বিদায় চট্টলবীর, বিদায়

সালাহ উদ্দিন সায়েম গ্ধ

মৃত্যু যে সন্নিকটে তা কি জানতে পেরেছিলেন চট্টল বীর এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ! মৃত্যুর মাত্র তিনদিন আগে তাঁর আকুতিতে তাঁকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসেন পরিবারের স্বজনরা। এক মাস পর চট্টগ্রামে ফিরে সেদিন নেতাকর্মীদের শ্রদ্ধা ও বুকভরা ভালোবাসা দেখে চোখ বেয়ে জল পড়েছিল এই চট্টল দরদির। এসব ভক্ত নেতাকর্মীদের ছেড়ে তিনি যে শিগগিরই না ফেরার দেশে চলে যাবেন, চোখের জল ফেলে সেটা কি জানান দিয়েছিলেন!
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর মেহেদীবাগের ম্যাক্স হাসপাতালে আওয়ামী লীগের এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদকে যখন লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়, তখন হয়তো নেতাকর্মীদের অনেকেই বুঝেছিলেন, কেন তিন দিন আগে তাদের প্রিয় নেতা তাদের জন্য কেঁদেছিলেন।
রাত যতই গভীর হতে থাকে হাসপাতালে ছুটে আসা নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ততই বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে রাত তিনটার দিকে মহিউদ্দিন চৌধুরীর লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হয়, নিভে যায় চট্টলার বাতি! আইসিইউ থেকে যখন মহিউদ্দিন চৌধুরীর নিথর মরদেহ বের করা হয়, তখন শুভানুধ্যায়ী ও নেতাকর্মীদের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠে হাসপাতালের পরিবেশ।
আরবী বর্ষের পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসের জুমাবার ভোর রাতে ইন্তেকাল করলেন চট্টগ্রামে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বন্দর রক্ষা আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া গণমানুষের এই নেতা। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।
মহিউদ্দিন চৌধুরী স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়ে ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান। ২০০৮ সালে মহিউদ্দিন চৌধুরীর কন্যা ফৌজিয়া সুলতানা টুম্পা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন চট্টগ্রাম নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। আর বড় ছেলে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। ছোট ছেলে বোরহানুল হাসান চৌধুরী সম্রাট ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে জড়িত আছেন।
চট্টগ্রামবাসীর ভালোবাসা, আবেগ ও শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়ে নগরীর চশমা হিলের পারিবারিক কবরস’ানে শায়িত হয়েছেন একাত্তরের এই মুক্তিযোদ্ধা।
চলে যাওয়াই জীবনের নিয়ম। তবে কারো কারো চলে যাওয়া অনেক বেশি কষ্টের। অনেক বেদনার। চট্টগ্রামবাসীর অধিকার আদায়ে সোচ্চার এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন তেমনই একজন। যিনি দলীয় রাজনীতির বাইরে তাঁর জীবনকে জড়িয়েছিলেন সাধারণ মানুষের সাথে। তাই তো অনেকে তাঁকে বলে থাকেন চট্টলার আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতীক, বলেন চট্টগ্রামের অভিভাবক। চট্টলার এই বিপ্লবী নেতার প্রতি শ্রদ্ধা ও শোক জানাতে গতকাল সকালে তাঁর চশমা হিলের বাসায় শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নয়, ছুটে গেছেন প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও। বাসার সামনে গাড়িতে রাখা তাঁর মরদেহ দেখতে ছুটে গিয়েছেন এই শহরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁর কফিনের সামনে গিয়ে অনেককে চোখের জল ফেলতে দেখা গেছে।
ভক্তদের চোখের জল আর জানাজায় লাখো মানুষের স্রোত জানান দিয়েছে, তিনি এই চট্টগ্রামবাসীর কতটা আপন ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে শুধু তাঁর অগণিত দলীয় নেতাকর্মীরা নয়, কাঁদছে গোটা চট্টগ্রামবাসী।
গত ২৬ নভেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় ফেরার পর এই চট্টল দরদি নিজ নিবাসে ফেরার জন্য ছটফট করেছিলেন বলে তখন সুপ্রভাতকে জানিয়েছিলেন তাঁর বড় ছেলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। কিন’ তাঁর রুটিন ডায়ালাইসিস ও ফিজিওথেরাপির জন্য তাঁকে বাধ্য হয়ে স্কয়ার হাসপাতালে রাখতে হয়েছিল।
জানা গেছে, মহিউদ্দিন চৌধুরী গত ১০ বছর ধরে হার্ট, ডায়াবেটিস ও কিডনিজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। ৮ বছর আগে সিঙ্গাপুরে গিয়ে তিনি একবার হার্টের বাইপাস সার্জারি করিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর হার্টের ব্লকে চারটা রিং বসানো হয়েছিল।
গত ১০ নভেম্বর রাতে হঠাৎ তিনি কিডনি জনিত সমস্যা ও মৃদু হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। ভর্তি করা হয় নগরীর ম্যাক্স হাসপাতালে। অবস’ার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য পরদিন দুপুরে তাঁকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় নিয়ে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন’ তাঁর হার্টের অবস’ার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৬ নভেম্বর তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়।
গত ২১ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের অ্যাপোলো গ্লিনিগ্যালস হাসপাতালে তাঁর হার্টের দুটি ব্লকে রিং বসিয়ে অ্যানজিওপ্লাস্টি করা হয়। কিন’ এ দুটি রিং বসানোর পরেও হার্টে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় কিডনিজনিত সমস্যায় বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর শারীরিক অবস’ার আবারো অবনতি হয়। স্বজনরা নিয়ে যান হাসপাতালে। কিন’ অবস’া ক্রমেই অবনতি হতে থাকে। এক পর্যায়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাকে আইসিইউর লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। তখন তাঁর শরীরের অর্গানগুলো (অঙ্গ) নিষ্ক্রিয় হতে থাকে। একপর্যায়ে রাত তিনটার দিকে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বলে জানিয়েছেন ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস’াপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলী খান।
ছাত্র জীবনেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য মহিউদ্দিন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের মেয়র প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন’ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তিনি মেয়র প্রার্থী থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। পরে তাঁর বড় ছেলে ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে গতবছর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্ব দেন দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। অবশ্য ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ফের ক্ষমতায় আসার পরে দলের সর্বোচ্চ পদ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব পেলেও তা প্রত্যাখ্যান করেন মহিউদ্দিন। মৃত্যু পর্যন্ত চট্টগ্রামের গণ্ডিতেই নিজেকে ধরে রেখেছিলেন।
১৯৯১ সালে নগরীর কোতোয়ালি আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে পরাজিত হলেও ১৯৯৪ সাল থেকে টানা তিনবার সিটি মেয়র নির্বাচিত হয়ে ১৭ বছর মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।
১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে হোসেন আহমেদ চৌধুরী ও বেদুরা বেগমের ঘরে জন্ম নেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।