বিআরটিএ ও সড়ক দুর্ঘটনা

মাহমুদুল হক আনসারী

সড়কে শৃংখলার জন্য বিআরটিএ একটি অপরিহার্য কর্তৃপক্ষ। সড়কের শৃংখলা কোনোভাবেই আনা যাচ্ছে না। গণপরিবহনে এমন কোনো দিন নেই সড়ক দুর্ঘটনায় মূল্যবান জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে না। প্রতিদিন পএিকার পাতা খুললেই সড়কে জীবনহানির সংবাদ চোখে পড়ে। দেশের কর্মমুখী জনগণ, শিক্ষার্থীদের জন্য সড়ক ও পরিবহন এখন একপ্রকার অনিরাপদ মাধ্যমে পরিণত। প্রতিদিন অসংখ্য সংবাদ, লেখা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রতিকারের জন্য ছাপা হচ্ছে। বাস্তবে দেখা যায়, কোনোভাবেই সড়কের শৃংখলা আনা সম্ভব হচ্ছে না। এর জন্য প্রকৃতপক্ষে কারা দায়ী, সেটা সমাজ চিন্তকদের খুঁজে বের করা এখন শুরু হয়েছে। যেভাবেই হোক জনগণের চলাচলের সড়ককে নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে। পরিবহনে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ(বিআরটিএ)-এর সাথে সংশ্লিষ্টদের শৃংখলায় আসতে হবে। বিভিন্ন সূএ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায় সারা দেশের বিআরটিএর কার্যালয় দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত। ঘুষের অর্থে গাড়ির ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করা হয়। শক্তিশালী পরিবহন সেক্টরের সংগঠনের কতিপয় নেতাদের সিন্ডিকেট জগদ্দল পাথরের মতো বসে আছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে এ সেক্টর পরিচালিত হচ্ছে। বিআরটিএর অসাধু একটি গ্রুপ তাদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রেখে অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক, অযোগ্য, অদক্ষ চালকদের অবৈধ অর্থের লেনদেনে সার্টিফিকেট দেয়া হয়। এজন্য সারাদেশে বিআরটিএর অনেকগুলো দালাল চক্রের তৎপরতা দেখা যায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এভাবেই পরিবহন সেক্টরকে দুর্নীতির আখড়া বানিয়ে রেখেছে। শত শত কোটি টাকা এখানে অবৈধ ভাবে লেনদেন হয়ে আসছে। ট্রাফিক পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তাও এসব অনৈতিক লেনদেনে জড়িত। ফলে সড়কের শৃংখলা, দুর্ঘটনা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। এটা একটা অন্যতম কারণ।
রাস্তার শৃংখলার জন্য ট্রাফিক পুলিশের যে দায়িত্ব সেটাও যথাযথভাবে পালন করতে দেখা যায় না। সারাদেশের সড়কগুলোতে রাস্তার দু’ধারে গাড়ি পার্কিং, বিল্ডিং সামগ্রী স্তূপ করে থাকতে দেখা যায়। দিনের বেলায় ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান সড়কে নির্দিষ্ট সময়ের বাইওে চলাচল দেখা যায়। এসব গাড়ি টোকেন এবং ট্রাফিক পুলিশের বাণিজ্যে অনেকটা চলাচল করে। গণ পরিবহনে বিশেষ করে শহরকেন্দ্রিক পরিবহনে অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালক হেল্পার যাএীদের জানমালের ঝুঁিক নিয়ে চলাচল করে। বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ এসব দেখেও চোখ বুজে থাকে।
সড়কে গণপরিবহনের ওভার টেকিংয়ের প্রতিযোগিতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা সংগঠিত হচ্ছে। ছোট ছোট গণপরিবহন গাড়ির বৈধ কাগজপএ ছাড়া রাস্তায় চলাচল করছে। নতুন পুরাতন লক্কর ঝক্কর পরিবহনে সড়ক শৃংখলা খঁজে পায় না। ফুটপাত পর্যন্ত পরিবহনের কারণে চলাচল অযোগ্য হয়ে যায়। ফুটপাতের যাএী শংকার মধ্যে পথ চলে। স্কুল কলেজ ছাএ ছাএীরা চরম ভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় বের হয়। বলতে গেলে একটা উচ্ছৃংখল এবং বিশৃংখলায় পরিপূর্ণ পরিবহন সেক্টর।
এ সেক্টরের শৃংখলা আনতে হলে প্রথমে শৃংখলায় আসতে হবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে। তারপর আসতে হবে ট্রাফিক পুলিশ বিভাগকে। এরপর সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিককে। এসব সংস’া-কর্তৃপক্ষ যতদিন না, সমন্বয়, আন্তরিক, দুর্নীতিমুক্ত হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত এ সেক্টরকে দুর্ঘটনামুক্ত করা যাবে না। পরিবহন শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার তাদের প্রয়োজনীয় দাবী দাওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে। দেখা যায়, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন পরিবহনের উপর নির্দিষ্ট আকারে দৈনিক টাকা বসিয়ে দেয়। ফলে সড়কে প্রতিযোগিতা করে যাএী উঠানামা করতে যুদ্ধে নেমে পড়ে। ওভারটেকিং, অবৈধ লাইসেন্স প্রদান অপ্রাপ্তদের হাতে পরিবহন তুলে দেয়া বন্ধ করতে হবে। পরিবহন সেক্টরের সাথে সম্পৃক্ত মানুষগুলোকে সমাজে সসম্মানে ব্েচে থাকার নিরাপত্তা দিতে হবে। তাদের প্রতি যাএী সাধারণের ব্যাবহারেরও পরিবর্তন হতে হবে। তারা সমাজের অংশ, তাদের শ্রম ছাড়া সড়ক অচল। সেসব বিষয় চিন্তায় রেখে পরিবহন সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকেই একটা শৃংখলাপূর্ণ অবস’ানে আসতে হবে। তাদের ন্যূনতম শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, সড়কের সবগুলো শৃংখলা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান দেয়া দরকার। পরিবহন মালিকদের রাস্তায় গাড়ি নামানোর পূূর্বে শ্রমিকদের যোগ্যতা দেখা উচিত। অর্থের জন্য জীবনের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে এভাবে অযোগ্য, অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক লোকদের হাতে পরিবহন তুলে দেয়া মারাত্মক ধরনের অপরাধ। তাই সড়কের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রথমত, বিআরটিএ পরিবহন মালিক শ্রমিক ট্রাফিক পুলিশকে সবধরনের অনৈতিক লেনদেনের উর্ধ্বে থাকতে হবে। এসব সেক্টর থেকে সব ধরনের ঘুষ দুর্নীতি দালাল চক্র প্রতিহত করতে হবে।
সড়ক যোগাযোগ ও পরিবহন মন্ত্রণালয়কে সড়কে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বাস্তব জায়গায় হাত দিয়ে জন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া কখনো হাজার লেখালেখি হলেও ওইসব কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে না। বিআরটিএর মতো সেবা সংস’াগুলোকে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা দালাল চক্রের বিরুদ্ধে মাদক ও জঙ্গি বিরোধী তৎপরতার মতো অভিযান চালাতে হবে। বেসামাল পরিবহন খাতকে, শৃংখলায় আনতে অবিলম্বে বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও যাএী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মতো সামাজিক সংগঠনসমূহের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের দৃশ্যমান তৎপরতা প্রত্যাশা করি।