বাঘাইছড়ি থমথমে

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঙামাটি

দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কের ৯ কিলোমিটার এলাকায় গত সোমবার সন্ধ্যায় সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে হতাহতের ঘটনায় পুরো এলাকাজুড়ে থমথমে পরিসি’তি বিরাজ করছে। ঘটনাস’লের আশপাশের পাহাড়ি অধ্যুষিত গ্রামগুলোর কোনো বাড়িতে লোকজন দেখা যায়নি। আকস্মিক এমন ঘটনায় থমকে গেছে পুরো জনপদ। পাহাড়ে প্রায়ই আঞ্চলিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি হামলায় রক্তপাত হলেও সরকারি কাজে নিয়োজিতদের ওপর এমন হামলার ঘটনা ঘটলো বহুদিন পর।
গতকাল মঙ্গলবার দিনভর আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস’ল পরিদর্শন করেন। একই দিন দুপুরে নিহতদের লাশ ময়না তদন্তের জন্য খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস’া জোরদার করা হয়েছে। ঘটনার সময় আনসারের একটি রাইফেল খোয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বাঘাইছড়ি থানার ওসি (তদন্ত) জাহাঙ্গীর আলম। পুলিশ ধারণা করছে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চলন্ত গাড়ি থেকে রাইফেলটি পড়ে যায়। পাহাড়ের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথবাহিনীর কম্বিং অপারেশন অচিরেই শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ির রিজিয়ন কমান্ডার।
সরেজমিনে ঘটনাস’ল পরিদর্শন শেষে চট্টগ্রাম পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ বিভাগ) মোহাম্মদ আবুল ফয়েজ জানান, নৃশংস এ ঘটনা খুবই বেদনাদায়ক। জড়িত সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে ক্লু পাওয়া গেছে। মামলার প্রস’তি চলছে। তিনি জানান, আহতদের মধ্যে ৫জন পুলিশ সদস্য রয়েছে, তাদের চারজনই গুলিবিদ্ধ।
ঘটনাস’লে দুপুরে সাংবাদিকদের খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুল হক জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন যারা আগে কেন্দ্র দখল করে জোরপূর্বক ভোট নিতে পারতো, কিন’ এবার আইনশৃংখলা বাহিনীর কঠোর সতর্কতার কারণে তা পারেনি। সে কারণে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে নির্বাচনের দিন দুপুরে হুমকি প্রদান করে। হুমকিদাতারাই এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে। ধারণাা করা হচ্ছে জেএসএস (সন’) এবং ইউপিডিএফ (প্রসিত) এ ঘটনার সাথে জড়িত। ইতোমধ্যে ঘটনাস’লের আশপাশে
আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের আটকসহ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কম্বিং অপারেশন শুরু হচ্ছে বলেও জানান রিজিয়ন কমান্ডার।
সরেজমিনে ঘটনাস’লে গিয়ে দেখা যায়, পাকা সড়কজুড়ে ছোপ-ছোপ রক্তের দাগ। সড়কের পাশে পড়ে আছে তাজা গুলি এবং গুলির খোসা। ধারণা করা হচ্ছে, খুব কাছ থেকে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা গাড়ি লক্ষ করে ব্রাশফায়ার করেছে। ঘটনাস’লের দুপাশে মাত্র ৮/১০ গজের ব্যবধানে দুটি চা দোকান। তবে গতকাল সেই দোকান দুটিসহ আশপাশের সব বাড়িঘর বন্ধ পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং অবস’াদৃষ্টে পুলিশ ধারণা করছে, আক্রান্ত গাড়িবহরের ওপর শতাধিক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করা হয়েছে।
হামলার শিকার গাড়িবহরে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী এবং পুলিশ জানায়, বহরে ছিল চারটি গাড়ি। তার মধ্যে প্রথম গাড়িটি নির্বাচন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় থাকা বিজিবি’র। বাকি তিনটি গাড়িতে ছিল পুলিশ, আনসার, ভিডিপি এবং নির্বাচনী কর্মকর্তা প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং এবং পুলিং অফিসার। এ তিনটি গাড়িই চান্দের গাড়ি নামে পরিচিত জিপ। বহরের তৃতীয় গাড়ি ঘটনাস’ল পার হওয়ার সময় খুব কাছ থেকে জিপের পিছনে সড়কের দুপাশ থেকে ব্রাশফায়ার করা হয়। বেশি গুলি লেগেছে তৃতীয় গাড়িতে এবং চতুর্থ গাড়ির লোকও গুলিবিদ্ধ হয়।
বহরের দ্বিতীয় গাড়িতে ছিলেন কাচালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল ইসলাম। তিনি বাঘাইহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করে ফিরছিলেন। নুরুল ইসলাম জানান, হঠাৎ করেই পিছন দিকে গুলির শব্দ শুনতে পান। তখন চালককে গাড়ি সাইড করে থামাতে বলেন। কিন’ পিছনের গাড়িটি দ্রুত তাদের পার হয়ে সামনের দিকে যাওয়ার ইশারা দেয়। এ অবস’ায় দ্রুত ঘটনাস’ল ত্যাগ করে গন্তব্যের দিকে আগাতে থাকেন। বিজিবি ক্যাম্পের সামনে গিয়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেখতে পান, তাদের পিছনের গাড়ির ভিতরে গুলিবিদ্ধ লোকজন কাতরাচ্ছে। এ অবস’ায় আবার দ্রুত ছুটে যাওয়া হয় বাঘাইছড়ি উপজেলা সদর হাসপাতালে।
আক্রান্ত বহরের তৃতীয় গাড়ির চালক মো. আল আমিন (২৮) জানান, গাড়িতে গুলি করা হচ্ছে টের পেয়ে তিনি গাড়িটি আরো দ্রুত চালাতে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ির ভিতরে থাকা লোকজনের আর্তনাদ শুনতে পান। সামনের সিটে চালকের আসনের পাশে বসা ছিলেন একজন প্রিজাইডিং অফিসার এবং একজন পুলিশের এসআই। তারা দুজনই বলতে থাকেন তাদের গায়ে গুলি লেগেছে এবং প্রিজাইডিং অফিসার তার মাথায় গুলি লেগেছে বলেই চালকের ওপর হেলে পড়েন। এ অবস’ায় গাড়ি থামালে সমস্যা আরো বেশি হবে ভেবে নিজের মনোবল নিয়ে তিনি গাড়ি চালিয়ে দ্রুত ঘটনাস’ল ত্যাগ করেন।
গতকাল ঘটনাস’ল পরিদর্শন করেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ, পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন, ৫৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আল হাকিম মো. নৌশাদ, ২৭ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মাহবুবুল ইসলামসহ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণ। তারা সেখানে স’ানীয়দের সাথে জরুরি সভা করেন এবং সবপক্ষের কথা শোনেন। জেলা প্রশাসক এ সময় তাৎক্ষণিকভাবে নিহত সবার পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে এবং আহতদের ১০ হাজার টাকা করে দেন। এ সময় তিনি নিহতদের পরিবারের চাকরিসক্ষম কাউকে চাকরি দেয়া এবং সন্তানদের পড়াশুনার ব্যবস’া করার আশ্বাস প্রদান করেন।
জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, আমরা ঘটনাস’ল পরিদর্শন করেছি এবং সেখানকার মানুষের সাথে কথা বলেছি। সবার দাবি একটাই, অপরাধীদের ছাড় দেয়া যাবে না। আমরাও তাদের কথা দিয়েছি, যৌথ অভিযানের মাধ্যমে অপরাধীদের অবশ্যই ধরা হবে। আমরা তাদের অনুরোধ করেছি, এই ঘটনাকে পুঁজি করে কেউ যেনো সাম্প্রদায়িক উস্কানি বা পরিসি’তি ঘোলাটে করতে না পারে। সে ব্যাপারে সহযোগিতা করতে।