বিদায়োন্মুখ এ মহিমান্বিত মাস

বরণের পর বিদায়ের ঘড়ির প্রতীড়্গা। সূর্য উদিত হলে যে অসত্ম যাওয়া যেমন অবশ্যম্ভাবী, তেমনি বর্তমানের আত্মপ্রকাশ হয় ভবিষ্যতের কাছে সমর্পিত হতে। জাগতিক এ অমোঘ নিয়মের অনুসরণে ঘটা করে অজস্র আনন্দ, স্ফূর্তি নিয়ে যে মহিমান্বিত মাসটিকে আমরা বরণ করেছিলাম সময়ের প্রবাহ আবার সেই মাহে রমযানের বিদায়ী মুহূর্তকে সামনে নিয়ে এল। তাই অনত্মরে অনত্মরে বাজে বিদায়ের করম্নণ বাঁশি।
উৎসবের আমেজ নিয়ে মাহে রমযানের সাথে এসেছিল অনেক কিছু। হবে না কেন, মাহে রমযান হল আলস্নাহ্র মাস। সর্বশক্তিমান সেই মহান স্রষ্টা যে মাসকে নিজের প্রতি বিশেষভাবে সম্পর্কিত করেন, তাতে নিহিত নেয়ামতের অনত্ম থাকার কথা তো নয়। একটি মহিমান্বিত রমযান
নিয়ে এসেছিল সওগাত অফুরান। ‘উনযিলা ফীহিল কুরআন’-খোদায়ী নেয়ামতের অতলানত্ম খনি, অননত্ম কল্যাণের আধার পবিত্র কুরআনের সওগাতও ধরা দিয়েছে মহিমান্বিত মাসটিতে। কুরআন প্রাপ্তির শুভলগ্ন অতি বরকতময়, যাকে আলস্নাহ তাআলা কদরের রাত বা মহিমার রাত বলেছেন। এ রাত আরেক পুণ্যের সমারোহ, ‘খাইরম্নম মিন আলফি শাহ্র’ সহস্র মাস অপেড়্গা শ্রেয়তর। ইবাদত-বন্দেগীর তৎপরতায় মসজিদগুলো হয়ে ওঠে মুমিনের মিলনমেলা। যা জমে ওঠেছিল মহিমান্বিত এ মাসটিকে ঘিরে। মাহে শাওয়ালের চাঁদ উদিত হওয়ার সাথে পাল্টে যাবে আমাদের পারিপার্শ্বিক চিত্র, আমাদের পরিবেশ। সবচেয়ে বিষাদ মলিন চেহারা হবে আমাদের চার পাশে থাকা মসজিদ সমূহের। মাহে রমযানে মসজিদের সাথে আমাদের যোগাযোগ ছিল বেশি। পঞ্জেগানা জামাআত, বিশেষত তারাভীহ্র নামায্, ই’তিকাফ, কদরের রাতে আলস্নাহ্র ইবাদত, যিকর-আযকার, দোয়া-দরূদে এগুলো সরগরম থাকত সদা, পার্থিব মোহের দুর্নিবার আকর্ষণে মানুষ ছুটবে ভিন্নমুখী।
মসজিদের প্রতি আমাদের দায়বোধ সম্পর্কে যে নির্দেশনা আলস্নাহ্ দিয়েছেন তা বাসত্মবায়ন হতো মাহে রমযানের প্রতি মুহূর্তে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আলস্নাহ্ তাআলা যে ঘরগুলোকে উন্নীত করার এবং সেখানে তাঁর নাম উচ্চকিত করার নির্দেশ দিয়েছেন, তাতে এমন লোকেরা সকাল-সন্ধ্যা তাঁর তাসবী করে, যাঁদেরকে না ব্যবসা-বাণিজ্য তাঁর যিকর হতে গাফিল করতে পারে, না বেচাকেনা। (সুরা নূর-৩৬) মসজিদগুলোতে আলো ঝলমল উৎসবের বন্যা আগামী এগার মাস আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। একটি বছর শেষে আবার রমযানের মাস আসবে ঠিক কিন’ সেদিন আমাদের অনেকেই থাকবে না। কেউ তো জানি না এরই মধ্যে কার যাওয়ার পালা আসছে। যাদের অনিত্মম যাত্রার ঘড়ি সন্নিকট, তাদের জন্য এ রমযানই কি আখেরী রমযান নয়? রমযানের শেষ জুমা’র দিন তো তখন বাসত্মবিকই জুমাতুল বিদা’!
মাহে রমযান তাঁদের জন্য অতি আপন জনের চেয়েও বেশি, যারা এ মাসকে যোগ্য সম্মান-মর্যাদা দিয়ে আলস্নাহ্র কৃত হালালকেই হালাল জেনে, তাঁর কৃত হারামকে হারাম জেনে নিজের সামগ্রিক আচরণকে সংযত করতে পেরেছেন, যাঁরা নিজেদের কপালে ‘তাকওয়া’র তিলক লাগিয়ে নিতে পেরেছেন। মাসটির আগমনে আনন্দে আপস্নুত ছিলেন। কারণ, তাঁরাই মাহে রমযানের আবেদন ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন নিজেদের জীবনে, আর জাহান্নামের শাসিত্মর আশঙ্কা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছেন। রোযার শিড়্গাই তাঁদের জীবন বদলাতে পেরেছে। আর কোন প্রিয়জন যে এমন করে তাকে বিপদমুক্ত করতে পারেনি। তাই প্রিয়জনের বিরহের চেয়েও এ মাসের বিদায় অনেক বেশি বেদনাদায়ক নয় তো কী?
সায়্যিদুনা জাবের (রাদ্বিয়ালস্নাহু আনহু) বর্ণিত এক হাদীস মতে, রমযান মুবারক’র শেষ রাত আসলে আসমান-যমীন, ফেরেশতা এ উম্মতের দুর্দশা ভেবে কাঁদতে থাকে, কারণ সহজ। যে মাসটির প্রতিটি মুহূর্ত আলস্নাহর ভাবনায় কাটার মত পরিবেশ রচিত হয়েছিল, তার বিদায় তো দুঃখ করার মত। শেষ রাতে সাহ্রীর আয়োজন, সন্ধ্যায় ইফতার, রাতে তারাভীহ্র জমকালো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াও সারাদিন রোযা রাখার কারণে ইবাদতে লিপ্ত বান্দার প্রতি দয়াময় প্রভু মায়ার দৃষ্টি রোযাদারের জন্য কী যে যে অপার্থিব আনন্দের প্রাপ্তি তা বর্ণনার সাধ্য কী। আলবিদা হে প্রিয়তম মাস মহিমান্বিত রমযান।