বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার হ্যাকিং : সর্ষেতেই ভূত

শঙ্কর প্রসাদ দে

এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী ৫ ফেব্রুয়ারি’১৬, শুক্রবার (৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২.৩০) ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ব্যাংক ঢাকা থেকে ৩৫ টি পেমেন্ট নোটিশ যায়। ৫টি তে অর্থের পরিমাণ ছিল ১০১ মিলিয়ন ডলার। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের শুরুতেই সন্দেহ হয়। তারা ত্বড়িৎ মেসেজ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কনফার্মেশন চায়। একে তো ১২ ঘণ্টার সময়ের ব্যবধান। তার উপর ছিল শুক্রবার।
৬ তারিখ ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ঢাকা থেকে মেসেজের কোন উত্তর না পাওয়ায় স্বাভাবিক ব্যাংককিং নিয়মে তারা ৩০টি স্থগিত করে ৫ টি পেমেন্ট নোটিশ অনার করে। শ্রীলংকার একটি অ্যাকাউন্টে ২ কোটি ডলার আর ফিলিপাইনের ১টি অ্যাকাউন্টে ৮ কোটি ১মিলিয়ন ডলার স্থানান্তর করে।
এই অসম্ভব কাণ্ডটা ঘটেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট কোড (আন্তঃ ব্যাংকিং লেনদেনে ব্যবহার্য গোপনীয় নাম্বার) ব্যবহার করে ট্রান্সফার বা পেমেন্ট মেসেজ এর মাধ্যমে। রবিবার ৭ ফেব্রুয়ারি ঘটনাটি তাদের নজরে আসে। কিন্তু সরকার ও দেশবাসীর কাছে গভর্নর ও ব্যাংক কর্মকর্তারা বিষয়টি গোপন রাখলেন। ফিলিপাইনের ডেইলি ইনকোয়েরার ২৯ ফেব্রুয়ারি সংবাদটি প্রকাশ করলে গোটা দেশে সত্যিই ভূমিকম্পের কম্পন শুরু হল।
গভর্নর সাহেব ১৫ মার্চ পদত্যাগ করলেন নৈতিক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। প্রশ্ন হলো, তিনি স্বেচ্ছায় করেছেন নাকি সরকারের কঠোর মনোভাবের কারণে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন? আমরা মনে করি সরকারের কঠোর মনোভাব বুঝতে পেরে তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন। নৈতিকতার বিষয়টি গণ্য করলে ৬ ফেব্রুয়ারি ঘটনা জেনে যাওয়ায় দু’এক দিনের মধ্যে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত ছিল। তিনি তা করেননি। এবার আরো কথা এসে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট কোড দেখাশুনার বিষয়টি কি কারণে শুক্র ও শনিবার বন্ধ ছিল? সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও এদেশের বহু প্রতিষ্ঠানে বন্ধের দিনে কিছু জরুরি সেবা বা বিভাগ খোলা রাখতে হয়। আদালতে যদি বন্ধের দিন একজন ম্যাজিস্ট্রেট বসতে পারেন অথবা শনিবার যদি সুপ্রিম কোর্টের এফিডেভিট সেকশন খোলা থাকতে পারে তবে গভর্নর সাহেব আইটি সেকশনটি শুক্র ও শনিবার দেখভালের জন্য কাউকে দায়িত্ব দিয়ে রাখেননি কেন?
প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক কি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংককে জানিয়ে রাখেনি যে শুক্র শনি এদেশে সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তাই ঢাকা থেকে কোন ধরনের মেসেজ বা ইনভয়েজ বা পেমেন্ট নোটিশ যাবে না। ফেডারেল ব্যাংক ও কি জানে না যে শুক্রবার সংশ্লিষ্ট সময়ে বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটি। আগে থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ছুটির দিনের বিষয়টি জানিয়ে না রাখা নিঃসন্দেহে ব্যর্থতার পর্যায়ে পড়ে। তাছাড়া এতো বড় অঙ্ক ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে শুধু সুইফটের মাধ্যমে পেমেন্ট এর বাইরে লিখিত চিঠি ছাড়া টাকা ট্রান্সফার হবে না মর্মে কেন বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়নি সেটিও ব্যর্থতার পর্যায়ে পড়ে।
জানা গেছে ৪ তারিখ যখন হ্যাকিং চলছিল তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ল্যাপটপ, প্রিন্টার ইত্যাদি অকেজো ছিল। এটা প্রশ্ন উঠেছে যে অফিস বন্ধ না থাকার কারণে কেউ আইটি সেকশনে না থেকে থাকে তবে কম্পিউটার ও অনলাইন অকেজো থাকার বিষয়টি কর্মকর্তারা জানলেন কি করে? এ রকম আরো বহু প্রশ্ন নিকট ভবিষ্যতে উত্থাপিত হবে। এদেশের অতীত ইতিহাস বলে প্রায় সময় বহু প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় না যদি বড়সড় জালিয়াতিগুলোর সাথে হোমরা চোমরারা জড়িত থাকে।
টকশোতে আইটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হ্যাকিং এর বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের বাইরে থেকেও হতে পারে। আমরা এই কথার উপর খুব বেশি আস্থা রাখতে চাই না। জালিয়াতদের হাত বহুদূর, সংশ্লিষ্ট সময়ে আইটি সেকশনে অচলাবস্থা থাকার অর্থ জালিয়াতরা বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরেও আছে। ব্যাংকের অভ্যন্তরের কারো সাথে হ্যাকারদের যোগাযোগ আছে বলে অনেকের ধারণা। এটার পক্ষে একটা জোরালো যুক্তি হলো, সুইফট কোড নাম্বার পুরোপুরি একজন অফিসারের হাতে থাকে না। ২/৩ ডিজিট করে একাধিক কর্মকর্তার হাতে নাম্বারগুলো রক্ষিত থাকে। সবার ডিজিটগুলো এক করে অপারেটর সুইফট কোর্ড পোস্ট করে।
সুতরাং যারাই যখন কোড ব্যবহার করেছে তাদের সুইফটকোড নাম্বার জানা আছে। কোড নাম্বার জানে এমন লোকদের কারো কাছ থেকে হ্যাকাররা তা সংগ্রহ করার সুযোগ আছে। অর্থাৎ হ্যাকারদের সাথে অপারেটরদের কেউ না কেউ জড়িত থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তকর্তারা বিষয়টি একমাস চেপে গেলেন। এটি রীতিমতো ঔদ্ধত্যের পর্যায়ে পড়ে। তাহলে বুঝা যাচ্ছে উর্ধ্বতন সব কর্মকর্তাই ঘটনা চাপা দিতে চেয়েছেন। প্রশ্ন হলো, তাদের নিয়মিত বৈঠকে একজনও কি প্রশ্ন তোলেননি যে জাতি ও সরকারের কাছে এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে ঘটনা গোপন রাখা ঠিক হচ্ছে না।
এজাতির দুর্ভাগ্যের পাল্লা যেন শেষ হবার নয়। একজন কর্মকর্তা ও বিষয়টি জনসমক্ষে বলার সাহস দেখালেন না। এতে সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। কর্মকর্তারা নিশ্চিৎ ছিলেন, ঘটনা ধামাচাপা দেয়া যাবে। তারা অংশিক সফলও হয়েছেন। শ্রীলংকার টাকাগুলো আটকানো গেছে। কিন্তু ফিলিপাইনের টাকাগুলো ঠিকই হ্যাকাররা তুলে ফেলেছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রিয়পাত্র ছিলেন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। ১৩ মার্চ দিল্লী থেকে কনফারেন্স শেষে তিনি দেশে ফিরেছেন। এটাও গোটা জাতিকে বিস্মিত করেছে যে, এত বড় দুর্ঘটনা মাথায় নিয়ে গভর্নর কেমন করে কনফারেন্সে যোগ দেয়ার মানসিকতায় ছিলেন। তাঁর রাতের ঘুম হারাম হয়নি। ব্যাংকের কোন উর্ধ্বতন কর্মকর্তারই রাতের ঘুম হারাম হয়নি। সবাই নাকে তেল দিয়ে ঘুমোতে পারার মধ্যে রহস্য লুকিয়ে আছে। এই রহস্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও নাড়া দিয়েছে।
১৩ মার্চ সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ না দেয়ায় আতিউর বুঝে গিয়েছিলেন, তাঁর সময় শেষ। বড্ড কষ্ট লাগে, শেখ হাসিনা অনেককে আস্থায় রেখেছিলেন। তাঁদের অনেকেই তাঁর আস্থার মর্যাদা রাখেননি। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আস্থা রাখতে পারেননি। কালো বিড়ালকে তিনি ঘরে ঢুকতে দিয়েছিলেন। রোকন উদ্দীন মাহমুদকে তিনি আকাশে তুলেছিলেন। দুর্ভাগ্য, উর্দিওয়ালাদের ভয়ে তাঁর মামলার ফাইল মি. মাহমুদ ফেরৎ দিয়েছিলেন।
বহির্বিশ্বের সাথে বিচ্ছিন্নতার ফল এবার গুনতে হচ্ছে গোটা জাতিকে। প্রায় গোটা দুনিয়ায় রোববার সাপ্তাহিক ছুটি অথচ আমাদের সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হয় শুক্রবার থেকে। এতে করে সপ্তাহে তিনদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে রইলাম বহির্বিশ্ব থেকে। বলে রাখা ভাল, সাপ্তাহিক ছুটি ২ দিন করার যুক্তি ছিল বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের। এখন আর সে সমস্যা নেই। তাই পুরো বিষয়টি পুনর্বার মূল্যায়নের সময় এসেছে। প্রাথমিকভাবে শনিবার বিকেল বেলা ও রবিবার পুরোদিন সাপ্তাহিক ছুটির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভাববার সময় এসেছে। যে কোন জাতীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থই গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
আশঙ্কা করি, তদন্তে পরিপূর্ণ সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে কিনা। এ দেশের আরেকটি ট্র্যাজেডির উপাখ্যান যেন তৈরি না হয়। হলমার্ক কেলেংকারীর মূল হোতারা ধীরে ধীরে পর্দার অন্তরালে চলে যাচ্ছে। এ রকম আরো বহু ঘটনা ঘটছে যার বেশির ভাগই জনসমক্ষে আসছে না। ধীরে ধীরে ডলার চুরির এই রাঘববোয়ালরাও যে তদবিরের আড়ালে অথবা আইনের ফাঁক দিয়ে পর্দার আড়ালে চলে যাবে – তার কসুর কম হবে না।
এদেশে বিত্তবানদের আইনের আওতায় আনা যায় না। তবে যদি সত্যি সত্যি প্রতীয়মান হয় যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও এতে জড়িত তবে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের কথাই কয়েক হাজার বছর পর পুনপ্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি বলেছিলেন ‘লোভের কোন আরোগ্য নেই’।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট

আপনার মন্তব্য লিখুন