বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম একদফা ও এম এ আজিজ

মোহাম্মদ মহসিন

আজ যে মানুষটিকে স্মরণ করে লিখতে বসেছি তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম নেতা এম এ আজিজ । ১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি বিপুল ভোটে এমএনএ নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে ৪ ঠা জানুয়ারি ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে নির্বাচিত এমএনএ হিসেবে শপথ গ্রহণ, অতঃপর ১০ জানুয়ারি বহদ্দার হাট ও ফটিকছড়িতে জীবনের শেষ জনসভায় ভাষণ প্রদান করেন। ১৯৭১ সালের ১১ জানুয়ারি দিবাগত রাত তিনি ইনেত্মকাল করেন।
একজন ব্যক্তি আজিজের জন্ম, বেড়ে উঠা এবং মৃত্যু সমগ্রটাই রাজনৈতিক মোড়কে আবৃত। বিচিত্র গুণ এবং অসাধারণ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, রাজনীতিতে আদর্শগত অনমনীয় ও আপোসহীন কঠোরতা ও দৃঢ়তা তাঁর চরিত্রের অনুকরণীয় দিক। তিনি ১৯৪৯ সালে মওলানা ভাসানী , শামশুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যনত্ম তিনি চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এর পদে আসীন ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন আওয়ামী লীগের কা-ারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও নীতির প্রতি অবিচল থেকে এম এ আজিজ চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে আওয়ামী লীগের ঝান্ডাবাহী সিপাহসালার হিসেবে মুজিব আদর্শ প্রচারে নিবেদিত থেকে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের সার্থক পরিনতির সোপান নির্মান করে দিয়ে গেছেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, দেশ বিভাগ পূর্ব ঔপনিবেশিককালীন সময়ে সামনত্মবাদী মুৎসুদ্দি এবং তাদের দোসরদের দ্বারা এ ভুখ-ের মানুষ যখন বঞ্চিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সহযোগীরা দেশের অধিকারহারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ব্যাপৃত থেকে আমজনতার নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। যে যাই বলুক, বঙ্গবন্ধুর সেই আদর্শ- অধিকারহারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মন্ত্রে উজ্জীবিত সহকর্মী হিসেবে অনেকেই থাকতে পারেন , কিন’ চট্টলার এই ঐতিহাসিক জনপদে এম এ আজিজই তাঁর যোগ্য ও বিশ্বসত্ম সহচর ছিলেন, তা সন্দেহাতীত ।
অনেক ত্যাগ তিতীড়্গা, আন্দোলন- সংগ্রাম , কারাভোগ, নির্যাতন ও নিপীড়ন সহ্য করে মুজিব আদর্শ প্রতিষ্ঠার লড়াকু সৈনিক হিসেবে এম এ আজিজ চট্টলার আওয়ামী রাজনীতি আদর্শের বুনিয়াদ রচনার মাধ্যমে মুক্তির যে স্বপ্ন বীজ বপন করে গেছেন, এ প্রজন্মের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জন্য তা অনুপ্রেরণা ও পথচলার দিশা হয়ে থাকবে।
বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ছয় দফার তিনি প্রথম সমর্থক এবং তাঁরই সমর্থনে ১৯৬৬ সালে ২৫ ফেব্রম্নয়ারি লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু ৬ দফা বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। এর ফলশ্রম্নতিতে বঙ্গবন্ধু এবং এম এ আজিজ সহ অনেক নেতা কর্মী গ্রেফতার হন। এম এ আজিজ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন ছয় দফা দিয়ে বাঙালির মুক্তি বিলম্বিত হবে। তাই ১৯৭০ সালে ১৫ মে এম এ আজিজ বললেন “ ছয় দফা গ্রহণ করা না হলে দেশ বিভক্ত হয়ে যাবে তখন মাত্র এক দফার আন্দোলনই শুরম্ন হবে”। পাকিসত্মানি সামরিক শাসনের বিরম্নদ্ধে এমন বক্তব্য প্রদানের কারণে ১৯৭০ সালের ১৮ জুলাই তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন। এম এ আজিজ সহ অন্যান্য নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে ১৯৭০ সালের ২৭ জুলাই “আজিজ দিবস” পালন করা হয়। এম এ আজিজ ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্যাপক বিজয় নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং তাঁর এই দূরদর্শী উপলব্ধি থেকে তিনি ১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পুনরায় উচ্চারণ করলেন “ জনগণের প্রদত্ত রায় নস্যাৎ করার চক্রানত্ম রম্নখতে এখন আমাদের এক দফার আন্দোলন শুরম্ন করতে হবে”। রাজনীতির এই ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার বক্তব্য বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহেরই সাড়্গ্য বহন করে। ১৯৭০ সালের ১৫ মে চট্টগ্রামের পলোগ্রান্ডের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর উপসি’তিতে এম এ আজিজের দেশ বিভাগ ও এক দফার আন্দোলন শুরম্ন করার আশাজাগানিয়া বক্তব্য আর বঙ্গবন্ধুর দেওয়া রেসকোর্স এর ৭ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা বক্তব্য কাকতালীয়ভাবে তাঁদের গোপন পরামর্শের সার্থক বহিঃপ্রকাশই বলা যায়। উক্ত বিবেচনায় এম এ আজিজ বঙ্গবন্ধুর যোগ্য ভাবশিষ্য। শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু অভিধায় অভিষিক্ত, চট্টলার এ জনপদে এম এ আজিজ চট্টল শার্দুল বিশেষণে বিশেষিত ।
মূলত নীতি-আদর্শ, প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক মননশীলতা, দেশপ্রেম, নিঃস্বার্থপরতা, দেশমাতৃকার প্রতি চরম ও পরম দায়বদ্ধতায় বঙ্গবন্ধুর মত এম এ আজিজও রাজনীতির এক বিশাল মহীরূহ। এম এ আজিজের মত ত্যাগী ও নির্লোভ নেতৃত্বের গুণে আওয়ামী লীগ নামের সংগঠনটি এখনো জনপ্রিয়। আওয়ামী লীগের উলেস্নখযোগ্য স’ানে এম এ আজিজের মত শোভন ও আনত্মরিক মানুষেরা আসীন থাকলে জাতি বিজয় গৌরবে দীপ্ত হবে, এটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। এ মহান নেতার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।