বিমল গুহ’র উড্ডীন শব্দরাজি

মুহম্মদ নূরুল হুদা

বিমল গুহ’র চরণমালার প্রধান অহংকার ‘অক্ষরবৃত্ত’। বস্তুত আবহমান বাংলা কবিতাও এ পথেই এগিয়েছে। শ্বাসাঘাতপ্রধান স্বর কিংবা হালকাচালের মাত্রা যে তাঁর কবিতায় দোলে না এমন নয়, তবে তেমন উদাহরণ বিস্তর নয়। স্বরের এই নিমগ্ন বহমানতাই বিমল গুহ’র কবিচরিত্রকে শনাক্ত করে। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে লিখতে শুরু করে এই কবি আজ পঁয়ষট্টি বছর বয়সে পদার্পণ করেছেন। তাঁর কবিতাচর্চার বয়স সিকি শতাব্দীরও অধিক। ১৯৮২ সনে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম গ্রন্থ, তারপর গত বিশ বছরে প্রকাশিত একক কবিতাগ্রন্থের সংখ্যা নয়টি। আবার সব কবিতা থেকে নির্বাচন করে প্রকাশ করেছেন নির্বাচিত কবিতা।

বাংলাদেশে নতুন কবিতার শুরু পঞ্চাশ দশকে হলেও এখানকার কবিতার মৌলিক ও নিরীক্ষাপ্রবণ বৃদ্ধি ঘটেছে মূলত ষাটের দশকে। এই দশকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে কবিতার যে বহুবর্ণময় নান্দনিক শরীর, তা দ্বিতীয়ার্ধ থেকে লক্ষযোগ্যভাবে পালটে যেতে থাকে। এর প্রধান কারণ সমকালীন সমাজে অস্থিরতা এবং বদলপ্রবণ ব্যক্তিক ও সামষ্টিক মানুষ। সবশেষে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, যা একটি রাষ্ট্র ও জাতীয়তার পাশাপাশি একটি নতুন কাব্যভূখণ্ডের অস্তিত্বকেও প্রত্যাসন্ন করেছে। ফলে সত্তরের দশকে এসে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে কবিতার আঙ্গিক ও চিত্তধর্মে ভিন্নতা এসেছে। এই ভিন্নতাকে প্রকট করতে গিয়ে কোনো কোনো নতুন কবিকর্মী উৎকেন্দ্রিক ও ঐতিহ্যছুট নিরীক্ষা-প্রবণতার আশ্রয় নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বাংলা কবিতার বহমান সাবলীলতাকে নিজের ভঙ্গিতে ব্যঞ্জনাময় করেছেন। বিমল গুহ এই শেষোক্ত কবিদের দলে। অর্থাৎ কবিতার স্বীকৃত ব্যাকরণ ও রূপৈশ্বর্যকে দখল করে উত্তীর্ণ কবিতা রচনায় ব্রতী হয়েছেন। যাঁরা উৎকেন্দ্রিকতা ও স্বয়ম্ভূ নিরীক্ষা প্রবণতায় উচ্চকিত তাদের সিদ্ধি বহুলাংশে প্রশ্নাতীত। কবিতা বহুরকম হলেও সম্পূর্ণ নতুন রকমের কবিতা লেখার জন্য চাই সনাতন কবিতার ওপর অর্জিত দখল। বিমল গুহর কবিতায় এই ঐতিহ্যিক অর্জন সহজেই চোখে পড়ে। এর আরেকটি কারণ বোধকরি এই কবির পারিবারিক ঐতিহ্য।
ঐতিহ্য মূলত পারিবারিক উত্তরাধিকার। বিমল গুহর মাতামহ ছিলেন লোককবি ও গায়ক, আবার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী এই মহান যোদ্ধা। কবিতার পাঠ গ্রহণ করেছেন তিনি কবিয়ালের অনায়াস দক্ষতা থেকে। তাই তো বিষয়ভিত্তিক কবিতা রচনার পাশাপাশি সহজ ও সুবোধ্য ভঙ্গিতে একটি সর্বাঙ্গ সুন্দর কবিতা লেখাই তাঁর আরাধ্য বলে মনে হয়। দ্ব্যর্থবোধ কাব্যচাতুরীর আশ্রয় না নিয়ে বরং ব্যঞ্জনাময় সরল উচ্চারণে আপন অস্তিত্বের গান গেয়েছেন তিনি:

‘আমার অস্তিত্বে বাজে অহর্নিশ সমুদ্রের গান
মায়াবী পর্দায় ঝরে রেণু রেণু বৃষ্টির পারদ
ভিজে-মাটি আবহওয়া তামস চনমনে,
আমার সমস্ত কাজে উচ্চারণে
একটি গর্জন মূর্ত হয়-
রোমশ ভয়াল,
প্রচলিত শব্দ নয়
মায়াবী অস্তিত্বে যেন উচ্চারিত সমস্তের সুর।’

এই কটি চরণে বিমল গুহ’র কাব্যচিন্তাও বিশেষভাবে প্রতিভাত। প্রচলিত শব্দ যে কবির শব্দ নয়, রোমশ ভয়াল উচ্চারণ যে কবির উচ্চারণ নয়, এই সত্য তিনি উপলব্ধি করেছেন। তাঁর গন্তব্য মূলত মায়াবী অস্তিত্ব। উল্লসিত মাটি ও মানুষের কাছাকাছি থেকেও তিনি লোকাচার থেকে বিচ্যুত, কেননা তিনি হতে চান বহমান জলধারার অনেক গভীরে নিরবচ্ছিন্ন মৌন ঢেউ। অর্থাৎ তাঁর কবিসত্তার উপরিতলে যদিও সমুদ্রের গর্জনময় সংগীত, তাঁর ভিতরতলে মৌন নিমগ্নতা। এই তো প্রকৃত কবির রূপ। শব্দকে নিয়ে খেলা করেন তিনি, কিন্তু ডুব দেন তাঁর ব্যাপ্ত রহস্যময়তায়। তিনি জানেন শব্দ শুধু শব্দের ভেতরে ডুব দেয় না, শব্দ ধরতে চায় চিত্তকেও- চিত্ত ধরতে চায় একটি বৈধ বর্ণনাকে। আবার সেই বৈধ বর্ণনার আড়ালে লুকোচুরি খেলে চেতন-অচেতন জগৎ। বিমল গুহ’র কবিতায় তাই স্বযত্নচর্চিত শব্দানুষঙ্গের পাশাপাশি জেগে উঠছে উড্ডীন চিত্রমালা :

‘উপুড় করা দুটি পায়ের পাতা
যুগল পায়রা যেন আহার খুঁটছে আনমনে
দুই পাশে সমান্তরাল দুই হাত
বাতাস ছোঁয়ার আনন্দে সঞ্চরমান
দুটি ডানা।
সব মিলে সে এক আদিম প্রজাপতি
নীলিমার দিকে ধাবমান।’

হরেক বিষয়ে কবিতা লিখেছেন তিনি। দেশ-সমাজ-ব্যক্তি-মানুষ-মুক্তিযুদ্ধ এবং ব্যক্তিক ও সামষ্টিক নানা আবহ তাঁর কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে। জীবনসংগ্রামে অনাপোসী এই কবি বোঝাপড়া করেননি অসুন্দরের সঙ্গে। তাঁর অস্থিমূলে দ্রোহের আগুন, চোরাবালির সঙ্গে তাঁর অনিবার্য সংঘাত। প্রকৃত কবি তো জেগে থাকেন সংঘাত ও আগুনের মুখোমুখি। তবে তাঁর বুক জোড়া প্রেম- এই প্রেম ব্যক্তিক ও সামষ্টিক। এই নিয়ে তিনি গড়তে চান আপন সৌধ:

‘কবি তাঁর সমস্ত প্রচেষ্টায়
শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে বানাতে চাইলেন
শতাব্দীর সৌধ; দীর্ঘশ্বাসে
দাঁড়ালেন শতাব্দীর শেষপ্রান্ত ছুঁয়ে
হাত তুলে স্বাগত জানালেন আগামীকে।’

বিশ শতকের সপ্তম দশকে বিমল গুহ তাঁর শব্দরাজি উড়িয়ে দিয়েছেন আকাশে। কিন্তু তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আপন মাটিতে। নিরন্তর উত্তীর্ণ পঙক্তিমালা রচনায় ব্রতী এই কবি এভাবেই সম্ভাষণ জানাচ্ছেন উত্তরকালকে।