বাংলাভাষা ও রবীন্দ্রনাথ

হোসাইন আনোয়ার

১৯৫২ থেকে ২০১৭। ৬৫ বছর। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলনের গৌরবের ৬৫ বছর পালন করছি আমরা। মাতৃভাষার আন্দোলনে এদেশের সূর্যসন্তান সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার বুকের তাজা রক্ত ঢেলে সৃষ্টি করেছেন এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। একমাত্র বাঙালি ছাড়া পৃথিবীর অন্যকোনো জাতি তার মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে, এমন ইতিহাস আমাদের জানা নেই।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ হয়তো প্রথম উপলব্ধি করেছেন, ‘মাতৃভাষা’ শব্দটি আমরা ইংরেজি ‘মাদার টাঙ্গ’ থেকে অনুবাদ করে পেয়েছি। অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে মাদার টাঙ্গ এর তিনটি অর্থ দেয়া আছে। দেশি ভাষা, প্রকৃতির ভাষা এবং মূলভাষা। উক্ত ডিকশনারি থেকে আমরা জানতে পারি, শব্দটি প্রথম ব্যবহার হয় ওয়াইক্লিকের রচনায়। কিন’ না ভাষাতত্ত্ববিদ ইভান ইলিচের মতে, মধ্যযুগে ফ্রান্সের লোবেন প্রদেশে গর্জ এর মঠের সন্ন্যাসীরা মাতৃভাষা শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। মার্টিন লুথার যখন বাইবেলের তরজমা করলেন জার্মান ভাষায়, তখন মাতৃভাষা শব্দটি এক নতুন ভাষাবোধ, মমত্ব ও আনুগত্যের জন্ম দিল। পবিত্র কোরআনের সুরা ইব্রাহীম এর ৪র্থ আয়াতে আল্লাহ তালা স্পষ্ট করেই বলেছেন, আমি কোনো রাসুল পাঠাইনি, নিজ গোত্রীয় ভাষা ছাড়া।
আমাদের মাতৃভাষা বিদেশ থেকে আমদানি করা কোনো ভাষা নয়। শুধু ভূখণ্ড নয়, নৃতত্ত্ব জাতিতত্ত্বের মতো ভাষাতত্ত্বের অনেক সম্পদ আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছি। সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় দেশের ভূমিজ সন্তানদের জীবনরস মন’ন করেই এ ভাষার জন্ম। যা জাতির নিরলস চর্চা ও অনুশীলনের মাধ্যমে বিকশিত ও প্রসারিত হয়ে বর্তমান অবস’ায় উন্নীত হয়েছে।
কোনো কোনো পণ্ডিতের ধারণা, বাংলা ভাষা সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে। কিন’ প্রকৃত তথ্য হচ্ছে আঞ্চলিক প্রাকৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষার জন্ম। প্রাকৃতজনের ভাষা অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাই হচ্ছে প্রাকৃতভাষা। এই অর্থে গৌড় অঞ্চলের গৌড়ীর প্রাকৃত বাংলা ভাষার ‘জননী’। তাই আমাদের আজকের মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা সমগ্র জাতির শত সহস্র বছরের সংগ্রাম ও সাধনার ফসল।
আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস অনেক প্রাচীন ইতিহাস। ১৭৫৭ সালের ২ জুলাই মীর জাফরের পুত্র মীরনের আদেশে মোহাম্মদী বেগ নাম একজন ঘাতককে দিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে সর্বত্র তারা ইংরেজি ভাষার প্রচলন করে। তখন থেকেই স্কুল কলেজগুলোতেও বাংলা ছিল নিষিদ্ধভাষা। রাজভাষা ছিল তখন ইংরেজি। ১৯১০ সাল পর্যন্ত প্রবেশিকা পরীক্ষায় বাংলা ভাষার ব্যবহার ছিল নিষিদ্ধ। কাউকেই বাংলা ভাষায় পরীক্ষা দিতে দেওয়া হেতা না। কেউ বাংলা ভাষায় পরীক্ষা দিত না।
রবীন্দ্রনাথের জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘মনে আছে আমাদের স্কুলে আমাদের উপরের ক্লাসে একটি ছেলে বাংলায় পরীক্ষা দিবার জন্য প্রস’ত হয়। এই সংবাদ পাইয়া আমাদের ক্লাসে কি হাস্য। সে ছেলেটি যেন অদ্ভুত কিছু করিয়াছে। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্র জীবনী ও রবীন্দ্র সাহিত্য প্রকাশক (৪র্থ খণ্ড)।
১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন বঙ্গ প্রদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী আজিজুল হক সাহেবের উৎসাহ ও প্রেরণায় সপ্তাহব্যাপী এক শিক্ষা উৎসবের আয়োজন করা হয়। সেই উৎসবে রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষার মাধ্যমে সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রচারিত হোক এই মর্মে এক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন তাঁর ভাষণে। তিনি তখন আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংঘ এর ভারতীয় শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তৎকালীন প্রাদেশিক সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় রবীন্দ্রনাথের সেই প্রস্তাব অনুমোদন বা গ্রহণ করেনি। উৎসবের শেষ দিনে রবীন্দ্রনাথ একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। এই প্রবন্ধে তিনি শিক্ষার সকল স্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের জোর দাবি জানান। তিনি বলেন, বাংলাভাষার দোহাই দিয়ে যে শিক্ষার আলোচনা বারম্বার দেশের সামনে এনেছি, তার মুলে আছে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। জীবন স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, বাহির হইতে দেখিলে আমাদের পরিবারে অনেক বিদেশি প্রথার প্রচলন ছিল। স্বদেশের প্রতি পিতার যে একটি আন্তরিক শ্রদ্ধা তাঁহার জীবনের সকল প্রকার বিপ্লবের মধ্যেও অক্ষুণ্ন ছিল, তাহাই আমাদের পরিবারস’ সকলের মধ্যে একটি প্রবল স্বদেশপ্রেম সঞ্চার করিয়া রাখিয়াছিল। তখন শিক্ষিত লোকে দেশের ভাষা এবং দেশের ভাব উভয় কেই দূরে ঠেকাইয়া রাখিয়া ছিলেন। আমাদের বাড়িতে দাদারা চিরকাল মাতৃভাষার চর্চা করিয়া আসিয়াছেন। আমার পিতাকে তাঁহার কোনো নতুন আত্মীয় ইংরেজিতে পত্র লিখিয়াছিলেন, সে পত্র লেখকের নিকট তখন ফিরিয়া আসিয়াছিল। পিতার এই দুই দৃষ্টান্ত মনে রেখে তিনি (১৯০৭ সালে) ১৩১৩ (বাংলা) ফাল্গুনে আহুত সাহিত্য সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘বেদনা’ সম্বন্ধে সংজ্ঞা না থাকা যেমন রোগের চরম অবস’া, তেমনি যখন হীনতার লক্ষণগুলো সম্বন্ধে আমাদের চেতনাই থাকে না, তখনই বুঝতে হবে দুর্গতিপ্রাপ্ত জাতির এই লজ্জাহীনতাই চরম লজ্জার বিষয়। আমাদের দেশের এই একান্ত অসারতার প্রমাণ সর্বদাই দেখতে পাই। বাঙালি হইয়া বাঙালিকে, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজনকে ইংরেজিতে পত্র লেখা যে কত বড় লাঞ্ছনা, তাহা আমরা অনুভব মাত্র করি না।
এটা রবীন্দ্রনাথের মনের কথা। তাই সাতাশ বছর পরেও ১৩৩০ (বাংলা) সালে উত্তর ভারতীয় বঙ্গ সাহিত্যের কাশী সম্মেলনেও তিনি তাঁর ওই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি বলেন, বাস্তবিক মাতৃভাষার প্রতি যদি সম্মানবোধ জন্মে থাকে, তবে স্বদেশি আত্মীয়কে ইংরেজি ভাষায় পত্র লেখার মতো কুকীর্তি কেউ করতে পারে না।
সারা জীবন ধরে রবীন্দ্রনাথ দেশি-বিদেশি নানা ভাষায় চর্চা করে গেছেন। বিলাতে ল্যাটিন এবং ইংরেজি পড়েছেন। মূল ভাষায় গ্যাটের স্বাধ পাওয়ার জন্য তিনি জার্মান ভাষাও শেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভাষা সম্পর্কিত বিবিন্ন প্রবন্ধের পাতা উল্টালেই দেখা যাবে বাংলাদেশের চতুষ্পার্শ্বস্ত অঞ্চলে আঞ্চলিক ও উপভাষার সাথে তাঁর পরিচয় কত নিবিড় ছিল। তাঁর প্রাথকমিক শিক্ষা মাতৃভাষার বুনিয়াদের উপর গড়ে উঠেছিল বলেই ভাষা হতে ভাষান্তরে সঞ্চারণ করা রবীন্দ্রনাথের পক্ষে কত সহজ ও আনন্দময় হয়ে উঠেছিল। জীবন স্মৃতিতে তিনি বলেছেন, ছেলেবেলায় বাংলায় পড়িতেছিলাম বলিয়াই সমস্ত মনটা চালনা সম্ভব হয়েছিল। শিক্ষা জিনিসটা যথাসম্ভব আহার ব্যাপারের মতো হওয়া উচিত। খাদ্যদ্রব্যে প্রথম কামড়টা দিবামাত্রই তাহার স্বাধের ‘সুখ’ আরম্ভ হয়। পেট ভরিবার পূর্ব হইতেই পেটটি খুশি হইয়া জাগিয়া ওঠে। তাহাতে তাহার জারক রসগুলোর আলস্য দূর হইয়া যায়। বাঙালির পক্ষে ইংরেজি শিক্ষায় এটি হইবার জো নাই। তাহার প্রথম কামড়েই দুই পাটির দাঁত আগাগোড়া নড়িয়া ওঠে মুখবিবরের মধ্যে একটা ছোটখাটো ভূমিকম্পের অবতারণা হয়। তারপর সেটাতে লোষ্ট্র জাতীয় পদার্থ বহে। সেটা যে রসে পাক করা মোদক বস’, তাহা বুঝিতে বুঝিতেই বয়স অর্ধেক পার হইয়া যায়। জানা বানানে ব্যাকরণের বিষয় লাগিয়ে নাক চোখ দিয়া যখন অজস্র জলধারা বহিয়া যাইতেছে, অন্তরটা তখন একেবারেই উপবাসী হইয়া আছে। অবশেসে বহুকষ্টে অনেক দেরিতে খাবারের সঙ্গে যখন পরিচয় ঘটে, তখন ক্ষুধাই যায় মরিয়া। প্রথম হইতেই মনটাকে চালান করিবার সুযোগ না পাইলে মানের চলৎশক্তিতেই মন্দা পড়িয়া যায়। তখন চারিদিকে খুব কষিয়া ইংরেজি পড়াইবার ধুম পড়িয়া গিয়াছে। তখন যিনি সাহস করিয়া আমাদিগকে দীর্ঘকাল বাংলা শিখাইবার ব্যবস’া করিয়াছিলেন, সেই আমার স্বর্গগত মেঝ দাদার উদ্দেশে সকৃতজ্ঞ প্রণাম নিবেদন করিতেছি।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেজ দাদা হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা কোনো দিন ভুলতে পারে নি। তাই আবার স্মরণ করে বলেছেন, ছেলেবেলায় মেজ দাদা বলতেন, আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তার পরে ইংরেজি শেখার পত্তন।
১৩২৮ (বাংলা) সালের ফাল্গুনে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন তার ইংরেজি লেখা না লেখার কথা। “পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত ইংরেজি লিখিনি। ইংরেজি যে ভালো করে জানি তা ধারণা ছিল না। মাতৃভাষাই তখন আমার সম্বল ছিল। যখন ইংরেজি লিখতাম তখন, অর্জিত বা আর কাউকে দিয়ে লিখিয়েছি। আমি তের বছর পর্যন্ত স্কুলে পড়েছি। তারপর থেকে পলাতক ছাত্র। পঞ্চাশ বছর বয়সের সময় আমি আমার লেখার অনুবাদ করতে প্রবৃত্ত হলাম। তখন গীতাঞ্জলি গানে আমার মনে ভাবের একটা উদবোধন হয়েছিল বলে সেই গানগুলোই অনুবাদ করলাম। সেই অনুবাদের বই আমার পশ্চিম মহাদেশ যাত্রার যথার্থ পাথেয় স্বরূপ হলো। দৈবক্রমে আমার দেশের হাইরেকার পৃথিবীতে আমার স’ান হলো। ইচ্ছে করে নয়। এই সম্মানের সঙ্গে আমার দায়িত্ব বেড়ে গেল।” গীতাঞ্জলি ও অন্যান্য কাব্যগ্রন’ থেকে চয়ন করে রবীন্দ্রনাথ যে ইংরেজি গীতাঞ্জলি প্রকাশ করেন, তার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে প্রচুর সমালোচনা তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে।
১৯২৪ সালে তিনি যখন চীন সফরে যান, ঘটনাক্রমে প্রাচীন ইম্পেরিয়াল প্যালেসে প্রাক্তন সম্রাট পিএনআই-এর সাথে সাক্ষাৎকার, কুং ফুং সি পন’ী শানমির গভর্ণর ণবহ ঝযর ঝযধহ এর নিমন্ত্রণ গ্রহণ, বিলাসবহুল হোটেলে রাত্রিবাস, বিদেশি ক্লাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান, বিদেশ ফটোগ্রাফারদের ঘোরা-ফেরা, ইংরেজি ভাষা-ভাষী ও খ্রিষ্টান চৈনিকদের সাথে দহরম মহরম ইত্যাদি নানা কারণে চীনের তরুণেরা রবীন্দ্রনাথকে সাম্রাজ্যবাদের দালাল ও অতীত ভারতের ফসিল হিসেবে চিহ্নিত করে। ঁি পযরয যঁর প্রশ্ন তোলেন, এ কেমন ঠাকুর যে, তাঁর শত্রুর ভাষায় ইংরেজিতে এত ভালো লিখলেন। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এক ভদ্রলোকের দেওয়া পুরস্কার পাওয়ার জন্য? মাতৃভাষার সপক্ষে রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন ধরে যে সংগ্রাম করে গেছেন, তার খবর এই চীনা তরুণ বন্ধুদের জানার কথা নয়।
১৩০১ সালের ২৫ চৈত্র, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বাৎসরিক সভায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বাংলা জাতীয় সাহিত্য’ পাঠ করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একটি নাতিদীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে তিনি ঘোষণা করেন, দেশীয় ভাষা ও সাহিত্যের অবলম্বন ব্যতীত দেশে কোনো হিতকর্ম সম্পাদন করা সম্ভব নয়।
১৩০৫ সালে ভারতীয় বৈশাখ সংখ্যায় ‘ভাষা বিচ্ছেদ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট ভাষায় লিখলেন, ইংরেজি ভাষা কোনো উপায়েই আমাদের সাধারণ ভাষা হইতে পারে না। কারণ তাহা অত্যন্ত উৎকট বিদেশি। মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস রেখে তিনি বললেন, যদি প্রাকৃতিক নির্বাচনে স্বাধীন হস্ত থাকে, তবে বাংলা ভাষার পরাভবের কোনো আশঙ্কা নাই। আপন সাহিত্যের মধ্যে বাংলা যে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে, তাহাতেই তার অমরতা সূচনা করে।
১৩০৫ (বাংলা) সালের আশ্বিনে অপর পক্ষের কথা’র রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘ইংরেজের প্রভাব আমাদের দেশে এতটাই প্রবল হইয়াছে যে, তাহা সকল প্রভাবকে ছাড়াইয়া উঠিয়াছে। দেশের লোকজনকে আমরা গণ্য জ্ঞান করি না। দেশের লোকের কাছে প্রশংসা পাওয়ার কোনো স্বাদ নাই… ইংরেজি শিক্ষিত এবং ইংরেজিতে অশিক্ষিত লোকের মধ্যে যে কেবল শিক্ষার তারতম্য তাহা নহে, শিক্ষায় শ্রেণিভেদ বর্তমান। পরম্পরের বিশ্বাস, সংস্কার, রুচি এবং চিন্তা করিবার প্রণালী ভিন্ন রকমের হইয়া যায়। এবং ইংরেজি শিক্ষিত ব্যক্তি আপনাদিগকেই শিক্ষিত ও শ্রেষ্ঠ এবং অপর সাধারণকে অশিক্ষিত এবং পশ্চাদবর্তী না মনে করিয়া থাকিতে পারে না। … আমরা মাছ ধরিতে চাই, কিন’ জলের সহিত সংস্রব রাখিতে চাই না। আমরা দেশের হিত করিব, কিন’ দেশকে আমরা স্পর্শ করিব না। দেশকে কেমন করিয়া স্পর্শ করিতে হয়? দেশের ভাষা বলিয়া, দেশের বস্ত্র পরিয়া। ইংরেজের প্রবল আদর্শ যদি মাতার ভাষা, ভ্রাতার বস্ত্র হইতে আসাদিগকে দূরে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইয়া যায়, তবে জননায়কের পদ গ্রহণ করিতে যাওয়া নিতান্তই অসংগত।
১৩১২ সালের আশ্বিনে ‘অবস’া ও ব্যবস’া’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের স্বাধীন বিকাশের কথা উল্লেখ করে বলেন বিদেশি শাসনকালে বাংলাদেশের যদি এমন কোনো জিনিসের সৃষ্টি হইয়া থাকে, যাহা লইয়া বাঙালি যথার্থ গৌরব করিতে পারে, তাহা বাংলা সাহিত্য। তাহার একটা প্রধান কারণ বাংলা সাহিত্য সরকারের নেমক খায় নাই। পূর্বে অনেক বাংলা বই সরকার তিন খানি করিয়া কিনিতেন। শুনিতে পাই এখন মূল্য দেওয়া বন্ধ করিয়া দিয়াছেন। গভর্নমেন্টের উপাধি-পুরস্কার-প্রসাদের প্রলোভন বাংলা সাহিত্যের মধ্যে প্রবেশ করিতে পারে নাই বলিয়াই, এই সাহিত্য বাঙালির স্বাধীন আনন্দ উৎস হইতে উৎসারিত বলিয়াই, আমরা এই সাহিত্যের মধ্য হইতে এমন বল পাইতেছি। হয়তো গণনায় বাংলা ভাষায় উচ্চশ্রেণির গ্রন’সংখ্যা অধিক না হইতে পারে, হয়তো বিষয়বৈচিত্র্যে এ সাহিত্য অন্যান্য সম্পদশালী সাহিত্যের সহিত তুলনীয় নহে, কিন’ তবু ইহাকে আমরা বর্তমান অসম্পূর্ণতা অতিক্রম করিয়া বড় করিয়া দেখিতে চাই কারণ, ইহা আমাদের নিজের শক্তি হইতে, নিজের অন্তরের মধ্য হইতে উদ্ভূত হইতেছে। এ ক্ষীণ হউক, দীন হউক, এ রাজার প্রশ্রয়ের প্রত্যাশী নহে-আমাদেরই প্রাণ ইহাকে প্রাণ জোগাইতেছে। অপর পক্ষে, আমাদের স্কুল বইগুলোর প্রতি ন্যূনাধিক পরিমাণে অনেকদিন হইতেই সরকারের গুরু হস্তের ভার পড়িয়াছে। এই রাজপ্রাসাদের প্রভাবে এই বইগুলির কি রূপ শ্রী বাহির হইতেছে তাহা কাহারও আগোচরে নাই।’
১৩১৩ সালের ফাল্গুনে শিল্প প্রদর্শনী উপলক্ষে যে সাহিত্য সম্মেলন হয় সেখানে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘আমরা বিদেশি ভাষায় পরের দরবারে এত কাল যে ভিক্ষা কুড়াইলাম, তাহাতে লাভের অপেক্ষা লাঞ্ছনার বোঝাই জমিল, আর দেশি ভাষায় স্বদেশি হৃদয় দরবারে যেমনি হাত পাতিলাম অমনি মুহূর্তের মধ্যেই মাতা যে আমাদের মুঠো ভরিয়া দিলেন।
১৩২২ সালের ২৪ অগ্রহায়ণ কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শিক্ষার বাহন’ প্রবন্ধটি পাঠ করেন। সেখানে তিনি মাতৃভাষার পক্ষে কয়েকটি প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘মাতৃভাষা বাংলা বলিয়াই কি বাঙালিকে দণ্ড দিতেই হইবে? এই অজ্ঞানকৃত অপরাধের জন্য সে চিরকালই অজ্ঞানই হইয়া থাক, সমস্ত বাঙালির প্রতি কয়েকজন শিক্ষিত বাঙালির এই রায়ই কি বহাল রহিল? যে বেচারা বাংলা বলে সেই কি আধুনিক মনুসংহিতার শূদ্র? তার কানে উচ্চ শিক্ষার মন্ত্র চলিবে না?
বলা বাহুল্য ইংরেজি আমাদের শেখা চাইই। শুধু পেটের জন্য নয়। কেবল ইংরেজি কেন, ফরাসি, জর্মন শিখিলে আরও ভালো। সেই সঙ্গে একথাও বলা বাহুল্য অধিকাংশ বাঙালি ইংরেজি শিখিবে না। সেই লক্ষ লক্ষ বাংলা ভাষীদের জন্য বিদ্যায় অনশন কিম্বা অর্ধানশনই ব্যবস’া, এ কথা কোন মুখে বলা যায়?
বিদ্যাবিস্তারে মাতৃভাষার সপক্ষে রবীন্দ্রনাথ কলম ধরেন ১২৯০ সালে তাঁর ‘ন্যাশনাল ফন্ড’ প্রবন্ধে। তিনি এ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, বঙ্গ বিদ্যালয়ে দেশ ছাইয়া সেই শিক্ষা বাংলায় ব্যাপ্তা হইয়া পড়-ক। ইংরেজি শিক্ষা কখনোই সর্বত্র ছড়াইতে পারিবে না। তার নয় বছর পর রচিত হয় ‘শিক্ষার ওরফের’। এই প্রবন্ধে ঝাঁজ আঁচ করিতে পারে না এখনকার ছেলেমেয়েরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষমান পর্যন্ত ইচ্ছা করিলে বাংলায় লেখাপড়া করিতে পারে। তখনকার স্কুলের নাম থেকে বুঝতে পারা যাবে, সেদিন শিক্ষা ব্যবস’ায় উৎস কেন্দ্র ছিল কোথায়। স্বাভাবিক কারণেই রাজ ভাষায়। যে ইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হতো তার নাম ছিল মিডল ইংলিশ স্কুল, তার উপরে ছিল হাই ইংলিশ স্কুল। উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়।
‘শিক্ষার ওরফের’ এর মূল বক্তব্য সে দিন শিক্ষিত বঙ্গবাসী সমাজে তেমন কোন সমর্থন পায়নি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি শিক্ষকরাই এর বিরোধিতা করেছিলেন। আর সেই বিরোধিতার সামনে বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্যার গুরু দাশ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দ মোহন বসু প্রমুখ বাঙালি ব্যক্তিগণ রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের সঙ্গে ঐক্যমত পোষণ করেও ছিলেন নিম্নকণ্ঠ ও নিরূপায়। কোনো প্রতিবাদী কণ্ঠ তাদের ছিল না।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে বাংলা ভাষার যোগ্যস’ান নির্দিষ্ট হয় এবং এন্ট্রেন্স ও এফ-এ পরীক্ষায় ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে বাংলার মাধ্যমে যেন শিক্ষা দেওয়া হয়। তারজন্য ১৩০১ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ স্যার গুরু দাশ বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও অন্যান্যদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করার জন্য নিবেদন করেন যেন, এনট্রেন্স পরীক্ষায় ইতিহাস, ভূগোল ও অংকশাস্ত্রের উত্তর সিনেট কর্তৃক স্বীকৃত যে কোনো প্রচলিত ভাষায় দেওয়া যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই প্রস্তাব বিবেচনার অযোগ্য মনে করে কোনো আমল দেন নাই। অবশ্য কয়েক বছর পর ১৩১০ সালে এনট্রেন্স পরীক্ষায় পাঠ্য হিসেবে বাংলা স্বীকৃতি লাভ করে। তারই দু বছর পর রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পান। বাংলার কবি নোবেল পুরস্কার পেলেও শিক্ষা ব্যবস’ায় বাঙলার হীনবস্তা ঘুচল না। ‘শিক্ষার বাহনে’ রবীন্দ্রনাথ বললেন, বিদ্যা বিস্তারে ‘বাংলা’র বাধা এখানে মস্ত বেশি।
১৯১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার কমিশনের সভাপতি স্যার মাইকেল ম্যাওলার ও অন্যান্য সদস্যগণ শান্তি নিকেতন পরিদর্শন করে মাতৃভাষার প্রতি রবীন্দ্রনাথের আজীবন লড়াইয়ের স্বীকৃতি প্রদান করা হয় এই ভাবে- ‘ওঃ রং ঝরৎ, জধনরহফৎধহধঃযং পড়হারপঃরড়হ ঃযধঃ, ডযরষব ঊহমষরংয ঝযড়ঁষফ নব ংশরষভঁষষু ধহফ ঃযড়ৎড়ঁমযষু ঃধঁমযঃ ধং ধ ংবপড়হফ ষধহমঁধমব, ঃযব পযরবভ সবফরঁস ড়ভ রহংঃৎঁপঃরড়হ রহ ংপযড়ড়ষং (ধহফ বাবহ রহ পড়ষষবমবং ঁঢ় ঃড় ঃযব ংঃধমব ড়ভ ঃযব টহরাবৎংরঃু ফবমৎবব) ংযড়ঁষফ নব ঃযব সড়ঃযবৎ ঃড়হমঁব ….. ঐব যড়ষফং ঞযধঃ ঃযব বংংবহঃরধষ ঞযরহমং রহ ঃযব পঁষঃঁৎব ড়ভ ঃযব ডবংঃ ঝযড়ঁষফ নব পড়হাবুবফ ঃড় ঃযব যিড়ষব ইবহমধষর ঢ়বড়ঢ়ষব নু সবহং ড়ভ ধ রিফবষু ফরভভঁংবফ বফঁপধঃরড়হ, নঁঃ ঞযধঃ ঃযরং পধহ ড়হষু নব ফড়হব ঃযৎড়ঁময ধ রিফবৎ ঁংব ড়ভ ঃযব াধৎহধপঁষধৎ রহ ঃযব ঝপযড়ড়ষ.’ (ঈধষপঁঃঃধ টহরাবৎংরঃু ঈড়সসরংংরড়হ ১৯১৭-১৯, ঠড়ষ-১, চ-২২৬-২২৮.)