প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন

বিএনপি নাকে খত দিয়ে নির্বাচনে আসবে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
Untitled-1

আগামী নির্বাচনে বিএনপিসহ সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার কোনো ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে কি-না- এ ধরনের প্রশ্ন কয়েকবার শুনতে হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তবে প্রতিবারই এ বিষয়ক প্রশ্নে বিরক্তিবোধ করেন তিনি। একপর্যায়ে বলেন, ‘তাদেরকে (বিএনপি) কি বরণডালা পাঠাতে হবে? একবার তো আমন্ত্রণ জানিয়ে ঝারি খেয়েছি। অপমাণিত হয়েছি। আর ঝারি খাওয়ার ইচ্ছে নেই।’
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে গণভবনে সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। যদিও কম্বোডিয়া সফর ঘিরে সংবাদ সম্মেলন। সেই বিষয়ক কোনো প্রশ্ন নেই বললেই চলে। আলোচনা বিভিন্ন কায়দা-কৌশলে ঘুরেফিরে সেই একদিকেই ঠেকছিলো- শুধুই নির্বাচন আর বিএনপি প্রসঙ্গ।
ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত প্রশ্ন করেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কোনো উদ্যোগ নেবেন? উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যাদের মধ্যে ভদ্রতাজ্ঞান নেই, তাদের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছে নেই। এ ধরনের ছোটলোকিপনা যারা করে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা বলেন কোন মুখে। আমার ওপর আপনারা এত জুলুম করেন কেন? কোন দল নির্বাচন করবে, কোন দল নির্বাচন করবে না, তা তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। এখানে আমাদের কী করার আছে।’
অভিন্ন বিষয়ে এটিএন বাংলার সাংবাদিক জ ই মামুনের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তো রীতিমতো ‘দায়িত্বটা’ সাংবাদিকদের ওপরেই ছেড়ে দিলেন। শেখ হাসিনা বলেনন, ‘বিএনপিকে নির্বাচনে আনা নিয়ে যদি আপনাদের এতই আগ্রহ থাকে, তাহলে তেলের টিন, ঘিয়ের টিন নিয়ে সেখানে যান। আমি অপাত্রে ঘি ঢালি না।’
একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, গণতন্ত্র চর্চাকারী দলগুলোর উচিত গণতন্ত্রের স্বার্থে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। বিএনপি গত নির্বাচনে যে ভুল করেছে, আশা করি সামনে আর তা করবে না। এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি নাকে খত দিয়ে নির্বাচনে আসবে। এবার আর তারা ভুল করবে না। আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই। আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, এমন কোনো দৈন্যদশা সরকারের হয়নি যে আগাম নির্বাচন দিতে হবে।
প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার প্রশ্নোত্তর পর্বে উঠে আসে রোহিঙ্গা ইস্যুও। রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধুমাত্র মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এখন তাদের ফেরত যেতেই হবে। এ ব্যাপারে কম্বোডিয়া সরকারের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তারা বিষয়টি আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর কাছে তুলবে।
সম্প্রতি সৌদি আরবে জিয়া পরিবারের বিনিয়োগের যে তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে এ নিয়ে দেশের গণমাধ্যমে উল্লেখ করার মতো খবর প্রকাশ না হওয়ার দাবি তুলে বিস্ময় প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, ‘আপনারা কি সৌদি আরবে সেই শপিং মলে বিনা পয়সায় শপিং করার জন্য কার্ড পেয়েছেন। দু-একটি ছাড়া কোনো পত্রিকা-টেলিভিশনে তো রিপোর্ট দেখলাম না। আপনাদের এত দুর্বলতা কিসের জন্য। আমার নাম এলে কী করতেন? সৎসাহস হলো না রিপোর্ট দেওয়ার।’
তিনি আরও বলেন, যারা এত সম্পদের মালিক, তারা জানে মুখ বন্ধ কীভাবে করতে হয়। মুখে ‘রসগোল্লা’ ঢুকিয়েছে। আপনাদের (সাংবাদিকদের) প্রশ্নের উত্তর কেন দেব?
বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং তার পুত্র দলের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চলমান মামলার প্রসঙ্গটিও তুলে ধরেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। তিনি বলেন, ‘বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিলো, তখন আমার বিরুদ্ধে ১২টি মামলা দিয়েছিলো। কিন্তু আমরা তাদের বিরুদ্ধে একটিও দিইনি। যে মামলাগুলি এখন চলমান, সেগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দেওয়া।’
তিনি মনে করিয়ে দেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারে তো তাদের (বিএনপি) লোকজন ছিলো। তখনকার রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমেদ তাদের লোক ছিলেন। নয়জনকে ডিঙিয়ে মইন উদ্দিনকে সেনাপ্রধান করেছিলেন খালেদা জিয়া।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের লোকদের করা মামলা থেকে পলায়নপর মনোবৃত্তি কেন? আদালতে যাওয়ার জন্য যখনই বের হচ্ছেন, তখনই অঘটন ঘটছে। তাণ্ডব করছেন। বিদেশে বিভিন্ন দেশে তাদের অবৈধ টাকার বিষয়টি বের হয়ে আসছে। এগুলো তো বাংলাদেশ সরকার করছে না।
তারেক রহমানের মামলার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারেক রহমান লন্ডনে আছেন। তাকে দেশে ফেরাতে যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। আজ হোক কাল হোক তাকে ফিরতেই হবে। তিনি বলেন, তারেক সাজাপ্রাপ্ত আসামি।
প্রশ্নোত্তর পর্বের একেবারে শেষদিকে সাংবাদিকদের প্রতি তোলা প্রধানমন্ত্রীর অনেক প্রশ্নের জবাব এক কথায় দেওয়ার চেষ্টা করেন একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, সংবাদ করতে গিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের রোষানলে পড়তে হয় তাদের। যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায়ের আগে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তার পরিবারের আলাপ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করায় অ্যাটর্নি জেনারেলের রোষানলে পড়েন তিনি। এ কথা শুনে অনেকটা চমকে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের?
রিপোর্ট করার ব্যাপারে সরকারের আরও সহযোগিতা প্রত্যাশা করে মোজাম্মেল বাবু বলেন, সরকারি দপ্তরগুলো সহযোগিতা না করলে কীভাবে রিপোর্ট হবে।
নির্বাচন নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী নিজ দলের বিষয়েও কথা বলেন। আওয়ামী লীগ দলীয় কোনো সংসদ সদস্য বর্তমানে ‘রেড জোনে’ নেই দাবি করে দলীয় সভানেত্রী বলেন, কেউই খারাপ অবস্থায় নেই। নির্বাচনে ‘ডেঞ্জার জোন’ আওয়ামী লীগের জন্য সৃষ্টি হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমি পত্রিকা পড়ে দেশ চালাই না। মানুষের কথা ভেবে দেশ চালাই। মানুষই সিদ্ধান্ত নেবে কাকে ভোট দেব। আমিই স্লোগান করেছি, আমার ভোট আমি দেবে যাকে খুশি তাকে দেব। মানুষ ভোট দিলে ক্ষমতায় আসব।’ ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং পরের বছর স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্‌?যাপন করা হবে বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পাশে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা এবং দলের শীর্ষপর্যায়ের কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।