বান্দা প্রিয় হলে আচরণও প্রিয় হয়

হাফেজ মুহাম্মদ আনিসুজ্জমান

আল্লাহ্ তাআলার জন্যই সকল প্রশংসা ও গুণগান, যিনি সৃষ্টির সকল কিছুর ওপর মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তাঁর পবিত্রতা জানাই, যিনি তাঁর ইবাদত-বন্দেগী গ্রহণযোগ্যতার জন্য পবিত্রতার শর্ত আরোপ করেছেন। তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, যিনি অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে আমাদেরকে ইনসান বানিয়ে যারপরনাই অনুগ্রহ করেছেন।
আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয়। তিনিই একমাত্র উপাস্য। আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। তাঁর কোন শরীক নেই। আমাদের সঠিক পথে চালনাকারী, হাদীয়ে মাহ্দী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তিনি বন্দেগীর মূর্তরূপ, রিসালতের ধারা সমাপ্তকারী।
হজ্বের আনুষ্ঠানিকতা পুরোদমে শুরু হচ্ছে। পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজী সাহেবান ধীরে ধীরে মক্কা শরীফে জড়ো হতে যাচ্ছেন। সপ্তাহখানেক পরেই সে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং যিলহজ্বের ২য় সপ্তাহে তাঁরা মিনায় রওয়ানা হবেন।
হজ্বের ফরয এর সংশ্লিষ্ট আলোচনা ইতোমধ্যে পত্রস’ করা হয়েছে। হজ্বের ৬টি ওয়াজিব রয়েছে। যথা, মুযদালিফায় অবস’ান, মিনাতে শয়তানের প্রতি কঙ্কর নিক্ষেপ করা, কুরবানী বা দমে কেরাম ও তামাত্তু, হলক্ব বা কসর তথা মাথা মুন্ডানো বা চুল ছাঁটা, সাফা-মারওয়া নামক পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে সায়ী দ্রুত চলাচল করা এবং বহিরাগত হাজীদের বিদায়ী তাওয়াফ। হজ্বের যাবতীয় আহকামের মধ্যে যে স’ান বা বস’ সংশ্লিষ্টতা পায়, সেগুলোর নেপথ্যে আল্লাহ্ তাআলার কোন না প্রিয় বান্দার স্মৃতি জড়ানো থাকে। কাজগুলো যেন তাঁদেরই স্মৃতিকে জীবন্ত করে তোলে।
যেমন সাফা-মারওয়ার সাঈ। সাফা ও মারওয়া হল পাথরের দু’টো উঁচু ঢিবি। বর্তমানে এটুকুই দৃষ্ট হয়। কিন’ সাফা-মারওয়ার সাঈ বা ছুটোছুটির মূল ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন ওই দুটো বাস্তবেই দু’টি পাহাড় ছিল। সাফা-মারওয়া সম্পর্কে আয়াতে বর্ণনা বিদ্যমান। আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তাআলার নির্দেশগুলোর অন্যতম। সুতরাং যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহ বা আল্লাহ্র ঘরের হজ্ব কিংবা ওমরাহ্ পালন করে, তাদের জন্য এ দু’টিতে প্রদক্ষিণ করায় কোন দোষ নেই। বরং কেউ যদি স্বেচ্ছায় কোন নেক কাজ করে, তবে আল্লাহ্ যথার্থ প্রতিদান দাতা, উত্তম অবগত’। (২:১৫৮)
ওমরাহ ও হজ্ব উভয়ের মধ্যে সাফা-মারওয়ার সাঈ করা ওয়াজিব। পবিত্র কুরআনের উপরিউক্ত আয়াত এ নির্দেশনার ভিত্তি। সাফা ও মারওয়া সংক্ষিপ্ত দূরত্বে অবসি’ত প্রসিদ্ধ দু’টি পাহাড়। কা’বা শরীফের পূর্বদিকে, দরজার সোজা বিপরীতে অবসি’ত। মারওয়া উত্তর দিকে, সাফা দক্ষিণে বর্তমান হারামের অভ্যন্তরেই অবসি’ত। আয়াতে এ দু’টি পাহাড়কে ‘শাআয়েরুল্লাহ্’ বা আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন বলে ব্যক্ত করার পর হজ্ব ও ওমরাহ্ আদায়কারীকে এ দু’টি পাহাড়ে আসা-যাওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রদক্ষিণ করতে বলা হয়েছে। তবে আয়াতোক্ত প্রয়োগ ভঙ্গিতে বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে এ ‘সাঈ’ (পাহাড়দ্বয়ের মাঝখানে দ্রুত পায়ে চলে সাতবার আসা-যাওয়া) নিছক বৈধ, বাধ্যতামূলক নয়। এ রূপ প্রয়োগভঙ্গির বিশেষ কারণ আছে, যা শানে নুযূলে বর্ণিত হয়েছে।
উক্ত আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে সদরুল আফাদ্বিল হাকীম মুফতী সায়্যিদ নঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)র বর্ণনা ‘জাহেলী যুগে সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ে দু’টি মূর্তি স’াপিত হয়েছিল। সাফার উপরে রাখা মূর্তির নাম ‘আ-সা-ফ’, আর মাওয়াতে রাখা মূর্তিটির নাম ‘না-ইলাহ’। তখন কাফির সম্প্রদায়ও পাহাড় দুটির ওপর প্রদক্ষিণ করত। আসতে যেতে তারা মূর্তি দু’টিতে হাত বুলাত। অবশ্যই তা পুণ্যকাজ ভেবেই করত। ইসলামী যুগে যদিও মূর্তিদ্বয় ভেঙ্গে দেয়া হয়, তবুও মুসলমানদের কাছে পাহাড় দু’টিতে সাঈ করতে দূষণীয় মনে হচ্ছিল।
কারণ এতে কাফিরদের কাজের সাদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে বলে তাদের মনে আশঙ্কা জাগে। তাদের মনের সংশয় দূর করতে আল্লাহ্ তাআলা এ আয়াত নাযিল করেন। এখানে মূর্তি তো নেই, আর কুদরতের নিদর্শন বলে আখ্যা পাওয়া-এ পাহাড় দুটির প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও ইবাদতের পরিপনি’, শির্ক জাতীয় কিছু নয়। এখন তোমরা সাফা ও মারওয়ার নির্দ্বিধায় সাঈ করো-এ নির্দেশনা নিয়েই এ আয়াত অবতীর্ণ। এ সাঈ এখন বৈধই নয়, আল্লাহর আনুগত্য বিধায় নিঃসন্দেহে ইবাদত। যেভাবে কা’বা শরীফের অভ্যন্তরে রাখা মূর্তিগুলো অপসারণ করার পর তার তাওয়াফ সম্পূর্ণ বৈধ এবং কা’বা শরীফের মর্যাদা পুনঃবহাল হয়েছে‘। (খাযাইনুল ইরফান) সাঈ করার এ কাজটি নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র অনুগ্রহভাজন এক মহিয়সী নারীর বিশেষ মুহূর্তে কৃত আচরণের অনুসরণ। যাতে সে পুণ্য স্মৃতির পৌনঃপুনিক অনুসরণ অব্যাহত থাকে। সেই কাজটি কে কেন করেছিলেন, তা আজ প্রায় সকল মুসলমানের কাছে সুবিদিত। কাজটি সাফা ও মারওয়ায় ছুটোছুটি, করেছিলেন হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আলাইহিস সালাম)’র পুণ্যবতী সহধর্মিণী, শিশু হযরত ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)’র শ্রদ্ধেয় আম্মাজান হযরত হাজেরা (আলাইহাস সালাম)। শিশু পুত্র ইসমাঈলকে তার কাছে রেখে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) চলে যাওয়ার পর কিছুদিনের মধ্যেই তাদের রসদ ফুরিয়ে যায়। জনহীন মরুপ্রান্তরে তাঁর শিশুপুত্রের প্রচণ্ড তৃষ্ণা জাগে। তৃষ্ণার্ত এ শিশুর মুখে দেবার জন্য একটু পানির সন্ধানে ব্যাকুল জননী। আল্লাহর ঘরের সামনে শিশু ইসমাঈলকে রেখে ছুটলেন পানির খোঁজে। মরুর খোলা প্রান্তরে উত্তপ্ত রৌদ্র রশ্মিতে সাফার দিকে তাকাতে মনে হল সেখানে পানি ছল ছল করছে। এক দৌড়ে সেখানে গিয়ে দেখলেন পানি নয়, মরুর মরীচিকা। বিপরীত দিকে পুনরায় অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিলেই দেখা গেল মারওয়ার পাহাড়টাই পানির ঝিল। আবার প্রাণপণে ছুটলেন শিশু পুত্রকে বাঁচাবার তাগিদে। এভাবে সাতবারই এদিক ওদিক ছুটাছুটি হল। শিশু পয়গম্বরের জন্য মায়ের আকুতি আল্লাহর রহমতের দরিয়ায় জোয়ার আনল। ইতোমধ্যে কা’বার প্রাঙ্গণে স্নিগ্ধ জলধারা ফোয়ারার গতিতে চারদিক প্লাবিত করে তুলল। অবিশ্বাস্য! ফুটে ফুটে এ ফোয়ারা গড়িয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে যেতে লাগল। রুদ্ধশ্বাসে মা হাজেরা দু’হাতে পানি আগলাচ্ছেন, আর বলছেন, যম, যম, অর্থাৎ থাম, থাম। এই থেকে কুদরতের এ ঝর্ণাধারা ‘যমযম’ নামে সি’র হয়ে গেল। মানুষের আঁজলায় ধরা দিল যেন কাওসারের স্বাদ। এ পানিকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে জনবসতি। হযরত হাজেরা এ ত্রস্ত ব্যস্ত পদক্ষেপ অনাগত কালের হজ্ব পালনেচ্ছুদের জন্য তাঁর স্মৃতিকে জীবন্ত রাখার ব্যবস’া স্বরূপ হয়ে গেল ওয়াজিব। সেই আবে যমযমে তৃপ্ত হওয়ার মহড়াও চলে প্রতি মুহূর্তে। সাফা-মারওয়া যেমন হযরত হাজেরা (আলাইহাস সালাম)’র স্মৃতিবহ, সাথে সাথে যমযম উৎপত্তিসহ পাহাড় দু’টি তেমনি হযরত ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)র স্মারক। কারণ তাঁরই পিপাসা নিবারণের প্রয়োজনে মা হাজেরা সাফা-মারওয়ায় দৌঁড়েছিলেন। সেই এক শিশুর তৃষ্ণা মেটাতে উৎসরিত যমযম কিয়ামত পর্যন্ত কত আল্লাহর বান্দাকে ক্রমাগত তৃপ্ত-পরিতৃপ্ত করে যাবে তা হিসাব করার সাধ্য কার?
হজ্বের আরেকটি ওয়াজিব মুযদালিফা নামক চড়াই-উৎরাইয়ের বিস্তীর্ণ উপত্যকায় অবস’ান, আরাফা থেকে সকল হাজী এখানে এসে মাগরিব ও ইশার নামায একত্রে আদায় করেন। এইদিন, এইস’ানে হজ্ব পালনকারী ছাড়া আর কোন সময়, কোথাও কারো জন্য এ নিয়ম নেই। এখানে সমবেত হাজীগণ মিনায় শয়তানের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপের জন্য পাথরকণা সংগ্রহ করেন, রাত্রিযাপন করেন। বাবা আদম ও মা হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম) পৃথিবীতে অবতরণের পর উভয়ের প্রথম দেখা হয় আরাফাতে। কথিত আছে এরপর উভয়ে একসাথে পথ চলতে চলতে মুযদালিফায় এসে বিশ্রাম নেন। মুযদালিফার আরেক নাম মাশআরুল হারাম। আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘অতএব, যখন তোমরা আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তন করবে। তখন মাশআরে হারাম’র নিকট আল্লাহ্র স্মরণ করো‘। (২:১৯৮)
অনুরূপভাবে তামাত্তু বা কিরান হজ্ব আদায়কারীর জন্য এর দম বা কুরবানী দেওয়া ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্ব বা ওমরাহ্ পূর্ণ করো। অতঃপর যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও, তবে সহজলভ্য কুরবানী প্রেরণ করো। আর যতক্ষণ কুরবানীর পশু যবেহ্র নির্ধারিত স’ানে না পৌঁছে ততক্ষণ মাথা মুড়াবে না’। (২:১৯৬) এতে কুরবানী ও মাথার চুল কামানোর নির্দেশ বর্ণিত। আরেকটি ওয়াজিব জামরাতে রমী করা। অর্থাৎ দশ থেকে বার তারিখ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে শয়তানের উদ্দেশ্যে কঙ্কর নিক্ষেপ করা। হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আলাইহিমাস সালাম)’র কৃত আমলগুলোর পুনরাবৃত্তি করে তাঁদের এই পুণ্য স্মৃতিকে পুনঃজাগ্রত করা হয়। কারণ ওই কাজগুলোতে আল্লাহ্ তাআলা খুশী হয়েছেন। তাই প্রিয়জনদের বিশেষ মুহূর্তের কাজগুলোও প্রিয়দর্শন বিচারে অনাগত প্রজন্মের মাধ্যমে তিনি বারবার দেখেন। আমাদের আমলগুলোও তিনি খুশী হয়েই যেন গ্রহণ করেন।

লেখক : আরবী প্রভাষক, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদ্রাসা।
খতিব : হযরত খাজা গরীব উল্লাহ শাহ (র.) মাজার জামে মসজিদ।