বাঙালির ভাষা সংগ্রাম : পৃথিবীর সকল মানুষের মাতৃভাষার অধিকারের স্মারক নাম

নাজিমুদ্দীন শ্যামল
P-1-Shamall-Vai

বাঙালির ওপর শোষণ নিপীড়নের ইতিহাস হাজার বছরের। আর বাঙালির মুক্তির লড়াইয়ের ইতিহাসও সহস্রাধিক বছরের। এই জাতি লড়তে লড়তে সংহত হয়েছে। যুদ্ধ করতে করতে একতাবদ্ধ হয়েছে। প্রতিারোধ করতে করতে বিদ্রোহী হয়েছে। আর তারই ধারাবাহিকতায় আমরা পেয়েছি ১৯৫২ সাল। বাঙালির অজস্র সংগ্রামের যুথ সংহতির বিস্ফোরণ ছিলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন।
বাংলা ভাষার এই আন্দোলন শুধুমাত্র যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সফলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো তা কিন’ নয়। বরং এই আন্দোলন এতদাঞ্চলের গণমানুষের মুখের ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, রাজনীতি সর্বোপরি জাতীয়তাবোধের সংহত বীজের অংকুরোদগম ছিলো।
যে বাঙালি এই ভূখণ্ডের মানুষ হিসাবে শোষণের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য লড়ছিলো, সেই বাঙালি যে ভাষা-সংস্কৃতি, পোশাক, পেশা আর আচার আচরণের পটভূমিতে একটি একক জাতিতে পরিণত হয়েছিলো বাংলা ভাষার আন্দোলনে ১৯৫২ সালে তা শুধু প্রমাণিতই হয়নি। বরং এতদাঞ্চলের মানুষ জাতি হিসাবে একক ও সুদৃঢ় হয়েছিলো। ফলত সংহত জাতীয়তাবোধ ও সংস্কৃতির সুস্পষ্ট চেতনা বাঙালিকে ধাপে ধাপে স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো।
১৯৫৪’ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬০ সালের ঘূর্ণিঝড়, ১৯৬২ সালের ঁ ২য় পৃষ্ঠার ১ম কলাম
শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং তৎপরে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ ইত্যাকার সকল ঐতিহাসিক প্রবাহসার পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, বাঙালি মাথা নোয়াবার জাতি নয়। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি তাঁর স্বরাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জন করেছিলো। অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় পর্যন্ত জাতি হিসাবে বাঙালির আত্মপরিচয় পৃথিবীতে ঘোষণা দেয়া হয়ে গেছে। সেই ক্ষেত্রে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে বাঙালির জাতিগত জন্মের নতুন অধ্যায় হিসাবেও বিবেচনা করা যেতে পারে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি অর্জনে সীমাবদ্ধ ছিলো না। এই আন্দোলন সারা পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছে বাঙালি মায়ের ভাষার জন্য জীবন দিতে পারে। বাঙালি মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষাকে সম্মান করে। সারা পৃথিবীর মানুষকে বাংলার ভাষা আন্দোলন শিখিয়েছে কীভাবে মাকে সম্মান করতে হয়, মায়ের ভাষা ও ভূমিকে মুক্ত করতে হয়। বাঙালি শুধু নিজের মাকে নয় পৃথিবীর সকল মাকে সম্মান করে। পৃথিবীর সকল মাতৃভাষাকে সম্মান করে। পৃথিবীর সকল মাতৃভূমির স্বকীয়তায় বিশ্বাস করে। এই দর্শন সারা পৃথিবীর মানুষকে শিখিয়েছে আমাদের ভাষার আন্দোলন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উপমাহদেশের মানুষের ধরন অনেকটা মাদার অর্কিটাইপ। বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটক বলেছেন, উপমহাদেশের সকল মানুষের মধ্যে মাতৃতান্ত্রিকতা থাকলে বাঙালি সর্বাপেক্ষা বেশি মাদার আর্কিটাইপ। দার্শনিক কার্ল গুস্তাফ ইয়ুং মনে করতেন মাদার আর্কিটাইপ মানুষ বা জনগোষ্ঠী সর্বাপেক্ষা আবেগী ও স্বাপ্নিক হয়। এই সব তত্ত্ব বাঙালির ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে একাডেমিকালিও প্রমাণিত হয়েছে। বাঙালিই এখন সারা পৃথিবীতে ‘মাদার আর্কিটাইপ ফিলোসফির, একক আকড়, যারা শুধু মাকে পূজা ও ভক্তিই করে না, মায়ের ভাষা, ভূমি থেকে সম্মানসহ সব কিছুর জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে পারে।
আর এখনতো বাঙালির এই দর্শন, ভাষার আন্দোলন চেতনা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই দিবসে সারা দুনিয়ার সকল মানুষ মায়ের ভাষাকে সম্মান জানায়, মাকে সম্মান জানায়। অর্থাৎ বাংলার এই মানবিক দর্শন এখন দুনিয়াজুড়ে বিস্তৃত হয়ে গেছে।
পাখিরা পাখির ভাষায় কথা বলে, অন্য প্রাণিরা সকলে তাদের ভাষায়। মানুষেরা কথা বলে মায়ের মুখের ভাষায়। এটাই জীব জগতের ভাষা, সকলের অধিকার। আর এই অধিকার পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছে বাঙালির ভাষার আন্দোলন। রফিক, শফিক, জব্বার সালামের রক্ত আর নাম না জানা লক্ষ ভাষাসৈনিকের সাহসী সংগ্রাম। এই ভাষার মাসে সকল শহীদ আর ভাষা সৈনিকদের অযুত লাল সালাম।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক