বিজয়ের প্রাক্কালে

কামরূল হাসান বাদল

৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১। এদিনে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা ও আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় কংগ্রেসের সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভারত ও ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের পর উপদেষ্টা পরিষদের এটিই ছিল প্রথম বৈঠক। বৈঠকে মুক্ত এলাকায় অসামরিক প্রশাসনের কার্যক্রম শুরম্ন এবং খাদ্য, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ওপর গুরম্নত্বারোপ করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের প্রতিরড়্গা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের নির্দেশে নৌবহর তার যুদ্ধযাত্রা শুরম্ন করে। ইয়াহিয়া খান ভেবেছিলেন, এতে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে যাবে। ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয় উল্টো। মুক্তিযোদ্ধারা আরো বিপুল উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার যুদ্ধে। অন্যদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর প্রতিরোধের জন্য নিজেদের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর হুমকি দিলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সিদ্ধানত্ম স’গিত করে।
এই দিনে মুক্ত হয় কুমিলস্নার দাউদকান্দি, গাইবান্ধা, গাজীপুরের শ্রীপুর, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ ও নেত্রকোনা। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী চারপাশ থেকে রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে ফেলেছিল। প্রায় প্রতিদিনই যৌথবাহিনীর বিমান হামলায় পাকবাহিনীর ব্যাপক ড়্গতিসাধন হচ্ছিল। ঘনিয়ে আসছিল তাদের
পরাজয়ের ড়্গণ। এদিন চতুর্দিক থেকে অবরম্নদ্ধ হয়ে পড়ে পাকবাহিনী। মিত্র ও মুক্তিবাহিনী বীরদর্পে দেশের অধিকাংশ জেলায় বিজয়কেতন উড়িয়ে ঢাকা দখলের জন্য মরিয়া। মিত্র বাহিনী দ্রম্নত ঢাকা পৌঁছার লড়্গ্য নিয়ে চারদিক থেকে অগ্রসর হচ্ছে। আগে একটি বাহিনী যাচ্ছে আশুগঞ্জ, দাউদকান্দি ও চাঁদপুর। পশ্চিমে আরেকটি বাহিনী পৌঁছেছে মধুমতি নদীর তীরে। আরেকটি বাহিনী কুষ্টিয়া মুক্ত করে চলছে গোয়ালন্দ ঘাটের দিকে। হালুয়াঘাট থেকে এগিয়ে আসা বাহিনীও পৌঁছে গেছে ময়মনসিংহের কাছাকাছি।
ঢাকার আশপাশের জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স’ান মুক্ত হবার খবর আসে৷ হানাদার মুক্ত হয় খুলনার ঐতিহ্যবাহী কপিলমুনি। কুমারখালি (কুষ্টিয়া) উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা বেলা ১১টায় শহরের চারদিক ঘিরে ফেললে পৌর এলাকার কু-ুপাড়ায় ক্যাম্প করা আল-বদর কমান্ডার ফিরোজ বাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়৷ এ সংবাদে জেলা শহরে অবস’ানরত পাকসেনারা দ্রম্নত এসে শহর ঘিরে গণহত্যা শুরম্ন করে৷ ৯ ডিসেম্বর পুনরায় মুক্তিযোদ্ধারা শহর ঘিরে রাজাকার-পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালালে তারা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়৷ এদিকে, কুমিলস্না মুক্ত হওয়ার খবরে দাউদকান্দি এবং চান্দিনার মুক্তিযোদ্ধারা দ্বিগুণ উৎসাহে পাকসেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন৷ ৮ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধারা উত্তর এবং দড়্গিণ পার্শ্ব থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স’ানে অবস’ান নেয়া পাকসেনাদের উপর হামলা চালালে তারা পাল্টা জবাব দিতে দিতে পশ্চিমদিকে হটতে থাকে৷ ৯ ডিসেম্বর তারা ঢাকার দিকে পালিয়ে যায়৷ এদিনে আরো মুক্ত হয় খুলনার ঐতিহ্যবাহী পাইকগাছা, কুমারখালি, গাইবান্ধা, অভয়নগর, ত্রিশাল, পূর্বধলাসহ বিভিন্ন এলাকা৷
এদিন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কমান্ডার জগজিৎ সিং অরোরা বলেন, পাকিসত্মানি সেনাবাহিনী দু’দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এক অংশ রয়েছে হিলির উত্তরে, আরেক অংশ রয়েছে দড়্গিণে। দুই অংশের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের আক্রমণ মিত্রবাহিনীর আক্রমণের গতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
৯ ডিসেম্বর এক বার্তায় গভর্নর মালিক পাকিসত্মানের রাষ্ট্রপতিকে জানান, ‘সামরিক পরিসি’তি নাজুক হয়ে পড়েছে। পশ্চিমে শত্রম্ন ফরিদপুরের কাছে চলে এসেছে এবং পূর্বে লাকসাম ও কুমিলস্নায় আমাদের বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে মেঘনা নদীর ধারে পৌঁছেছে। বাইরের সাহায্য যদি না আসে, তবে শত্রম্ন যেকোনো দিন ঢাকার উপকণ্ঠে পৌঁছে যাবে। পুনরায় আপনাকে বলছি, আশু যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধানের কথা বিবেচনা করম্নন।’ এরপর ১০ ডিসেম্বর গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও মুখ্য সচিব পশ্চিম পাকিসত্মানি কর্মকর্তা মুজাফফর হোসেন ক্যান্টনমেন্টে জেনারেল নিয়াজির সঙ্গে বিসত্মারিত আলোচনা করেন এবং ঢাকায় জাতিসংঘের প্রতিনিধির কাছে ‘আত্মসমর্পণের’ আবেদন হসত্মানত্মর করেন।এতে অবশ্য কৌশলে আত্মসমর্পণ শব্দটি বাদ দিয়ে অস্ত্রসংবরণ কথাটি ব্যবহার করা হয়। এই আবেদনে আরো লেখা ছিল, ‘যেহেতু সংকটের উদ্ভব হয়েছে রাজনৈতিক কারণে, তাই রাজনৈতিক সমাধান দ্বারা এর নিরসন হতে হবে। আমি তাই পাকিসত্মানের রাষ্ট্রপতির দ্বারা অধিকারপ্রাপ্ত হয়ে পূর্ব পাকিসত্মানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ঢাকায় সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানাই। আমি শানিত্মপূর্ণভাবে ড়্গমতা হসত্মানত্মরের ব্যবস’া নেয়ার জন্য জাতিসংঘকে আহ্বান জানাই। এই আবেদন ঢাকায় জাতিসংঘের প্রতিনিধি পল মার্ক হেনরির হাতে দেওয়া হয়। পাকিসত্মানি মহলে বার্তাটি মালিক-ফরমান আলী বার্তা হিসেবে পরিচিতি পায়। পরদিন তা আবার প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। মিত্রবাহিনী কর্তৃক গভর্নর হাউজে (বর্তমান বঙ্গভবন) বোমাবর্ষণের কারণে গভর্নর মালিকের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিসত্মানের পুতুল সরকারও ইতোমধ্যে পদত্যাগ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আশ্রয় নেয়। সময় থাকতে শানিত্মপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণের আহবান জানিয়ে আকাশ থেকে অনবরত প্রচারপত্র ফেলা হতে থাকে।