বাইশে শ্রাবণ-অন্য চোখে

সাগর চৌধুরী

শান্তিনিকেতনে ‘আশ্রম’ নামে চিহ্নিত এলাকাটির ভেতরে অবস্থিত ‘ছাতিমতলার’ কথা সকলেই জানেন। এটাও সম্ভবত জানেন যে এই প্রাচীন বৃক্ষটির ছায়ায় বসেই একদা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আশ্রম স্থাপনের কথা চিন্তা করেছিলেন বলে কথিত আছে। ছাতিমতলার চারপাশের বেষ্টনির গায়ে একটা ফটকের মাথায় উৎকীর্ণ আছে এই কথাগুলো: “তিনি আমার প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি”। কথাগুলো অবশ্য ‘পরম ব্রহ্ম’কে উদ্দেশ্য করেই নিবেদিত, তবে কালান্তরে দেবেন্দ্রনাথের চতুর্দশ সন্তানই হয়ে উঠেছেন আপামর বাঙালি জাতির “প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি”।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিবস ২৫শে বৈশাখ আমাদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ তাৎপর্যবাহী একটি উপলক্ষ। ব্যক্তিগতভাবে আমরা যে যেমন করে পারি ঐ দিন তাঁকে স্মরণ করি তাঁর রচিত গান গেয়ে, কবিতা পাঠ করে, নাটক অভিনয় করে, কিংবা হয়তো তাঁর জীবনদর্শন নিয়ে আলোচনা করে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রবীন্দ্র জন্মোৎসব উদ্‌যাপন অনেক সময় করা হয় মহা সমারোহে, কখনো বা মাত্রাতিরিক্ত আড়ম্বর ও অতি-নাটকীয়তার সঙ্গে, ‘হাজার কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত’ যার একটি দৃষ্টান্ত। তবে সে যাই হোক, তাঁর জন্মদিবস পালন তো আসলে আমাদের জীবনের এক পরম প্রাপ্তির জন্য অন্তরের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, পরিপূর্ণতালাভের তৃপ্তির বাহ্যিক প্রকাশ, ধরে নিতে পারি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। অতএব হোক না সমারোহ, থাক না আড়ম্বর, নাটকীয়তা, ক্ষতি কী? যদিও আজকের যুগের সব কিছুরই মতো রবীন্দ্রনাথেরও বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা অবশ্যই পরিতাপের বিষয়।
পক্ষান্তরে, রবীন্দ্রনাথের তিরোধান দিবস ২২শে শ্রাবণ সম্পর্কে আমাদের আবেগ বা অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ অনেক স্তিমিত। তেমনটাই তো হওয়া উচিত, কারণ এটি হলো স্মৃতিতর্পণের দিন, যা আমাদের অস্তিত্বকে সমৃদ্ধ করেছে তাকে অন্তরে উপলব্ধি করার উপলক্ষ। সাধারণভাবে বলা হয় যে সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিলে কোন কিছু হারানোর বেদনার তীব্রতা হ্রাস পায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে আমরা কি হারিয়েছি? তিনি তো প্রতি পলেই আছেন আমাদের সঙ্গে, আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস, হৃদ্‌স্পন্দনের সঙ্গে। ১৪২৪ সনে তাঁর ৭৬তম প্রয়াণ দিবসেও তিনি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তাই ঘটা করে বা প্রকাশ্যে এই দিবসটিকে উদ্‌যাপন করার দরকার বোধহয় নেই, আমাদের প্রাণপুরুষকে নিভৃতে স্মরণ করাই যথেষ্ট।
তবে একটা-দুটো ঘটনায় আমার নিজের মনে মাঝেমধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, বাঙালির মানসিকতায় কি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এমন কোন বোধ আছে, যাকে হয়তো বর্ণনা করা যায় একমাত্র ইংরেজি ঙনংবংংরড়হ শব্দটির দ্বারা? যেমন ধরুন, প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে, ১৯৬০ সালে, বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেনের তৈরি একটি ছায়াছবির নাম ‘বাইশে শ্রাবণ’। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে এক মধ্যবয়স্ক ট্রেনের ফেরিওয়ালা আর তার ষোড়শী বধূর মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষাদমধুর কাহিনী। বাইশে শ্রাবণ এই অসমবয়সী দম্পতির বিবাহের তারিখ, কিন্তু কেন ‘বাইশে শ্রাবণ’? শুনেছি ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর কেউ একজন পরিচালককে এই প্রশ্নটা করলে মৃণাল সেন নাকি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘একজন মহাপুরুষের মৃত্যুর তারিখ বাইশে শ্রাবণ বলেই সেটা কারো বিয়ের বা অন্য কিছুর তারিখ হতে পারবে না, এমন তো কোন কথা নেই!’ জানি না সত্যিই তিনি একথা বলেছিলেন কিনা, আমি কেবল এমনটা শুনেছি, তবে বলে থাকতেও পারেন। আসল প্রশ্ন কিন্তু এটা নয়, প্রশ্ন হলো, মৃণালবাবু তো বাইশের বদলে পনেরোই শ্রাবণ বা বিশে আষাঢ় বা ষোলোই ফাল্গুন যে কোন একটা তারিখ, বস্তুত হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে মলমাস বলে চিহ্নিত যেসব মাসে বিবাহ নিষিদ্ধ সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য যে কোন মাসের তারিখ বাছতে পারতেন, অথচ বাইশে শ্রাবণ তারিখটিই যে বাছলেন তিনি সেটা কি এক ধরনের সচেতন নাটকীয় প্রণোদনার কারণে, নাকি এই তারিখটি তাঁর বাঙালি চেতনাকে আবিষ্ট করে রেখেছিলো রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের তারিখ হওয়ার ফলে?
অনুরূপ আরেকটি দৃষ্টান্ত। মৃণাল সেনের উপরোক্ত ছবিটির কিঞ্চিদধিক পাঁচ দশক পরে, ২০১১ সালে, পরিচালক সুজিত মুখোপাধ্যায় একটি ছবি তৈরি করেন যার নামও ‘বাইশে শ্রাবণ’। একটি আদ্যন্ত থ্রিলার-ধর্মী ছবি, তথাকথিত ‘কমার্শিয়াল’ বা বাণিজ্যিক চরিত্রের। ছবির কাহিনীতে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ বাইশে শ্রাবণ, যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় নানা নাটকীয় রোমাঞ্চকর ঘটনা। এখানেও প্রশ্ন, কেন ‘বাইশে শ্রাবণ’? বাইশে ভাদ্র হতে পারতো, চৈত্র, মাঘ, আশ্বিন যা খুশি হতে পারতো, এজন্য ছবির কাহিনীতে কোন হেরফের হতো না। অথচ ‘বাইশে শ্রাবণ’! এটাও কি ঐ অপ্রতিরোধ্য ঙনংবংংরড়হ, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্বাচন?