বিজয়ের প্রাক্কালে

কামরম্নল হাসান বাদল

পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাক হানাদার ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদররা বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরম্ন করে। দিবাগত রাতে আলবদর বাহিনীর গুপ্তঘাতক দল দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দিন হোসেন ও পিপিআইর চিফ রিপোর্টার সৈয়দ নাজমুল হককে তাঁদের বাসভবন থেকে অপহরণ করে।
এদিন ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে একটি যৌথ সামরিক কমান্ড গঠন ও রণকৌশল গ্রহণ করার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাড়্গরিত হয়। বাংলাদেশের পড়্গে চুক্তিতে সই করেন অস’ায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরম্নল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ। ভারতের পড়্গে সই করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিলস্নীতে এক বিশাল জনসভায় ভাষণদানকালে বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি সংক্রানত্ম জাতিসংঘের আহ্বান ভারত প্রত্যাখ্যান করেনি বা গ্রহণও করেনি। প্রসত্মাবটি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিসি’তিতে বিজয় শুধু তখনই সম্ভব হবে যখন বাংলাদেশ সরকার কায়েম হবে এবং বর্তমানে ভারতে অবস’ানরত এক কোটি শরণার্থী তাদের বাসত্মুভিটায় ফিরে যেতে পারবে।’
রাজধানী ঢাকা ছাড়া দেশের অধিকাংশ জেলা শত্রম্নমুক্ত। ঢাকায় পরিকল্পিত চূড়ানত্ম হামলা চালিয়ে শত্রম্নদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার লড়্গ্যে এগিয়ে যাচ্ছে যৌথবাহিনী। এদিন মিত্রবাহিনীর জঙ্গী বিমানগুলো ঢাকা বেতার কেন্দ্র সত্মব্ধ করে দেয়, বোমা-রকেট ছুড়ে বিধ্বসত্ম করে দেয় ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর। মিত্রবাহিনীর বিমান আক্রমণে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর অচল হয়ে পড়ে। কয়েকটা জাহাজভর্তি পাকিসত্মানি বাহিনী বঙ্গোপসাগর দিয়ে পালানোর সময় ধরা পড়ে। সম্মিলিত বাহিনী উত্তরাঞ্চলের যুদ্ধে সর্বাত্মক সাফল্য অর্জন করে। মিত্র বাহিনী যৌথ অভিযান চালিয়ে দিনাজপুর, রংপুর ও সৈয়দপুরের শত্রম্ন বাহিনীকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যৌথ বাহিনী এই তিন শহর ছাড়া রংপুর ও দিনাজপুর জেলা সম্পূর্ণ শত্রম্নমুক্ত করে। রাতে পাকিসত্মানি বাহিনী জামালপুর গ্যারিসন ছেড়ে ঢাকার দিকে পালানোর সময় শহরের অদূরে যৌথ বাহিনীর মুখোমুখি হয়। এ যুদ্ধে প্রায় এক হাজার ৫০০ পাকিসত্মানি সেনা হতাহত হয়। বাকিরা আত্মসমর্পণ করে।
এদিকে যুদ্ধে পরাজয়ের আশঙ্কায় লে. জেনারেল নিয়াজি পালানোর পাঁয়তারা করে। তার এ গোপন অভিসন্ধি বিবিসি ফাঁস করে দেয়। নিয়াজি নিজ দুর্বলতা ঢাকার জন্য ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে দম্ভভরে বলেন, ‘কোথায় বিদেশি সাংবাদিকরা-আমি তাদের জানাতে চাই, আমি কখনো আমার সেনাবাহিনীকে ছেড়ে যাব না।’ এদিন মুক্ত হয় মাদারীপুর, ময়মনসিংহ, ভোলা ও নড়াইল।
মাদারীপুর: ১৯৭১ সালে ধ্বংসযজ্ঞ শেষে ৮ ডিসেম্বর যখন পাক হানাদার বাহিনী মাদারীপুর ছেড়ে যাচ্ছিল তখন মুক্তিযোদ্ধারা বিস্ফোরক দিয়ে এই ব্রিজটি উড়িয়ে তাদের আটকে দেয়। এরপর টানা ৩ দিনের যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী, পাকিসত্মানি সেনাদের কোণঠাসা করে আত্মসমর্পণ করাতে বাধ্য করে। কিন’ ৩ দিনের সম্মুখযুদ্ধে পাকবাহিনীর গুলিতে শহীদ হন জেলার সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ১৪ বছর বয়সী সারোয়ার হোসেন বাচ্চু। ১০ ডিসেম্বর সন্ধ্যার আগে পশ্চিম আকাশে সূর্য যখন অসত্মগামী তখনই মুক্ত হয় মাদারীপুর।
ময়মনসিংহ: ২৭ মার্চ থেকে ময়মনসিংহে ইপিআর, পুলিশ এবং আনসার-মুজাহিদ বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা খাগডহর এলাকার তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্প দখলে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২০ এপ্রিল পর্যনত্ম ময়মনসিংহ অঞ্চল মুক্তিবাহিনীর হাতে থাকলেও পরে তা চলে যায় পাক সেনাদের হাতে। এরপর খ- খ-ভাবে যুদ্ধ হলেও ৩ ডিসেম্বর থেকে ময়মনসিংহের চতুর্দিক ঘিরে ফেলে মুক্তিযোদ্ধারা। ১০ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাসত্ম হয়ে ঢাকার দিকে পালিয়ে যায় পাক সেনারা।
ভোলা: ১২ এপ্রিল থেকে দোসরদের সহযোগিতায় ভোলার বিভিন্ন জায়গায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায় পাকবাহিনী। দীর্ঘ ৮ মাসের যুদ্ধ শেষে ১০ ডিসেম্বর মুক্ত হয় ভোলা জেলা। মুক্ত মাতৃভূমিতে বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে আনন্দ উলস্নাসে মেতে ওঠে ভোলা জেলার মানুষ।
নড়াইল: ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল থেকে নড়াইলে অবস’ান নেয়ার পর গণহত্যা শুরম্ন করে পাকবাহিনী। এসময় জেলার অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে অস্ত্র সংগ্রহ করে প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরম্ন করে মুক্তিযোদ্ধারা। আসেত্ম আসেত্ম হানাদার বাহিনীর সবগুলো ঘাঁটি দখলে নেয় তারা। সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর তৎকালীন পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়ে গেরিলা আক্রমণের মধ্যদিয়ে শত্রম্নমুক্ত হয় নড়াইল জেলা।
সূত্র : স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, মূলধারা’৭১, লড়্গ প্রাণের বিনিময়ে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, উইকিপিডিয়া