বাবু ও মানিকের যুদ্ধ

সাঈদুল আরেফীন

হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙে যায় আমার। তখনো সকাল হয়নি। চারিদিকে শোরগোল। স্লোগান আর স্লোগান। বাসার সামনেই উঠানে হাজার হাজার লোক এসে উপসি’ত। এই মাত্র খবর এলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। ঘুম থেকে ওঠে যাওয়াতে মা বলে শু’তে যা, সকাল হয়নি। ঘুমো রে বাবা। মা যতোই ঘুমানোর কথা বলেন, ততোই শোরগোল আর শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে। পুরো ঘর বাড়ি যেনো কেঁপে উঠছে। এভাবে শ্লোগান আর শব্দে কী আর ঘুমানো যায়? আমিও ওঠে গেলাম ঘুম ছেড়ে। মা আর থামাতে পারলো না আমাকে। দৌড়ে এসে দেখি বিশাল লম্বা আকৃতির ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেনো উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হলো বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে পাচ্ছি।
আমার পাশে দাঁড়ানো আমারই সমপাঠী বন্ধু মানিক বলে উঠলো, আজ তো দেশ স্বাধীন হয়েছে বাবু। তুই জানিস না। এজন্যে বিজয় মিছিল আর শ্লোগান হচ্ছে। দেখছিস না মুক্তিযোদ্ধারা সব কাঁধে অস্ত্র নিয়ে আমাদের এখানে চলে আসছে। মানিকের কথায় সায় দিয়ে আমিও বলে উঠলাম, সকাল হবার অনেক আগে থেকেই তো শ্লোগান আর মিছিলের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
-সত্যিই কী যে ভালো লাগছে। তোকে বোঝাতে পারবো না। মানিক বলে, যুদ্ধের যে কয়টা মাস গেছে। প্রতিদিন তো আমরা ভয়ে ভয়ে ছিলাম দোস্ত। মানিকের কথায় সায় দিয়ে আমিও বললাম-
– শহরে গ্রামে সব জায়গায় মিলিটারিরা আক্রমণ করেছে। মানিক বলে,
-শুধু আক্রমণ নয়, নানাভাবে নির্যাতন করেছে ওরা। খাতুনগঞ্জ, কোরবানীগঞ্জ, হাজারি গলি সবখানে নানাভাবে লুটপাট করেছে ওরা যুদ্ধের দিনে। এমনকি আমাদের স্কুলের বড়ো বোনদের অনেককেই ওরা বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। কারো খোঁজ পাওয়া গেছে। কারো পাওয়া যায়নি। কী যে একটা ভয়াবহতা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। মনে হচ্ছে আমরা এখন প্রাণটা ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। মানিকের কথার উত্তর দেই আমি,
-বিশ্বাস কর মানিক কী যে আনন্দ লাগছে বোঝাতে পারবো না। আজকের দিনটা না আমার কাছে অদ্ভুত মনে হচ্ছে। মানিকের কথা কেড়ে নিয়ে আমি আরো বললাম, তুই ভুলে গেলেও আমি কিন’ জীবনেও ভুলতে পারবো না।
-আমিও ভুলিনি। তবে যুদ্ধের ভয়াবহতায় অনেক কথাই আমাদের মন থেকে মুছে গিয়েছিলো ? মানিক আরো বলে।
-বাবু মনে আছে ওইদিন সন্ধ্যে বেলা। ওই যে রাজাপুকুর লেইন, আন্দরকিল্লার মোড়ে জিপ গাড়ি নিয়ে পাক আর্মীদের গাড়ী টহল দিচ্ছে। মেশিন গান তাক করে বসে আছে একদল। আর অন্য দল সশস্ত্র গাড়িতে। কোথাও কোন মানুষজন নেই। সবাই ভয়ে আতংকে যে যার বাড়ি ঘরে ফিরে গেছে। ওরা এসব জায়াগায় নিরীহ লোকজনদের ধরে মারধর করছে। কিছু কিছু লোক পাকড়াও করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের এ অবস’াকে রুখে দেয়ার জন্য পাড়ার রফিক কমান্ডার আমাদের মতো কয়েকজন কিশোরকে তাৎক্ষণিক ব্যবহার করে। অবশ্য এজন্যে প্রস্ততিও নিতে হয় ক’দিন। প্রতিদিন ভোরবেলয় দল বেঁধে আমাদের কিশোর দলকে ট্রেনিং করাতে নিয়ে যেতো, বাকলিয়ার কর্ণফুলী তীরের চরের জঙ্গলে।
– হ্যা মনে পড়ছে মানিক। ওই তো মাত্র এপ্রিল মাসের ঘটনা। সবে যুদ্ধ শুরু হলো। কী মারাত্মক আর ভয়াবহতা। কী করে ভুলবো এই কথা? তবে ভুলে যাওয়ার মতো করেই তো ছিলাম আজকের যুদ্ধ জয়ের দিন পর্যন্ত।
-ঠিকই বলেছিস বাবু, মা বাবা আমাদের দু’জনকে সে কী খোঁজাখুঁজি করে। রাতে বাসায় ফিরিনি আমরা। জেনারেল হাসপাতালের পাহাড়ের ওপরে পাড়ার ১০/১২ জন কিশোর ছেলেকে সাথে নিয়ে আমরা কাটাপাহাড়ের পাশ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে অবস’ান করি। তুই সামনে আমাদের লিডার হয়েছিলি। আমি ঠিক তোর পেছন পেছন ছুটছি। সবার হাতে হাতে গ্রেনেড। প্রথমটা ছুঁড়ে মারলো রাকিবই। ঠিক জিপগাড়িটার আশেপাশে যে কয়জন আর্মি ছিলো সবাই কুপোকাৎ। ধপাধপ সবাই ছুঁড়ে মারলো হাতে থাকা সব গ্রেনেডগুলো। বিকট আওয়াজে রাস্তায় থাকা লোকজন ছুটতে লাগলো। আমরা পরক্ষণেই হামাগুড়ি দিয়ে কাটাপাহাড় দিয়ে নেমে এলাম। মানিক আবার বলে,
-‘এরপর যে যেভাবে পেরেছি দৌড়াতে দৌড়াতে কীভাবে বাকলিয়ায় এসে গেছি,বুঝতে পারিনি। সারারাত চরের মধ্যে রাত কাটানোর কথা জীবনেও ভুলবো না। কাদামাটির মধ্যে জোঁকের কামড়ে রক্ত পড়ছিলো সে কথা মনে করবার সুযোগও পাইনি। বিশ্বাস কর মানিক আজ মনে হচ্ছে, আমাদের চেতনা ফিরে এসেছে। কী যে খুশি লাগছে। রফিক কমান্ডার আমাদের মতো কিশোরদের কৌশলে আন্দরকিল্লার যুদ্ধে ব্যবহার করে পাক আর্মিদের মনোবল অনেকটাই ভেঙে দেয়। আমাদের দলের প্রত্যেকটা ছেলে দেশের জন্য একাট্টা হয়ে যেভাবে সাহস নিয়ে লড়াইটা করলো, রীতিমত দুঃসাহসিক। মানিকের কথায় সায় দিয়ে আমিও বলি, ভেবে অবাক হই কীভাবে যে আমাদের কিশোর দলটাকে রফিক কমান্ডার ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করে নিলো।’ আমার কথায় মানিক এতোক্ষণ কী যেনো ভাবছিলো। এবার বলতে শুরু করে আবার,
-শুধু কী আন্দরকিল্লার যুদ্ধ। ২৬ মার্চ যখন বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হলো। মনে আছে তোর, ছোটমামাই তো আমাদের ক’জনকে ডেকে নিয়েছিলো। নদীর ওপাড়ে সাম্পানে করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক অস্ত্রশস্ত্র পৌঁছে দিয়েছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে।
-হ্যাঁ, আমার মনে আছে ,সব ছেলের কোমরের মধ্যে এমন করে অস্ত্র বেঁধে দিয়েছিলো কেউ সন্দেহ করতে না পারে। সেই থেকেই তো আমাদের সাহসটা বেড়ে গেলো। এই সুযোগে রফিক কমান্ডার আমাদের নিয়ে দল গঠন করলো। এরকম অনেকগুলো টুকরো টুকরো ঘটনার জন্য আমরা কী নিজেদের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বলতে পারি না?
– তা তো বলতেই পারি। বাবুর কথায় মানিকের জবাব।
সকাল ১০ টার একটু বেশি হবে। ছোটমামাকে নিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম স্টেডিয়ামে। সবাই জড়ো হয়েছে। সবার মুখে জয়বাংলা স্লোগান। যেনো মানুষের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। দেখতে পাচ্ছি, কারো গায়ে কাপড় নেই। ময়লা জামা। শত শত অসহায় নারী -পুরুষ যে যার মতো এসেছে। স্বাধীনতা কী, কেন এখন তা আমরা বুঝতে পারছি। ছোটমামা আওয়ামী লীগ নেতা বলে বাড়ি থেকে অনেকদিন পালিয়েছিলো। আমাদের নিয়ে ছোটমামার আনন্দ দেখে কে? বড়ো বড়ো নেতাদের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে কিশোর যোদ্ধা হিসেবে। নেতারা আমাদের পিঠ চাপড়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে।
স্টেডিয়ামের এক পাশে অনেক লোক কান্নাকাটি করছে জোরেসোরে। কেউ মা বাপ হারিয়ে কেউ বা ভাই বোন, কারো পরিবারে সবাইকে মেরে ফেলার ঘটনা বলছে। আমি আর বাবু এসব দেখে মামাকে পীড়াপীড়ি করলাম- মামা চলো, বাসায় চলো। আমাদের আর ভালো লাগছে না। আমাদের তাড়াহুড়ো দেখে, মামা বললো-‘তোরা না যোদ্ধা, এসব কষ্ট দেখে তোরা যদি ভেঙে পড়িস, চলবে কী করে? অনেক স্বপ্নের রক্তে ঝরানো বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর আজীবন সংগ্রাম আর জোরালো নেতৃত্ব ছিলো বলেই দেশটা আজ স্বাধীন হলো। এই মহান নেতার নেতৃতে দেশটাকে নতুন করে গড়তে হলে অনেক কিছু করতে হবে আমাদের। তোদের মতো কিশোরদের লেখাপড়া শিখে মানুষ হতে হবে। সেই সাথে দেশ মাটি মানুষকে ভালোবাসতে হবে। তবেই তোরা যে নিজের জীবন তুচ্ছ করে কষ্ট করেছিস তা সার্থক হবে।