ছবির শহর

বস্টনে শিল্পকলার সমারোহ

ইফতেখারুল ইসলাম
Pic-02

একদিকে ফেনওয়ে পার্ক কাছেই নর্থ-ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি। আশেপাশে বেশ কয়েকটি বিখ্যাত হাসপাতাল। ক্যান্সার, হৃদরোগ আর অন্যান্য জটিল বিষয়ে পৃথিবী-বিখ্যাত কয়েকটি গবেষণা-প্রতিষ্ঠান। সেগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে পৌঁছাতে হয় বস্টন মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টসের প্রধান দরজায়। সেখান থেকে শুরু করে টিকেট কেনার ঘর, প্রদর্শনীর প্রবেশপথ, বড় বড় হলঘর, সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটাই যেন উৎসবমুখর। এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় নেই। কিন্তু এর উঁচু হলঘরে রাখা হলুদ-সবুজ কাচের তৈরি বিশাল আইসিকেল টাওয়ারটি যেন শিল্পকলার উৎসবে আমন্ত্রণ জানায় সবাইকে। স্বাগত জানায় বিশালতার দিকে।
ডেল চিহুলি নামের সমকালীন আমেরিকান শিল্পীর হাতে ২০১১ সালে তৈরি এই কাচের টাওয়ার বিয়াল্লিশ ফুটেরও বেশি উঁচু। সুতরাং আমাদের দেখা ঘর-বাড়িগুলোর পাঁচতলার চেয়েও উঁচু একটা হলঘর প্রয়োজন হয়েছে এটিকে প্রদর্শনের জন্য। কাচের কারুকাজে অসামান্য খ্যাতিমান এই শিল্পী বাদামি কাচের শিল্পচর্চাকে আমূল বদলে ফেলেছেন কাজের গুণমান দিয়ে আর বিশালাকৃতির ভাস্কর্য তৈরির মাধ্যমে।
বস্টন এমএফএ-র শিল্পকলার প্রদর্শনী এত বড় যে এর প্রধান বিষয় আর নির্দিষ্ট বিভাগের তালিকা দেখে স্থির করে নিতে হয় আমি কী দেখতে চাই। বিশেষ কোনো শিল্পীর ছবি, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল, কোনো মহাদেশ, বিশেষ কালপর্ব অথবা কোনো বিখ্যাত বিষয়ের বিভাগ ্ত প্রত্যেকটি এত আকর্ষণীয় যে কোনটা ছেড়ে কোনটাতে বেশি সময় দেবো সেটা স্থির করাই কঠিন হয়ে ওঠে।
এখানকার ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকলার সংগ্রহটি খুবই উল্লেখযোগ্য।ইমপ্রেশনিজম এন্ড বিয়ন্ড এই নামে সাজানো একটি বড় গ্যালারি। আবার ক্লদ মোনের নাম একটি আলাদা গ্যালারিও রয়েছে। যে-কোনো মিউজিয়ামে কোনো বিশেষ ধরনের ছবির সংগ্রহ পূর্ণ করে তোলা এবং তা সাজানোর সময় একটা বিষয়ে অনেক গুরুত্ব দিতে হয়। সেটা হলো, সেই সংগ্রহ দেখে ওই শিল্প-আন্দোলন ও তার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের অবদান সম্পর্কে একটা পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায় কি-না।ঠিকভাবে চেনা যায় কি-না চিত্রকলার কোনো নির্দিষ্ট কালপরিধির বৈশিষ্ট্য এবং যুগ পরিবর্তনের কোণ-মোড়-বাঁকগুলো। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে বস্টন এমএফএ-র ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকলার সংগ্রহটি সার্থক। ইউরোপীয় ও বিশ্ব-চিত্রকলার সেই যুগান্তর অথবা পালাবদলের বিশেষ দিক এবং চিহ্নগুলো বস্টন এমএফএ-র সংগ্রহ দেখে ঠিকভাবে সনাক্ত করা যায়।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীরা চিত্রকলার ক্ষেত্রে একটা পালাবদল ঘটিয়েছিলেন। তাঁদের সময়কালে সারা পৃথিবীর মানুষ সমাজজীবনে কতগুলো পরিবর্তন দেখেছে। দেখেছে নগরসমূহের মধ্যে শিল্পায়নের অনুপ্রবেশ, প্রভাব ও বিকাশ। সে-যুগের মানুষ কৃষির প্রাধান্য ও সামন্তযুগের অবসান প্রত্যক্ষ করেছে।মধ্যবিত্ত অথবা শ্রমজীবি যে-কোনো শ্রেণীর ভিতর থেকে নাগরিক জীবনের আনন্দ-উদ্বেলতায় যারা অংশ নিয়েছে তারা সকলেই ওই উনবিংশ শতাব্দীতে অবলোকন করেছে আধুনিক জগত ও জীবনের জন্ম।সফল উত্থান ও সংগ্রাম-চিহ্নিত ওই যুগের মধ্য দিয়ে যারা অগ্রসর হয়েছে তারা সবাই নিজেদেরকে আর একবার ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের আঁকা দৃশ্যপট ও প্রকৃতির ভিতরে প্রতিফলিত দেখতে পেয়ে আনন্দিত হয়েছে। তখনও তাদের মনে এমন কোনো প্রশ্ন উঁকি দেয়নি যে এই সব ছবি কোনো নতুন চিত্র-বিপ্লবের প্রতিনিধিত্ব করে কি-না।প্রকৃতপক্ষে তা নিশ্চিতভাবেই ছিল চিত্রকলার ক্ষেত্রে একটা নতুন বিপ্লবের সূচনা।
জনপ্রিয় ধারণা এই যে ইমপ্রেশনিজম একটি নতুন শিল্পরীতি।আলো-ছায়ার বিষয়ে একটি নতুন পন্থা। অথবা সেজানের ভাষায় ফর্মের জ্যামিতিক ভাংচুর-বিষয়ে গভীর চিন্তা-প্রসূত ফলাফল। এখন মাঝে মাঝে প্রশ্ন তোলা হয় এটা আসলেই কোনো গভীর চিন্তা-প্রসূত শিল্প-আন্দোলন কি-না। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল চিত্রকলায় নতুন বিষয়ের নির্বাচন। চেনা পৃথিবীর পুনর্নির্মাণ, এবং একটি যুগসত্যকে কোনো বিশেষ জোর বা প্রবণতার প্রভাব ছাড়াই ধারণ ও চিত্রায়ন করা। অথবা শুধু ইতিহাস ও একটি পৃথিবীকে সরলতম অনুপুঙ্খের মাধ্যমে অবলোকন ও ধারণ করা। আলোছায়ার গতিবিভঙ্গে তুলির ছোট ছোট টান দিয়ে ধারণ করা অপসৃয়মাণ সময়ের ছবি।
ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীরা শৈল্পিক সম্পর্কের একটি নতুন ও নিরীক্ষাধর্মী রীতি উদ্ভাবন করলেন। তাঁদের সময়ের দৈনন্দিন জীবন থেকে আহরণ করা পরিচিত সব উপাদানকে শিল্পে স্থান দিয়েছেন তাঁরা। এভাবে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রচলিত পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, এবং অলংকার- শোভিত চিত্রকলারীতি থেকে তাঁরা নিশ্চিতভাবে বেরিয়ে এলেন। অন্যভাবে বলতে গেলে ইউরোপীয় রেনেসাঁ-পরবর্তী শিল্পকলা যেভাবে অগ্রসর হচ্ছিলো তার মৌলিক রীতি-পদ্ধতিকেই সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য ও বর্জন করলেন তাঁরা। এমনকি ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বের পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্য ছাড়াও তাঁদের নিজ নিজ কাজের মধ্য দিয়ে শিল্পকলা হয়ে উঠলো দৃঢ়ভাবে প্রাতিস্বিক ও ব্যক্তিতাবাদী। এভাবেই তাঁরা প্রত্যেকে নিজস্ব পন্থা, স্বতন্ত্র বিকাশ এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নির্মাণেও সচেষ্ট ছিলেন। ইতোমধ্যেই সেকালের শিল্পের সামাজিক পটভূমি ও পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। তাই এটা মোটেই বিস্ময়কর ছিল না যে খ্যাতি যখন এই শিল্পীদের কাছে শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে তাঁরা তখন ধীরে ধীরে তাঁদের সাময়িক গোষ্ঠিবদ্ধতা থেকে সরে এসেছেন। এই গোষ্ঠিবদ্ধতায় তাঁরা সক্রিয়ভাবে শামিল ছিলেন প্রকৃতপক্ষে নিজেদের স্বতন্ত্র নির্জন পথের অনুসন্ধান ও সাধনার জন্যই।
বস্টন এমএফএ-তে সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে ক্লদ মোনের ছবির সংগ্রহটি বড়। খড়ের স্তুপ, পদ্মপুকুর, কাঠের সাঁকো এরকম বিখ্যাত সব ছবি নিয়ে একটি আলাদা গ্যালারি। এর পাশাপাশি ইমপ্রেশনিজম-এর উত্থান ও পালাবদলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অন্য সব শিল্পীর ছবি স্থান পেয়েছে। আছে এদুয়ার মানে, পিয়ের-অগুস্ত রেনোয়া, পল সেজান, পল গগ্যা ও ভ্যান গগের ছবি।আছে এডগার দেগার ছোট্ট একটি ভাস্কর্য।তাঁর অতি বিখ্যাত নাচের মেয়েদের ছবি ও ভাস্কর্য, মেয়েটির পা-বাড়ানোর ভঙ্গি আর মুখের আদলটি দূর থেকে দেখেই চেনা যায়। এ বিষয়ে আগেই লেখা হয়েছে।
পল গগ্যার এমন একটি ছবি এখানে আছে যা দেখার জন্য দিতে হয় অনেকখানি সময় আর মনোযোগ। “আমরা কোথা থেকে এসেছি, কোথায় আছি আর কোথায় চলেছি” এ-রকম দীর্ঘ শিরোনাম-যুক্ত ছবিটি সম্পর্কে আলাদাভাবে লেখা উচিত।
এ ছাড়া গগ্যার ছোট-বড় কয়েকটি বিখ্যাত ছবি আর উডকাট এখানে আছে। আছে পল সেজানের আঁকা ‘লাল চেয়ারে বসা’ তাঁর স্ত্রীর ছবি। আর আছে অসাধারণ কয়েকটি স্থিরজীবন। এগুলোকে পল সেজানের বিখ্যাত ছবির মধ্যেই গণ্য করা হয়। কিন্তু এখানে এমন কয়েকটি নিসর্গচিত্র আছে যা আগে কখনো দেখিনি। বিশেষ করে ১৮৮১ সালের দিকে ক্যানভাসে তেলরঙে আঁকা টার্ন ইন দ্য রোড নামের দৃশ্যটি নানা কারণে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই ছবি আর পল সেজানের বিখ্যাত স্টিল লাইফ নিয়েও আলাদা করে লিখতে হবে।