বিজয় দিবস ও জাতীয় সংহতি

বিমল গুহ

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ(১৯৩৯-৪৫) পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন নামে স্বাধীন দেশের আবির্ভাব হতে থাকে। ভূগোলক-জোড়া ব্রিটিশ শাসন সঙ্কুচিত হয়ে পড়তে থাকে দিনদিন। এককালে আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশও ব্রিটিশ শাসনাধীন ছিলো। পরবর্তী সময়ে একটি একটি করে এসব দেশ স্বাধিকার কিংবা স্বাধীনতা পেতে থাকে। এসব অনেক দেশ স্ব-শাসনের অধিকার পেলেও প্রকৃত মুক্তি আসেনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে।
পাক-ভারত উপমহাদেশও ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশের কবল থেকে স্বাধীনতা পায়। তা সত্ত্বেও এ দেশ নতুন করে আবদ্ধ হয়ে পড়ে দেশীয় শোষকের জাঁতাকলে। শুরু হয় নতুন ধরনের শোষণ। পাকিস্তান নামক দেশটির পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মাঝে দেখা দেয় স্পষ্ট বিভক্তি চিহ্ন। শুধু ভৌগোলিক বিভক্তিই নয়, এর শক্তিশালী অংশের শাসককুল শোষণের হাত বাড়িয়ে দেয় দুর্বল অংশের দিকে অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের দিকে, বাঙালিদের দিকে। মাতৃভাষার স্বকীয়তা রক্ষার প্রশ্নে সেদিন একাট্টা হয় বাঙালিরা। এমন জাতীয় সংহতি ও জনগণের সম্মিলিত কণ্ঠের প্রতিবাদ অকল্পনীয় ছিলো পশ্চিমা শাসকদের কাছে।
কিভাবে এই ‘জাতীয় সংহতি’ গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিলো সেদিন? অবিশ্বাস্য রকম সত্য এই যে, নিজের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে এই অঞ্চলের সকল মানুষের কণ্ঠ যেন এক কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়ে উঠলো। ভাষার মুক্তি ও বাঙালি জাতির মুক্তি যেন পরস্পর হাত ধরাধরি করে এগিয়ে গেছে সম্মুখ পানে। একদিন নৈতিকতার কাছে হার মানে অপশক্তি!
মানুষের নৈতিক শক্তি হলো তার বিবেক। চেতনার উপলব্ধিই মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলে। আমরা যে-সমাজে, যে-পরিবেশে বাস করি তার একটা রূপক-কাঠামো আমরা দাঁড় করিয়ে রেখেছি আমাদের সামনে। এর ব্যত্যয় হলে উপলব্ধির তফাৎ ঘটে; তখন মানুষ তার বিবেকের কাছেই এর যথার্থতা যাচাই করে। তৎকালীন পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের পর এ অঞ্চলের মানুষ যতটা উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলো, তার অব্যবহিত পরেই আঘাত আসে বাঙালি চেতনায়। এক সময় বাঙালিদের কাছে ধরা পড়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কূটকৌশল। এই যে বাঙালিরা বুঝতে শিখেছে- এই বোধই হলো আত্মগত উপলব্ধি, যা তার বিবেককে জাগিয়ে দিয়েছে; বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মন্ত্র শুনিয়েছে সেদিন।
পৃথিবীর বুকে বাঙালি আজ এক স্বাধীন জাতিসত্তা। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছে তার অস্তিত্ব। স্বাধীনতার ৪৬ বছরে দাঁড়িয়ে যখন আমরা স্বাধীনতা-দিনের কথা ভাবি, কিংবা যুদ্ধদিনের কথা ভাবি- স্মৃতির নৌকোর বহর এসে জমা হতে থাকে স্মরণের বন্দরে। একটি জাতি সেদিন একটি ডাকে সাড়া দিয়ে দাঁড়িয়েছিলো বিবেকের মুখোমুখি, মরণের মুখোমুখি। সমগ্র জাতি কোত্থেকে পেয়েছিলো মরণজয়ের এই বীজমন্ত্র, কিভাবে পেয়েছিলো মরণজয়ের এই সাহস? এর সহজ উত্তর- মানুষের বিবেক। মানুষ তার বিবেকের কাছেই পেয়েছে এর সহজ সমাধান। আমি একটি কবিতায় বলেছিলাম- ‘… আধুনিক যান যুদ্ধ-অস্ত্র নয়,/ মরণজয়ের সাহসের কাছে- জানি/ ভীরুদের মাথা চিরকাল নত হয়!’ পাকহানাদার বাহিনীকে এজন্য ভীরু বলছি- তারা জানতো তারা অন্যায় করছে, তারা জানতো তারা বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে অগ্রাহ্য করেছে এবং তাদেরকে সেদিন তারা দমন-পীড়নে মেতে উঠেছে! তারা তাদের বিবেকের কাছে দায়ী, তারা মনের দিক থেকে দুর্বল- তারা কাপুরুষ। এজন্য তারা ভীরু! পৃথিবী জানে শক্তির পরিচয় কেবলমাত্র সংগৃহীত যুদ্ধাস্ত্রের উপর নয়; শক্তির পরিচয় তার সততার কাছে, সত্যের কাছে। আর তা নির্ভর করে তার নৈতিক অবস্থানের।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে আত্মশক্তিতে-বলীয়ান বাঙালি জাতির দিকনির্দেশক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৈতিক অবস্থান, স্থির প্রজ্ঞা জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছে চূড়ান্তের দিকে এগিয়ে যেতে। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন সত্যকে, উপলব্ধি করেছিলেন অনিবার্যতাকে। প্লেটোর ভাষায়- ‘প্রজ্ঞা হচ্ছে উপলব্ধিগত সত্যকে প্রত্যক্ষ করা’। এই প্রত্যক্ষণ তখনই সত্যরূপ লাভ করে, যখন মানুষের বিবেক স্থির লক্ষে তাকে পরিচালিত করে। বঙ্গবন্ধু সেই সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই এগিয়ে নিতে পেরেছিলেন সমগ্র জাতিকে। তখন দিকে দিকে গগনবিদারী স্লোগান উঠেছিলো- ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। এই চেতনার রূপকার ছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।

বাঙালি আজ স্বাধীন জাতি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী ন্যায়যুদ্ধে জয়ী জাতি। সেই যুদ্ধে আমরা হানাদার বাহিনীকে আজকের এইদিনে পরাস্ত করে বিজয়ের নিশান উড়িয়েছিলাম। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমরা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে পেরেছিলাম- সত্যের জয় অনিবার্য। সেদিন প্রমাণ করতে পেরেছিলাম- অত্যাচারী চিরকাল ভীরু ও কাপুরুষ থাকে। কিন্তু আমরা আজ এতকাল পর উপলব্ধি করছি, আমরা এখনো পুরোপুরি আমাদের লক্ষে পৌঁছাতে পারিনি।
আজ বাঙালির জাতীয় সংহতির বড় দুর্দিন, মধ্যাকাশের প্লেনের মতোই আমরা যেন পার করছি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া! এই দুর্যোগ বাঙালিকে ধৈর্য ধরে কাটিয়ে উঠতে হবে। নইলে আমাদের সেই প্রেরণা, আমাদের জাতীয় সংহতি মুখ থুবড়ে পড়বে ধুলায়। যেই ঐক্য বাঙালিকে স্বাধীনতাযুদ্ধে আগোয়ান সৈনিক করে তুলেছিলো সেই বোধে উজ্জীবিত হতে হবে এখনই। পৃথিবীর বুকে বাঙালি জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি একদিন। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ভ্রাতৃত্ববোধে বাঙালিকে থাকতে হবে ঐক্যবদ্ধ।
রাজনৈতিক অস্থিরতায় ও সামপ্রদায়িক উস্কানিতে কখনো কখনো শান্তি বিনষ্ট হলেও- বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের মানুষ ভ্রাতৃত্ববোধে সবসময় ঐক্যবদ্ধ থেকেছে, সে প্রমাণ বহু দিয়েছে এ জাতি অতীতে।
আমাদের বড় পরিচয় আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা, আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্যচিন্তা ও বোধ এক। মানুষ হিসেবে অহংকার করার মতো আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেমন রয়েছে, তেমনি আমাদের গর্বিত পরিচয়- মাতৃভাষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি। আমরা একুশের উত্তরাধিকার। আমরা জানি যে, বোধের দিক থেকে এ অঞ্চলের মানুষ ধর্মপ্রাণ। নিজনিজ ধর্ম পালন ও সহাবস্থানে থেকে আমরা শান্তিকামী জাতি। ঐতিহ্যসমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আমাদের অহংকারের বহু বিষয় রয়েছে। শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ- এ সবই আমাদের অহংকার। সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে দাঁড়াতেই হবে আমাদেরকে, যেন এ দেশে জন্মগ্রহণ করে আগামী প্রজন্ম গর্ববোধ করতে পারে।
একদিন একুশের হাত ধরে বীরের জাতি হিসেবে যে-পরিচয় আমাদের হয়েছে, আধুনিক মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে খালি হাতে সম্মুখ সমরে দাঁড়িয়ে যে-বীরত্ব আমরা দেখাতে পেরেছিলাম একাত্তরে, সে-গৌরবচিহ্ন আমাদের জয়টিকা। তার মর্যাদা সমুন্নত রাখা আমাদের আজ প্রধান কর্তব্য। হীন স্বার্থের আড়ালে যেন আমাদের এই বীরত্বের মর্যাদাহানি না-হয়, সে-দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে আমাদের।
আমরা যেন ভুলে না যাই- আমরা একুশের উত্তরাধিকার, আমরা স্বাধীনতার রক্তসমুদ্রের উত্তরাধিকার, আমরা নব্বইয়ের স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের সৈনিক, আমরা আধুনিক পৃথিবীর নাগরিক। আমরা যে-লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছি, আধুনিক প্রযুক্তি-বিশ্বে নিজের অবস্থানকে দৃঢ়তর করতে সমর্থ হয়েছি; সেখান থেকে পিছিয়ে পড়ার কোনো সুযোগ এখন আর নেই। সামাজিক কোনো বিভেদকে প্রশ্রয় দেয়া আমাদের চলে না, কেবল সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া। আজ শপথ নেয়ার দিন- আমরা ব্যক্তিস্বার্থে অন্ধ না-হয়ে যেন সমষ্টিগত চিন্তা করি। সকল বিভেদ ভুলে সত্যের ও সুন্দরের ধ্বজা ঊর্ধ্বে তুলে ধরি, প্রজ্ঞাবান জাতি হিসেবে এগিয়ে যাই দৃঢ় পদক্ষেপে আগামীর পথে- এই হোক আজকের দিনে আমাদের জাতীয় সংহতির অনুপ্রেরণা।