বান্দরবানে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন থামছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান
বান্দরবানে পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা বসতি-সুপ্রভাত
বান্দরবানে পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা বসতি-সুপ্রভাত

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবানে পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন হওয়া ঠেকানো যাচ্ছে না। নির্বিচারে পাহাড়, গাছপালা কর্তনের কারণে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাতে বাড়ছে পাহাড় ধসের ঘটনাও। অপরিকল্পিত বসতি স’াপন এবং অবকাঠামো নির্মাণের ফলে পাহাড় ধসে প্রাণহানিও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞ মহলের দাবি, অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ে ধসের সৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড় ধস তাৎক্ষণিক ঘটনা মনে হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার একটি ফসল। গতকাল রোববারও বান্দরবানে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পাহাড় ধসে প্রাণহানির শঙ্কা কাটছে না স’ানীয়দের।
সরকারি সূত্রমতে, পাহাড় ধসে ২০০৬ সালে জেলা সদরে মারা গেছে ৩ জন, ২০০৯ সালে লামা উপজেলায় শিশুসহ ১০ জন, ২০১০ সালে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ৫ জন, ২০১১ সালে রোয়াংছড়ি উপজেলায় ২ জন, আর ২০১২ সালে লামা উপজেলায় ২৮ জন এবং নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ১০ জন, ২০১৩ সালে সদরের কালাঘাটায় ২ জন, ২০১৪ সালে সদরে ৪ জন, ২০১৫ সালে জেলা সদরের বনরুপাড়ায় ৩ জন, লামা উপজেলার হাসপাতাল পাড়ায় ৬ জন এবং ২০১৭ সালের জুন মাসে জেলা শহরে শিশুসহ ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে বান্দরবানে। হতাহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা স্বত্বেও পাহাড় কেটে আবাসস’ল তৈরির প্রক্রিয়া থেমে নেই জেলায়। গত শনিবারও জেলা সদরের কালাঘাটায় পাহাড় কেটে কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স’াপনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
কিন’ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের স’ায়ী পুর্নবাসনের কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না দীর্ঘদিনেও। বর্ষায় যাদের জীবন কাটে আতঙ্কে।
বান্দরবানের মৃত্তিকা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহাবুবুর ইসলাম বলেন, পাহাড় ধসের ঘটনা তাৎক্ষণিক মনে হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার ফসল। মূলত পাহাড় ধস শুরু হয় ভূমি ক্ষয়ের মধ্যদিয়ে। প্রবল বর্ষণে নালা তৈরি হয়ে পরবর্তীতে ধসে পড়ে। পাহাড় ধসের অনেকগুলো কারণে মধ্য প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন এবং অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা। পাহাড়ি অঞ্চলে ঘনঘন ভূমিকম্প এবং অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ে ফাটল তৈরি হয়। বৃষ্টির সময় ফাটলে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে আস্তে আস্তে পাহাড়টি ধসে পড়ে। সম্প্রতি সময়ে বান্দরবানে ২৪ ঘণ্টায় ৩০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা এ অঞ্চলে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড বিগত বিশ বছরে।
এদিকে জেলা সদরের ইসলামপুর এবং লেমুঝিড়ি এলাকায় পাহাড়ের দুটি অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রবল বর্ষণের কারণে ফাটলটি ক্রমশ বাড়ছে।
ফাটল দেখা দেয়ায় স’ানীয়দের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। স’ানীয় বাসিন্দার পাইম্রাউ মারমা, মিথিলা মারমা বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অবিরাম বর্ষণে সময় ধসে পড়া পাহাড়ের পাশের একটি পাহাড়ে ফাটল তৈরি হয়। বৃষ্টি হওয়ায় ফাটলটি আরো বড় হচ্ছে। ফাটলের কারণে স’ানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কয়েকটি পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে ইতিমধ্যে অন্যত্র চলে গেছে। যারা আছেন তারাও বৃষ্টি হলে রাতের বেলায় না ঘুমিয়ে জেগে থাকেন।
অপরদিকে ইসলামপুরের বাসিন্দার মোহাম্মদ মোল্লা, আবু সালেহ বলেন, দু বছর আগে ভূমিকম্পনের ফলে ইসলামপুর পাহাড়ের বিশাল একটি অংশে ফাটল দেখা দেয়। ফাটলের কারণে ইসলামপুর সড়কটিও কয়েকফুট নিচের দিকে সরে গেছে। বৃষ্টি হলে এখানকার বাসিন্দাররা আতঙ্কে ঘুমাতে পারে না। দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।
এদিকে পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে তোলা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোর তালিকা তৈরিতে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঠেকাতে পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ স’ানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ছাড়তে প্রাথমিকভাবে মৌখিক নির্দেশ দিয়েছেন বাসিন্দাদের। নির্দেশ না মানলে আইন প্রয়োগ করে সরানো হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আলীনূর খান।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ডি.এ মো. মাকসুদ চৌধুরী বলেন, পরিবেশ বিপন্নের কারণেই মূলত ঘটছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। পাহাড় ধসের ঝুকিতে বসবাসকারীদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।