সাইন্সেস অফ ইন্ডিয়া-এর প্রতিষ্ঠাতা ফেলো। এর বর্তমান নাম ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সাইন্স একাডেমি।
১৯৩৭ সালের ২৩ শে নভেম্বর এই বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী মৃত্যুবরণ করেন।

ড. মাকসুদুল আলম
বিখ্যাত জিনতত্ত্ববিদ হিসেবে ড. মাকসুদুল আলম বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হতে বিভিন্ন উদ্ভিদের জিনোম উন্মোচনের জন্য তার ডাক পড়েছে এবং তিনি সবগুলোতেই সফল হয়েছিলেন। জিনতত্ত্বে তার সফল গবেষণার ও কাজের দরুন সারাবিশ্বে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তিনি সফলতার সাথে একে একে রাবার, ছত্রাক ও পেঁপের জিনোম সিকুয়েন্স আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। অতঃপর তিনি পাটের জিনোম সিকুয়েন্স আবিষ্কারের দিকে মনোযোগ দেন এবং ২০১০ সালে তিনি সফলভাবে পাটের জিনোম সিকুয়েন্স আবিষ্কার করে ফেলেন।
তার এই অনবদ্য আবিষ্কার ঐ বছরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন। বাঙালির এই তারকা ১৯৫৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ২০১৪ সালের ২০ ডিসেম্বর যুক্ররাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান করেন।

ড. জামাল নজরুল ইসলাম
মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি কী হবে তা মূলত আমরা স্টিফেন হকিং এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীর লেখা বই হতেই জানতে পেরেছি। কিন্তু তার অনেক আগেই ১৯৮৩ সালে জামাল নজরুল ইসলাম তার লেখা The Ultimate Fate of the Universe নামক বইতে মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং এর অন্তিম পরিণতি সম্বন্ধে ব্যাখ্যা দেন। তার এই বইটি জাপানি, ফরাসি, পর্তুগিজ ও যুগোশ্লাভ প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হয়। সারাবিশ্বের বিজ্ঞানী মহলে এই বইটি অনেক প্রশংসা অর্জন করে। এতে বুঝা যায়, কসমোলজিতে বাঙালি বিজ্ঞানীরা কম যায় না। তার আরো কিছু উল্লেখযোগ্য বই হল- ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৪) ডব্লিউ বি বনোর এর সাথে যৌথভাবে সম্পাদনা করেন। রোটেটিং ফিল্ড্‌স ইন জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৫) কেমব্রিজ থেকে প্রকাশিত। অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি (১৯৯২) কৃষ্ণ বিবর, বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত। মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ রাহাত -সিরাজ প্রকাশনা। শিল্প সাহিত্য ও সমাজ, রাহাত-সিরাজ প্রকাশনা। স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস। স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত দ্য ফার ফিউচার অফ দি ইউনিভার্স, এনডেভারে প্রকাশিত। জামাল নজরুল ইসলাম ১৯৩৯ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিএসসি ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য কেমব্রিজে পাড়ি জমান। ১৯৬৪ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে এস সি ডি (ডক্টর অফ সায়েন্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড, কেমব্রিজের ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোনমি, ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটি প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৮৪ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে প্রফেসর হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৬ মার্চ ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের তরুণদের বিজ্ঞান গবেষণায় উৎসাহিত করার কাজে রত ছিলেন। বিখ্যাত এই কসমোলজিস্টের মৃত্যুর সংবাদ বিভিন্ন দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে বেশ ফলাও করে প্রচার করা হয়। ২০০১ সালে তিনি একুশে পদক পান।