বিজ্ঞান-সাক্ষী রেখে প্রাগৈতিহাসিক গল্প

আবু সাঈদ

শক্তির নিত্যতার সূত্র মতে, শক্তির ধ্বংস বা বিনাশ নেই-তা কেবল একরূপ থেকে অন্যরূপে রূপান্তর হয়। আসলে কোন কিছুরই কি ধ্বংস বা বিনাশ আছে? আপাত বিনাশ হলেও সে কি তার ‘পদচিহ্ন’ রেখে যায় না? হ্যাঁ, রেখে যায়। পৃথিবীর বুকে প্রাগৈতিহাসিক কালের সেই প্রথম জীবনের আবির্ভাব থেকে ধারাবাহিক সব জীবনই তার পদচিহ্ন রেখে গেছে। সে পদচিহ্নে প্রাণস্পন্দন খুঁজেন প্রত্নবিজ্ঞানীরা। প্রত্নবিজ্ঞানীদের আবিষ্কার এবং গবেষণা থেকে আমরা জানতে পারি প্রাগৈতিহাসিক কালের মানুষের জীবন এবং জীবনধারা কেমন ছিল, কিভাবে বিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে আজকের মানুষ, কিভাবে এগিয়েছে সমাজ-সংস্কৃতি-ইতিহাস এবং সে সঙ্গে প্রাকৃতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের কারণসহ সভ্যতার উত্থান-পতনের কাহিনী।
প্রাগৈতিহাসিক নানাজনের বিজ্ঞান-ভিত্তিক গল্প “মানুষের পায়ের আওয়াজ” শিরোনামে প্রত্নতাত্ত্বিক গল্পগ্রন্থে মুহাম্মদ ইব্রাহীম ৩৫ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় বিচরণশীল মানব সদৃশ লুসির পরিবার এবং তৎসঙ্গে তখনকার নরবানরদের জীবনধারা থেকে শুরু করে চার শত বছর আগের প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপ ইস্টার আইল্যান্ডের কৃষিজীবী কড়ি ও তার সমাজের চিত্র এঁকেছেন ধারাবাহিকভাবে। এ গ্রন্থের মলাট-অভ্যন্তরে লেখা হয়েছে: ‘মানুষের যখন লিপি ছিলনা, ইতিহাস লিখে যাওয়ার সুযোগ ছিলনা, সেটি প্রাগৈতিহাসিক কাল। মানুষের অস্তিত্বের ও অগ্রযাত্রার সিংহভাগ সময় জুড়ে রয়েছে এই প্রাগৈতিহাসিক কাল। এ অগ্রযাত্রার পায়ের আওয়াজ ক্ষীণ থেকে স্পষ্টতর হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছতে পারছে একমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও গবেষণার মাধ্যমে। এ গবেষণার ভিত্তিতে পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা যুগের মানুষের যে জীবন, যে সংস্কৃতি উদঘাটিত হয়েছে তার ভিত্তিতেই এই বইয়ের গল্পগুলো রচিত হয়েছে। এক একটি গল্প বহু যুগের ওপারের এক একজন কল্পিত মানুষকে নিয়ে, যার জীবন-বৈশিষ্ট্যের ও সুখ-দুঃখের কাহিনীতে ওখানকার সেদিনের মানুষকে আমরা দেখতে পাবো।’ এ গ্রন্থটি পড়লে উপরের কথাগুলো সত্যি মনে হবে। সঙ্গে সঙ্গে একথাও বলতে চাই মোট ৪১৪ পৃষ্ঠার এই বইয়ে চৌত্রিশটি গল্পের মধ্যে রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পারম্পর্যতা ও ধারাবাহিক ইতিহাস এবং তা অবশ্যই প্রত্নতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও গবেষণাকে ভিত্তি করে।
প্রথম গল্প ‘ইথিওপিয়ার হাদারে লুসি’ (৩৫ লক্ষ বছর আগে)। এখানে দেখি মানুষের পূর্বপুরুষ লুসি এবং তার পরিবারের কাহিনী। রয়েছে তাদের জীবনধারা এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা। লুসির স্বামী বাপ্পা ও তার তিন স্ত্রী-লুসি, খুশি, টুসি এবং তাদের সন্তান-সন্ততি নিয়ে এ গল্প আবর্তিত হয়েছে।লুসিরা বৃক্ষবাসী তবে তাদের সমাজ রয়েছে। যদিও এক সমাজ থেকে অন্য সমাজের দূরত্বটা অনেক বেশি। মনে হচ্ছে এ পরিবারটি পিতৃতান্ত্রিক কিন্তু পারিবারিক বন্ধন দৃঢ়। সন্তানের লালন পালনের দায়িত্ব বেশি নেয় মায়েরা। আর পুরুষদের ঘাড়ে বর্তেছে পরিবার সুরক্ষার দায়িত্ব।
ভাষা তখনো আবিষ্কার হয়নি। এমনকি স্বরতন্ত্রের গঠন পর্বও শেষ হয়নি। তবুও ভাব বিনিময়ে সমস্যা হয় না তাদের। একধরনের আওয়াজ করে একাজ চলে, করতে পারে আনন্দ-উল্লাসও। এরা আত্মরক্ষার বিষয়ে সচেতন। এই লুসিরা অন্য এইপদের (নরবানর) থেকে চলা-ফেরায়, সন্তান লালন-পালনে, হাঁটা-চলায় ভিন্ন। ভিন্ন না বলে উন্নত বলা বোধ হয় ভালো হবে। শারীরিক গঠনও ভিন্ন। এরা তন্বী দেহের অধিকারী আর অন্য এইপরা একটু মোটা-সোটা। সামনের দাঁত ছোট, হাতদুটো পাথর বা লাঠি চালানোর চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গাছে ওঠার জন্য। তারা দু’পায়ে হাঁটতে পারে তবে দৌড়াতে একটু সমস্যা হয়। কেমন যেন দৌড়াতে গেলে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। লুসি সন্তানদের কোলে-কোলে করে রাখে আর অন্য এইপ্‌রা রাখে পিঠে-পিঠে- এখানেও রয়েছে স্বতন্ত্রতা। পায়ের পাতা, আঙুলের ছাপ আর হাঁটার ভঙ্গি ঠিক যেন পরবর্তীকালের মানুষদেরই মতো।
এরা দূরে কোথাও যেতে চাইলে বাহ্যিক অবস্থা ও পরিস্থিতি দেখে ও বুঝে বের হয়। অবশ্য খাবার যোগাড় করা ছাড়া তাদের তেমন বের হতে হয় না। খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় ফল, কীট পতঙ্গ, টিকটিকি বা এ জাতীয় পোকামাকড়- তবে প্রধানত এরা উদ্ভিদভোজী। এদের প্রধান দায়িত্ব খাবার যোগাড় করা এবং প্রধান কর্তব্য নিজেদের রক্ষা করা। তবে ঐ সময়ে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি অবাক হওয়ার মতো। খুশির বোনের তো বিয়ে হয়ে গেলো তাদেরই সমগোত্রীয়দের একজনের সঙ্গে। দেখাও হয় মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে।
লুসিদের উত্তর-পুরুষদের দেখি ‘কেনিয়ার নারিকোটোমের বালক’ (১৫ লক্ষ ৩০ হাজার বছর আগে) গল্পে। তবে এরা এখন অন্য উন্নততর, ইরেকটাসে পরিণত হয়েছে। নারী-পুরুষের দেহাবয়বের পার্থক্য কমে এসেছে। আগের চেয়ে পারিবারিক বন্ধন হয়েছে আরো দৃঢ়। ভাষা এখনো আবিষ্কার হয়নি তবে বুদ্ধিমত্তা বেড়েছে যথেষ্ট। হাতিয়ার বানানো এবং তার ব্যবহার শিখে গেছে। আয়ত্ত করে নিয়েছে শিকার ধরার কলাকৌশলও। হরিণ শিকারে বের হয় তারা। এ ইরেকটাসরা সর্বভুক তারপরও খাবারের সংকট হলে স্থানান্তর হয়। আগের লোম অনেক ঝরে গেছে। আগে দৌড় দিতে পারতো না এবার দৌড়-ঝাপ দিয়ে শিকার ঘায়েল করতে পারে। এদের নরমানব বল্‌লে ভুল হবে; এদেরকে মানুষই বলতে হবে। পাথরের ব্যবহার পারে, জানে হাতিয়ার বানাতেও। “অবশ্য ওরা যে হাতিয়ার তৈরি করছে তা মোটেই আহামরি কিছু হয়নি- কোন রকম মসৃণতা বা ফিনিশিং এর নেই” এখনকার সময়ে তা মনে হলেও তখনকার বাস্তবতায় এ আবিষ্কার ছিল বৈপ্লবিকই।
ইরেকটাস সুরুজরা প্রয়োজনে দলবদ্ধভাবে কাজ করে, করে একে অপরকে সহযোগিতা। আগুনের ব্যবহার জানে তবে আগুন সৃষ্টি আবিষ্কার তখনো হয়নি। দাবানল ইত্যাদি থেকে আগুন সংরক্ষণ করে। মাংস আগুনে সেঁকে নেয়। এ আগুনকে তারা আত্মরক্ষার কাজেও ব্যবহার করে। শিশুরা মা-বাবা বা পরিবারের উপর নির্ভরশীল। আবেগ-অনুভূতি গাঢ় না হলেও মানবিকতার উন্মেষ লক্ষ্য করার মতো এবং যুগান্তকারী।
হাতিয়ারে মসৃণতা বা ফিনিশিং নেই বলে লেখকের যে ক্ষোভ তা প্রশমিত অবশ্য হয়েছে পরের গল্প- ‘দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লোম্বোস গুহার সাজুনি’ (সত্তর হাজার বছর আগে)-তে এসে। ইতিহাস অনেকদূর এগিয়েছে। এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সাজুনি, সাজে বলেই সাজুনি। এ গল্পে দেখি হাতিয়ারে নান্দনিকতা এসেছে। এতদিন পর্যন্ত ছিল মানুষ বা মানবসদৃশ, এবার খানিকটা সংস্কৃত মানুষ পেলাম দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ উপকূলে। যদিও জীবনধারা এখনো যাযাবরই। এরা আমাদের মত একই মানুষ, হোমো সেপিয়েন্স।
এসময় যেটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন তা হচ্ছে ভাষা। ভাষার সঙ্গে কথাবার্তা, গল্পগুজবও করে এই মানুষগুলো। এ সংস্কৃত মানুষরা সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠান যেমন, নাচ-গান ইত্যাদির চর্চা করে। পরিবারের উৎপত্তি হয়েছে। সাজুনির বিয়ে হয়েছে। চালু হয়েছে বিনিময় প্রথার। জাদু-টোনার মতো অপ্রাকৃত শক্তির ওপর বিশ্বাস স্থাপিত হচ্ছে। পূজো এবং বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করে মানুষ। এতদিন আগুনের ব্যবহার হয়েছে এবার হয়েছে আবিষ্কার- পাথরে পাথরে ঘষে মানুষ আবিষ্কার করেছে আগুন। এর ফলে খাবার গরম করা, হাতিয়ার তৈরি, আত্মরক্ষাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ ব্যবহার করে এ আগুন। সবচেয়ে মজার কথা এরা সাজতে ভালবাসে, অলঙ্কার তৈরি করে, তা খুব পছন্দ করে।
খাবারের সন্ধানে মানুষ এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যায়। আবিষ্কার হয়েছে বর্শা। এ বর্শা শিকারে ব্যবহৃত হয়। হোমো সেপিয়ান্স পর্যায়ে আসতে সময় লেগেছে প্রায় পাঁচ লক্ষ বছর। এ হোমো সেপিয়ান্সদের একটি শাখা নিয়ানডার্থাল। এরা আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপে পৌঁছায়। সেপিয়ান্সরাও যায় ইউরোপ,ভারত, পূর্ব এশিয়া এবং আরো পরে অস্ট্রেলিয়া। হোমো সেপিয়ান্সদের বয়সও হলো প্রায় দেড় লক্ষ বছর। এই সেপিয়ান্সরা অর্থাৎ আমাদের মত মানুষই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। বাকিটা শুধু তাদের গল্প।
দশ হাজার বছর আগেও মানুষের জীবনধারণের অবলম্বন ছিল পশু শিকার। এরজন্য মানুষ নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করছে। হরিণ শিকারের জন্য ফাঁদ পাতা হচ্ছে। হরিণের মল, পায়ের ছাপ প্রভৃতি দেখে হরিণ শিকারে যায় আবার ভুলে বাঘের খপ্পরেও পড়ে। পড়ে নিজেরাই শিকারে পরিণত হয়। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে মানুষ এখনো প্রকৃতিসহ জীবজন্তুকে বশে আনতে পারেনি। তবে বশে আনার নিরন্তর সংগ্রাম চলছে। এ সংগ্রাম যেনো অন্তহীন এবং নিরন্তর। দশ হাজার বছর আগে কৃষি আবিষ্কার করে এ সংগ্রামে অনেকটা জিতেছে মানুষ।
একসময় মানুষ অনেকটা সংস্কৃত হয়, সৃষ্টি হয় তার শৈল্পিক মন। সে ছবি আঁকে, পাথরের ডেলা থেকে সে রং তৈরি করে- লাল, কালো, সাদা। এ সময়ের চিত্র দেখে মনে হচ্ছে মেয়েরাও শিকারে যাচ্ছে। যদিও তা সংখ্যায় অনেক কম। ছবি আঁকার ক্ষেত্রে কল্পনার ছাপ স্পষ্ট দৃশ্যমান। ছবির মাধ্যমে ভাব বিনিময় হয়। মানুষের যে অব্যক্ত ভাব তা সে ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। আর যারা ছবি আঁকে তাদের সামাজিক মর্যাদাও যেন বেশি। আগে আমরা দেখেছি মূর্তি তৈরির ঘটনা। এবার সে মূর্তির মধ্যে তারা আরোপ করেছে দেবত্ব। আর ছবির মধ্যে আরোপ করেছে দৈবত্ব। তবে ছবিতে বাঘ, সিংহ, হরিণ, বাইসন এসব জন্তুর সংখ্যা বেশি তার কারণ মনে হয় এসময়ের মানুষেরা এদের নিয়েই ভাবিত ছিল বেশি। মানুষকে তাড়া করার ছবিও রয়েছে। হায়, মানুষ এখনো অসহায়। পুরুষেরা শিকারে যায়, আর মেয়েরা যায় মধু সংগ্রহে। এখনো কৃষিকাজ এসে পৌঁছায়নি ভারতবর্ষে। দশ হাজার আগে ভারতের ভীমবেতকার শিল্পীর গল্পেতো এমনটিই দেখি।
চার হাজার বছর আগে হরপ্পায় যে সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল তাতে নগর রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তবে রাষ্ট্র প্রধানের ধারণা অসেনি। ক্ষমতা তখন ব্যবসায়ীদের হাতে। জনসংখ্যা: ২৫ হাজার। এ নগর পরিকল্পিত, নাগরিক সুবিধা ছিল উল্লেখ করার মতো। এ নাগরিকদের আনুগত্য ছিল দেব-দেবীদের উপর। আগে আমরা দেখেছি শিল্পীদের সামাজিক মর্যাদা বেশি। এবার তাদের স্থান দখল করেছে দেবদাসীরা। সভ্যতা অনেকদূর এগিয়েছে। গরুর গাড়ি প্রচলন শুরু হয়েছে, পানি ধারণের জন্য চৌবাচ্চা তৈরি হয়েছে, গোসলখানা,পায়খানা, পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা রয়েছে, আছে নগর নিরাপত্তা বেষ্টনী। পণ্যের ওজনে কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট করে দেয়া বাটখারার ব্যবহার হচ্ছে। রাস্তা, নালা-নর্দমা, শস্যাগার ইত্যাদিও আমরা দেখি। সমাজটা ব্যবসা কেন্দ্রিক। ব্যবসায় পুরুষের প্রাধান্য বেশি থাকলেও কৃষিকাজে মেয়েদের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করার মতো। সেচের পানি ব্যবহার হচ্ছে কৃষিকাজে। প্রধান শস্য- বার্লি, গম, ধান ইত্যাদি। রপ্তানি পণ্য তুলা। তাঁত শিল্পও গড়ে ওঠেছে। এলাকাভিত্তিক পেশাজীবী গড়ে ওঠেছে। ফলে এলাকার নামও হয়- কাঠপট্টি, জহুরিপট্টি বা কুমোরপট্টি ইত্যাদি। এ সমাজ শ্রেণী বিভক্ত। তবে হরপ্পা সভ্যতা বিষয়ক এ যে গল্প তাতে ইতিহাস যতটা পায় গল্প ততটা পায় না। আবার হরপ্পা ধ্বংসের কারণও অব্যক্ত থেকে গেছে। আর্যরা এখানে কী ভূমিকা পালন করেছিল তাও অনুল্লেখ্য।
শেষ গল্প ‘ইস্টার আইল্যান্ডের কড়ি’ গল্পে লেখক আমাদের যে সমাজের কথা জানাচ্ছেন তা জটিল কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা। এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কড়ি। কড়ির সমাজ মূলত কৃষিজীবী এবং গৌণত মৎস্যজীবী। এ পরিবার মুরগি পালে। কৃষির ফলন বাড়াবার জন্য কম্পোস্ট সার তৈরি করা হচ্ছে, যৌথ উদ্যোগে ‘অধিক খাদ্য ফলাও’ এর চেষ্টা করা হচ্ছে। তৈরি হয়েছে গণখামার।
এ সময় গোষ্ঠীপ্রথার উদ্ভব হয়েছে সুতরাং আবির্ভাব হয়েছে গোষ্ঠীপতিরও। এ গোষ্ঠীপতিদের ক্ষমতা ক্রমে বৃদ্ধি পেয়েছে, কমেছে ব্যক্তির ক্ষমতা। যেহেতু হয়েছে সর্দার এবং শ্রমিক শ্রেণীর আবির্ভাব সেহেতু শ্রম শোষণের প্রক্রিয়াও আমরা দেখছি। ছোট সর্দাররা কড়িদের শ্রম শোষণ করছে। ফলাফল যা হবার তাই হচ্ছে মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়ছে। ইস্টার আইল্যান্ডের এ দ্বীপটি বিভক্ত হয়ে গেছে এগারটি গোত্রে। আগে যে সুস্থ প্রতিযোগিতা বিদ্যমান ছিল তা ধীরে ধীরে তীব্রতার দিকে যাচ্ছে। মূর্তি নিয়ে গোত্রে গোত্রে অশুভ প্রতিযোগিতা আরম্ভ হয়েছে। বিদ্রোহের কথাও চলে আসছে, তবে তা ক্ষীণ স্বরে। গোত্রপতিরা নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ভুলে গেছে প্রজাদের চাহিদা পূরণের বিষয়টি। ফলে কড়িরা ধীরে ধীরে দেবত্বে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এতদিন তারা দেবত্বে বিশ্বাস করতো, এবার নির্ভরশীলও হয়ে পড়েছে।
কারা কত প্রকাণ্ড মূর্তি তৈরি করবে সে প্রতিযোগিতা যখন তুঙ্গে তখনই অবক্ষয় শুরু হয়েছে।মড়া পোড়ানোর জন্যও পাম গাছ পাওয়া যাচ্ছে না, মানে পরিবেশেরও বিপর্যয় শুরু হয়েছ্‌ে। তবে মৃত মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণ করছে এবং তাদের প্রতি সম্মানও প্রদর্শিত হচ্ছে। সহজ সরল জীবনধারা কঠিনরূপ ধারণ করছে। সমাজের আর পরিবেশের অবক্ষয়ে ‘কড়িদের জীবনেও নেমে আসছে অনিশ্চয়তার কাল মেঘ।’ এরপরের ইতিহাস প্রত্নতাত্ত্বিকের না, তা ঐতিহাসিকের।
মুহাম্মদ ইব্রাহীমকে আমরা বিজ্ঞান বিষয়ের লেখক বলে জানতাম। তিনি নিজেও পেশাগত জীবনে বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। তবে বিজ্ঞানী যখন গল্প লেখেন তখন তার অন্তর্বয়নের মধ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠতম দিকটিকেই স্পর্শ করেন। প্রত্নতাত্ত্বিক এ গল্পগুলোতে তিনি ৩৫ লক্ষ বছর ধরে মানবসদৃশরা কিভাবে সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আজকের মানুষে পরিণত হলো সে বিবর্তনের ইতিহাস এবং সঙ্গে সঙ্গে সমাজ-সভ্যতা-সংস্কৃতির উত্থান-পতনের ইতিহাসও জানিয়েছেন। অন্যদিকে এ বইয়ের মধ্য দিয়ে গল্পের প্লট নির্মাণে এক নতুন দিগন্তেরও সূচিত হলো।

মানুষের পায়ের আওয়াজ
মুহাম্মদ ইব্রাহীম
প্রকাশক: অনন্যা
পৃষ্ঠা ৪১৪, মূল্য ৬০০ টাকা
প্রকাশ কাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৭