বিশ্বকবির বিশ্বমানের গল্প

আবুল মোমেন
18493423_1470805982939939_1320914370_o

রবীন্দ্রনাথ মূলত কবি। তাঁর কবিতাতেও গল্পের উপাদান কম নেই। আমরা কেবল সোনারতরী (১২৯৮-১৩০০) কাব্যগ্রন্থ থেকেই বেশ কয়েকটি কবিতার তালিকা দিতে পারি, যার বীজ গল্প, যেমন – হিংটিং ছট, পরশপাথর, দুইপাখি, গানভঙ্গ, যেতে নাহি দিব, পুরস্কার। পরের বই চিত্রায়ও (১২৯৯-১৩০২) গল্পসমৃদ্ধ কবিতা আছে, যেমন দুই বিঘা জমি, পুরাতন ভৃত্য। আর কথা (১৩০৪-১৩০৬) এবং কাহিনী (১৩০৪-১৩০৬) তো মূলত নানা উৎস থেকে নেওয়া গল্পের কাব্যরূপ। ক্ষণিকার (১৩০৭) কৃষ্ণকলি যেন নিটোল একটি ছোট গল্প। গল্প আছে শিশুতে (১৩১০), বিশেষ করে বিখ্যাত বীরপুরুষ কবিতাটি। গল্প ফিরে এসেছে ভালোভাবে পলাতকায় (১৩২৫), বেশির ভাগ কবিতাই এক একটি গল্প, আরও পরে পুনশ্চ (১৩৩৯) জুড়ে গল্প-ভিত্তিক কবিতারই প্রাধান্য ঘটেছে।
তাঁর এ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছেন বাংলাভাষা ও সাহিত্যের অগ্রণী গবেষক সুকুমার সেনও। তিনি লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের গল্প তাঁর কবিতারই সহযোগী। … পদ্যেও রবীন্দ্রনাথ অনেক গল্প লিখে গেছেন এবং সেগুলো কবিতাও বটে, গল্পও বটে’।
রবীন্দ্রনাথ গল্প রচনায় হাত দিয়েছিলেন তেইশ বছর বয়সে। অবশ্য এরপরে ছ-সাত বছর হাত গুটিয়ে থেকে তিরিশ বছর বয়সে একেবারে গল্পের জোয়ার এসেছিল তাঁর।
তেইশ বছর বয়সে লেখা দুটি গল্পই – ঘাটের কথা ও রাজপথের কথা – আদতে কবির ভাবুকতার প্রকাশ। ঘাট এবং রাজপথ অর্থাৎ স্থিতি ও গতি কিংবা আসা ও যাওয়া, যা রবীন্দ্রভাবনায় বারবার ফিরে ফিরে এসেছে, গানে এসেছে অনেক ভাবে, তারই ভিন্নতর বয়ান। এ যেন ঠিক গল্প নয়, ভাবাবেগপূর্ণ রচনা। কিন্তু এর পরে ছয় বা সাত বছরের ব্যবধানে পাঁচ বছরের মধ্যে কবি লিখে ফেললেন তেতাল্লিশটি গল্প। এ যেন গল্পের জোয়ার। এই উৎকৃষ্ট গল্পের মধ্যে রয়েছে দেনাপাওনা, পোস্টমাস্টার, গিন্নি, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, সম্পত্তি সমর্পণ, দালিয়া, কঙ্কাল, মুক্তির উপায়, জীবিত ও মৃত, কাবুলিওয়ালা, ছুটি, সুভা, দানপ্রতিদান, মধ্যবর্তিনী, শাস্তি, সমাপ্তি, মেঘ ও রৌদ্র, প্রায়শ্চিত্ত, নিশীথে, ক্ষুধিত পাষাণ, অতিথি। কেমন শস্য ফলেছে একবার ভাবুন, আমি স্থান সংকুলানের কথা ভেবে তেইশটির মাত্র নামোল্লেখ করলাম, বেশ নিষ্ঠুর হয়ে। গল্প লেখার এমন প্রবল জোয়ার রবীন্দ্রজীবনে আর আসেনি, তবে গল্প ও উপন্যাস মিলিয়ে কথাসাহিত্য রচনা আর থেমে থাকেনি। কোনো কোনো বছর ছ-সাতটি গল্পও লিখেছেন, আর বছর ছয়েকের বিরতি দিয়ে শেষ চারটি গল্প লিখেছেন শেষ বয়সে – রবিবার, শেষকথা, ল্যাবরেটরি এবং প্রগতিসংহার।
চৌত্রিশ বছরের মধ্যে রচিত এসব গল্পে বিজ্ঞ পাঠক তাঁকে বিশ্বগল্পের দুই মহারথী ফরাসি গি দ্য মোপাসাঁ (১৮৫৩-৯৩) এবং রুশি আন্তোন চেখভের (১৮৬০-১৯০৪) সাথে তুলনা করতে শুরু করেন। কিন্তু এ তুলনা যথার্থ বলে মনে হয়নি কবির, কেন তা কবির ভাষ্যেই শোনা যাক – ‘গদ্যের ভাষা গড়তে হয়েছে আমার গল্পপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে। মোপাসাঁর মত যেসব বিদেশী লেখকের কথা তোমরা প্রায়ই বলো, তাঁরা তৈরি ভাষা পেয়েছিলেন। লিখতে লিখতে ভাষা গড়তে হলে তাঁদের কী দশা হত জানিনে।’
অখণ্ড গল্পগুচ্ছের সূচিতে আছে মোট পঁচান্নবইটি গল্পের নাম। কিন্তু এর মধ্যে দুটি গল্প – শেষ পুরস্কার ও মুসলমানীর গল্প – তাঁর বিবেচনায় খসড়া, চূড়ান্ত রূপ আর লেখা হয়নি। ছোটগল্প নামে সংকলিত গল্পটি শেষকথার পাঠান্তর। এছাড়া ভিখারিনী সতের বছর বয়সের কাঁচা লেখা। উপন্যাস করুণাও এ বয়সেরই রচনা যেটি তিনি শেষ করেননি, মুকুল তুলনামূলকভাবে একটু পরিণত হলেও অন্য পাঁচটি রচনার মত এটাও তিনি গল্পগুচ্ছে অন্তর্ভুক্ত করেননি। ফলে বাকি থাকে ঊননব্বইটি গল্প যা কবির বিবেচনায় গল্প হিসেবে উত্তীর্ণ।
তৎকালীন পূর্ব বাংলায় অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের পদ্মাতীরবর্তী জমিদারি দেখাশুনা করতে করতে রবীন্দ্রনাথ বাংলার প্রকৃতি আর গ্রামজীবনের বৈচিত্রের সাথে পরিচিত হয়েছেন। প্রকৃতির বৈচিত্র ও সৌন্দর্যের নানা রূপ তাঁকে মুগ্ধ করেছে, কিন্তু গ্রামজীবনের মধ্যে তিনি যেমন অনেক চরিত্র পেয়েছেন তেমনি জীবনসত্যের বাস্তব রূপটিও দেখেছেন, তাতে নিরঙ্কুশ সৌন্দর্য সামান্যই, অধিকাংশ জুড়ে আছে বঞ্চনা, প্রতারণা, নিষ্ঠুরতা, অন্যায়, আছে দুঃখি নরনারীর অফুরন্ত বেদনার মূক মলিন হাহাকার। আর যে ত্যাগ ও মহত্বের পরিচয় পাই তারও ভিত্তি কিন্তু বঞ্চিতের বেদনাময় ঔদার্য।
গ্রামবাংলার বাইরে এসে মফস্বলের অভিজাত পরিবারের কাহিনি বলেন তিনি, কখনো কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত নাগরিক জীবনের গল্পও বলেছেন, কয়েকটি গল্পে হাওয়া-বদলের জন্যে বাঙালির পছন্দের ছোট কোনো নগরের কথা এসেছে – পশ্চিমের যেসব নগর পাহাড় বা অরণ্য অথবা সমুদ্রের কোল ঘেঁেষ প্রাকৃতিক আদিমতার আবহ সাজিয়ে রাখে।
একটা প্রশ্ন হয়ত উঠতে পারে যে তাঁর অধিকাংশ গল্পই বিয়োগান্তক, কখনো একের মিলনের মধ্যেও অপরের – প্রায়ই মুখ্য চরিত্রের – জন্যে বিয়োগ-ব্যথাই সত্য হয়ে থাকে। মিনির জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের মধ্যেও পাঠকের অনুভূতিতে প্রধান হয়ে ওঠে কাবুলিওয়ালার বেদনা, আবার গল্পের মুখ্য চরিত্র পোস্টমাস্টারের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য কলকাতায় পরিবারের সাথে মেলার উপলক্ষটিতে তাঁকেও ছাপিয়ে ওঠে বালিকা রতনের অন্তরের অস্ফূট বিচ্ছেদ-বেদনার বোধ।
মধ্যবর্তিনীতে নিবারণ তার প্রথম স্ত্রী হরসুন্দরীকে ফিরে পেয়েও অন্তরের একজন রূপে পেল না, নষ্টনীড়ে ভূপতি চারুকে প্রায় ফিরে পেতে পেতেও শেষ পর্যন্ত পেল না, চারুও ভূপতির সহযাত্রী হওয়ার আহ্বানে সাড়া দিতে পারল না, তার শেষকথা – না থাক। মেঘ ও রৌদ্রে গিরিবালা ও শশিভূষণের জন্যে বৈষ্ণব ভিক্ষুক গুপিযন্ত্র আর খোল করতাল বাজিয়ে কেবল গানের সুরেই বলতে পারে – ফিরে এসো, বাস্তবের দূরত্ব তাতে ঘোচে না। কেবল সমাপ্তির কথা মনে পড়ছে যেখানে অপূর্ব ও মৃন্ময়ীর মিলন ঘটে – গল্পের ঘটে মধুরেণ সমাপয়েৎ।
অধিকাংশ গল্পে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা যেন খানিকটা অভিভাবকের। অনেক গল্পেই বাৎসল্য রস মুখ্য হয়ে ওঠে, বেশির ভাগ গল্পের মূল নারী যতটা নায়িকা তার চেয়ে বেশি কন্যা। একালের বিচারে তাঁর গল্পের নায়িকাদের একটি বড় অংশই তো বালিকা – রতন, মিনিরা নিতান্ত শিশু, গিরিবালা (নষ্টনীড়), মৃন্ময়ী (সমাপ্তি), হৈমন্তী, সুভারা (সুভা) বালিকাই; পরিণত অনিলা (পয়লা নম্বর) চারুলতা (নষ্টনীড়), অচিরা (শেষকথা) সোহিনী (ল্যাবরেটরি) – এদের প্রতিও কবির অভিভাবকের নজর ও বিবেচনা বোঝা যায়।
শেষে বলব বাঙালির সহিত্যভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আর আমাদের ছোটগল্পের সেরা অংশটি বিশ্বসাহিত্যের মানদণ্ডে শীর্ষে থাকবে, এবং সেখানে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প তো বিশ্বকবির এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সৃষ্টি।