বিজয়ের প্রাক্কালে

কামরম্নল হাসান বাদল

১৯৭১ এর এই দিনে মুক্ত হয় দেশের বেশ কয়েকটি জেলা। বাংলার দামাল ছেলেরা একের পর এক সফল অপারেশনের মাধ্যমে পাকবাহিনীকে পরাজিত করে এগিয়ে যায় চূড়ানত্ম বিজয়ের দিকে। এদিনে ভুটান স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
এসময় যুদ্ধ পরিসি’তির বিবরণ দিয়ে জেনারেল নিয়াজি গোপন বার্তা পাঠিয়েছিলেন রাওয়ালপিন্ডি হেড- কোয়ার্টার্সে। রিপোর্টে তিনি উলেস্নখ করেন, ‘চারটি ট্যাংক রেজিমেন্ট সমর্থিত আট ডিভিশন সৈন্য নিয়ে আক্রমণ শুরম্ন করেছে ভারত। তাদের সাথে আর আছে প্রশিড়্গণপ্রাপ্ত ৬০ থেকে ৭০ হাজার বিদ্রোহী (মুক্তি-যোদ্ধাদের পাকিসত্মানিরা তখন বিদ্রোহী বলে উলেস্নখ করতো)। তিনি আর লেখেন, স’ানীয় জনগণও আমাদের বিরম্নদ্ধে। দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লাকসাম, চাঁদপুর ও যশোর প্রবল চাপের মুখে রয়েছে। পরিসি’তি নাজুক হয়ে উঠতে পারে। তিনি লিখেছেন, ‘গত নয় মাস ধরে আমাদের সৈন্যরা কার্যকর অপারেশন চালিয়েছে এবং এখন তারা তীব্র যুদ্ধে অবতীর্ণ। গত ১৭ দিনে যেসব খ-যুদ্ধ হয়েছে, তাতে জনবল ও সম্পদের বিচারে আমাদের ড়্গয়ড়্গতি বেড়ে গেছে। রাজাকারদের অস্ত্রসহ সটকে পড়ার সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের নিজেদের ট্যাংক, ভারী কামান ও বিমান সমর্থন না থাকার ফলে পরিসি’তির দ্রম্নত অবনতি ঘটেছে। ‘ গোপন এ বার্তা পেয়ে হেডকোয়ার্টার থেকে ৭ ডিসেম্বর সম্মুখসমরের সৈন্যদের পিছিয়ে এনে প্রতিরোধ ঘাঁটিতে সমবেত করার জন্য নিয়াজির পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়। তবে অনুমোদনের অপেড়্গায় বসে থাকেনি যশোর ক্যান্টনমেন্টের পাকিসত্মানি সৈন্যরা। ঘাঁটি ছেড়ে তারা ৬ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারেই পালিয়ে যায়। একদল যায় ফরিদপুর-গোয়ালন্দের দিকে। বড় দলটি যায় খুলনার দিকে। ব্রিগেডিয়ার হায়াত তখন ঢাকার দিকে না গিয়ে বসত্মুত খুলনার দিকে একরকম পালিয়েই গিয়েছিলেন।
এদিন নিয়াজীর সর্বাপেড়্গা শক্তিশালী ‘দুর্গ’ যশোরের পতন ঘটে। ভারতের ৯ম ডিভিশনের প্রথম কলামটি এক রক্তাক্ত যুদ্ধের প্রসত্মুতি নিয়ে যশোর সেনাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়ে দেখতে পায়, বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারম্নদ ও রসদ ভর্তি সুরড়্গিত বাঙ্কার সম্পূর্ণ জনশূন্য। ‘বীর মুজাহিদ’ চার ব্যাটালিয়ান সৈন্যের এইরূপ অকস্মাৎ অনত্মর্ধানে দেশের পশ্চিমাঞ্চল কার্যত মুক্ত হয়। যশোর থেকে ঢাকা অথবা খুলনার দিকে বিড়্গিপ্ত পলায়নপর পাকসেনারা অন্যান্য স’ানে স্বপড়্গীয় সৈন্যদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে; দু-তিনটি স’ান বাদে সর্বত্রই পাকিসত্মানিদের প্রতিরড়্গার আয়োজনে ধস নামে।
এদিকে মিত্রবাহিনী সিলেটের নিকটবর্তী বিমানবন্দর শালুটিগড়ে অবতরণ করার পর মুক্তি বাহিনীর সহায়তায় সিলেট শহর মুক্ত করে। ঝিনাইদহ ও মৌলভীবাজারও মুক্ত হয় এদিনে। এদিন যৌথবাহিনী চান্দিনা ও জাফরগঞ্জ অধিকার করে। অবশ্য কুমিলস্না ও লাকসামে তুমুল যুদ্ধ চলে। বিকালের দিকে বগুড়া-রংপুর সড়কের করতোয়া সেতুর দখল নিয়ে পাক বাহিনী ও যৌথবাহিনীর মধ্যে রক্তড়্গয়ী সংঘর্ষ হয়। একে একে নড়াইল, কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ ও ছাতক ছেড়ে পালিয়ে যায় পাকবাহিনী।
সূত্র : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, মূলধারা ৭১, লড়্গ প্রাণের বিনিময়েও সংবাদপত্র