চৈতন্যগলিতে মায়ের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আইয়ুব বাচ্চু

বিদায় গিটার জাদুকর

নিজস্ব প্রতিবেদক

কিংবদনিত্ম আইয়ুব বাচ্চু ফিরলেন ঘুমভাঙা এ শহরে। তবে নিথর, কফিনবন্দি হয়ে। পৃথিবী ছেড়ে উড়াল দিয়েছেন বাংলার এ রকস্টার। লাখো ভক্তকে কাঁদিয়ে ফিরে গেলেন মায়ের কোলে।
গতকাল শনিবার বিকাল ৪টা ৩৯ মিনিটে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠে সম্পন্ন হয় গিটার জাদুকর আইয়ুব বাচ্চুর চতুর্থ নামাজে জানাজা। জানাজা শেষে চৈতন্যগলির কবরস’ানে মায়ের পাশে দাফন করা হয় আইয়ুব বাচ্চুকে। এর আগে বেলা পৌনে তিনটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যনত্ম ওই মসজিদের মাঠে রাখা হয় প্রয়াত এ শিল্পীর মরদেহ। এসময় তাঁর প্রতি সর্বসত্মরের মানুষ শ্রদ্ধা জানান।
মরদেহ পৌঁছানোর আগেই হাজার হাজার ভক্ত পৌঁছে গিয়েছিল নগরের জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠে। ভক্তদের হাতে ছিল ফুল। লাশবাহী গাড়িতে প্রিয় শিল্পীর চেহারা এক নজর দেখে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ভক্তদের সামলাতে হিমশিম খায় পুলিশ। প্রিয় শিল্পীকে শেষ বিদায় জানাতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন শোকাহত হাজার হাজার মানুষ। শ্রদ্ধা নিবেদনের বেদি থেকে ভক্তদের সারি চলে গিয়েছিল জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠের পূর্ব প্রানেত্ম।
জানাজার আগে বক্তব্য দেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। প্রিয় বন্ধুকে শেষ বিদায় জানাতে রাজধানী ঢাকা থেকে ছুটে আসেন সংগীত শিল্পী পার্থ বড়ুয়াসহ আরও অনেকে। কিংবদনিত্ম এ শিল্পীর জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শিল্পী ও কলাকুশলীরা। আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি সব শ্রেণির মানুষ শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে ছুটে আসেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও। প্রিয় শিল্পীকে দেখতে ফুল হাতে নিয়ে সারিতে দাঁড়িয়েছেন ৪০ বছর বয়সী ইকবাল করিম। পেশায় তিনি একজন ব্যাংকার। ‘ছোটকাল থেকে আইয়ুব বাচ্চুর গান শুনে আসছি। তাঁর গান ছিল জীবনমুখী। এভাবে তাঁর চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছি না। আলস্নাহ তাকে জান্নাতবাসী করম্নন’ বলেন ইকবাল করিম।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ফয়েজ আরমান বলেন, ‘এবির গান শুনে বড় হয়েছি। তাঁর গানগুলো শুনলে বড্ড কান্না আসে।’ ভিড়ের মাঝে সংগীতশিল্পী পার্থ বড়-য়াকে ঘিরে ধরেন কিছু সংবাদকর্মী। প্রিয় মানুষটির অকাল মৃত্যুতে শোকে সত্মব্ধ পার্থ বড়-য়া। ‘বাচ্চু ভাইয়ের মতো শিল্পীকে হারিয়েছি। শোক প্রকাশের ভাষা জানা নেই।’
আইয়ুব বাচ্চুকে স্মরণীয় করে রাখতে চট্টগ্রামে তাঁর নামে একটি সড়ক ও সাস্কৃতিক কমপেস্নক্স গড়ে তোলা হবে জানিয়েছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। শ্রদ্ধা নিবেদনের বেদির পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আইয়ুব বাচ্চুর সহকর্মী ড্রামবাদক রোমেল। বাচ্চু ভাই তার কাছে কেমন ছিলেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাচ্চু ভাই আমার অভিভাবক ছিলেন। আমি যেন বাবাকে হারালাম।’
আইয়ুব বাচ্চুর জানাজায় অংশ নিতে এবং তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যারা এসেছেন তাদের বেশিরভাগই তরম্নণ। তাদেরই একজন চন্দন সাহা। তিনি এসেছেন কক্সবাজার থেকে। জানতে চাইলে বলেন, ‘বাচ্চু ভাই ছিল তরম্নণদের হার্টথ্রব। তরম্নণেরা তাঁর গান বেশি পছন্দ করেন। আমি তাঁর গান শুনে বড় হয়েছি।’ আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন পটিয়ার ব্যবসায়ী রহমান আলী। তিনি বলেন, ‘সেদিন ভারতীয় চ্যানেল সা রে গা মা পা দেখছিলাম। উপস’াপক যীশু সেনগুপ্ত বাংলাদেশের প্রতিযোগী নোবেলকে বললেন, আইয়ুব বাচ্চুর ‘সেই তুমি’ গানটি গেয়ে শোনাতে। এর থেকে প্রমাণ হয়, ওপার বাংলার মানুষেরাও তাঁকে ভালোবাসেন ।’
নোঙর বাড়ি ও রিদম মিউজিক্যাল শপ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান গিটার আকৃতির ফুলের তোড়া দিয়ে শ্রদ্ধা জানান আইয়ুব বাচ্চুকে। এছাড়া শেষ শ্রদ্ধায় অংশ নেয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সনত্মান কমান্ড, সোলস, চিটাগাং মিউজিক্যাল ব্যান্ড অ্যাসোসিয়েশনসহ শতাধিক সংগঠন। একদিন ঘুম ভাঙা শহরে ‘হারানো বিকেলের গল্প’ দিয়ে শুরম্ন হয়েছিল গিটার জাদুকর এবির যাত্রা। লাখো ভক্তকে কাঁদিয়ে অকালেই হারিয়ে গেলেন বাংলার এই রকস্টার।
কিংবদনিত্ম শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে চট্টগ্রামে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। জানাজার আগে দেওয়া বক্তব্যে আ জ ম নাছির বলেন, ‘কিছুদিন আগে বাচ্চু ভাই আমাকে ফোন করেছিলেন। সেসময় তিনি বলেছিলেন, মাতৃভূমি চট্টগ্রামে একটি ঘর বানাবো। কিন’ কষ্টের বিষয় হলো, বাচ্চু ভাইয়ের সে স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।’ সংগীতপ্রেমী জগলুল বলেন, ‘বাচ্চু ভাই তরম্নণদের জন্য গানের ভাষা তৈরি করে গেছেন। তাই দেশের অগণিত তরম্নণ আজ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে। তিনি সংগীত জগতে অমর হয়ে থাকবেন।’
শুধু তরম্নণ-যুবক নয়, প্রিয় শিল্পকে শেষ বিদায় জানাতে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠে গিয়েছিলেন বিভিন্ন বয়সের নারীরাও। তবে প্রচ- ভিড় ঠেলে বেদির কাছে যেতে পারেননি তারা। তাদেরই একজন চন্দনা সরকার। গিটার জাদুকর আইয়ুব বাচ্চুকে দেখতে না পেয়ে মাঠের এক কোণায় দাঁড়িয়ে বারবার চোখ মুছছিলেন। ‘তিনি ছিলেন আমার প্রিয় শিল্পী। তাঁর গান শুনে শুনে ঘুমাতাম। মহান এ শিল্পীর অকাল মৃত্যু আমি সইতে পারছি না। তাই এক নজর দেখতে ছুটে এলাম এখানে। কিন’ তাঁর চেহারাটা তো আর দেখতে পেলাম না। তবুও সৃষ্টিকর্তার কাছে তাঁর জন্য আর্শিবাদ করছি। তিনি যেন স্বর্গবাসী হন।’
এর আগে গতকাল শনিবার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে ইউএসবাংলার একটি উড়োজাহাজে ঢাকা থেকে ব্যান্ডসংগীতের কিংবদনিত্ম আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ চট্টগ্রাম শাহ আমানত আনত্মর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছে। বিমানবন্দরে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ গ্রহণ করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহের সঙ্গে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এসেছেন তাঁর স্ত্রী, ছেলেমেয়েরাও। বিমানবন্দর থেকে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নগরের পূর্ব মাদারবাড়ি নানার বাড়িতে। এর আগে শুক্রবার রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে আইয়ুব বাচ্চুর ছেলে আহনাফ তাজওয়ার কানাডা থেকে আর মেয়ে ফাইরম্নজ সাফরা রাত দেড়টায় অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফেরেন।
প্রসঙ্গত, গত ১৮ আক্টোবর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান কিংবদনিত্ম শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। গত শুক্রবার বাদ জুমা জাতীয় ঈদগাহে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ নেওয়া হয় তাঁর গানের স্টুডিও মগবাজারের ‘এবি কিচেন’-এ। সেখানে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ নেওয়া হয় চ্যানেল আই কার্যালয়ে। সেখানে তৃতীয় জানাজা হয়। এর আগে শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যনত্ম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁর মরদেহ রাখা হয় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য।
আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একাধারে গায়ক, গিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার, পেস্নব্যাক শিল্পী। এলআরবি ব্যান্ডদলের লিড গিটারিস্ট ছিলেন তিনি। ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মো. ইসহাক।