জব্বারের বলীখেলা কাল

বসেছে বাহারি পণ্যের মেলা

আজিজুল কদির

মেলা মানেই লোকাচারের প্রতিচ্ছবি। এপার-ওপার বাংলার সবক’টি লোকজ মেলাতেই বাঙালি এবং তার জীবনধারার চিত্র ভেসে ওঠে। আর বৈশাখ মাসে লোক উৎসবের ক্ষেত্রে নগর চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় আয়োজন হল লালদীঘি মাঠের ঐতিহাসিক আবদুল জব্বারের বলীখেলা। এই বলীখেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য স্বয়ংসম্পূর্ণ লোকজ মেলার। কথিত আছে, সবকিছুই পাওয়া সম্ভব এ মেলায়। বলীখেলা শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা তাদের পসরা নিয়ে হাজির হন লালদীঘি মাঠে।
গতকাল মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেল, দোকানিরা গ্রামীণ ঐতিহ্যের জিনিসপত্র নিয়ে হাজির হয়েছে। সড়কের দুপাশে চৌকি বসিয়ে বা বাঁশের খুঁটি লাগিয়ে নিজ নিজ দোকান তৈরিতে ব্যস্ত তারা। কোতোয়ালির মোড় থেকে লালদীঘির পাড়ের চারদিকে বিভিন্ন নিত্যপণ্য ছড়িয়ে আছে। কেউ এসেছেন পটুয়াখালী থেকে মাটির তৈরি তৈজসপত্র নিয়ে; কেউ এসেছেন কুমিল্লা থেকে দা-ছুরি ও বঁটি নিয়ে। কেউবা এসেছেন গাজীপুর, বগুড়া, কক্সবাজার, ফেনী, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে। দোকানিরা লোকজ ঘরসাজানোর বাহারি পণ্য নিয়ে এসেছে মেলায়।
মাটির টব বিক্রেতা আইয়ুব আলী বলেন, গত ৩০ বছর ধরে জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলায় আসছি। এই মেলায় বিক্রিও খুব ভালো হয়। বয়স হয়েছে। আগামীতে মনে হয় আর আসতে পারব না। তাই সন্তানদের উৎসাহ দিচ্ছি।
ঢাকার হাইকোর্টের সামনে থেকে এসেছেন শফি মণ্ডল মাটির তৈরি টব নিয়ে। শো-পিস এবং টেরাকোটার সামগ্রী নিয়ে এসেছেন বিল্লাল। এসব দোকানে ৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের মৃৎশিল্প রয়েছে।
শীতলপাটি ও হাতপাখা নিয়ে সিলেট থেকে এসেছেন মো. বাবর। তিনি বলেন, বৈশাখে থাকে তীব্র গরম। তাই প্রতি বছর এ মেলায় অনেক পাটি ও হাতপাখা বিক্রি হয়। এবারও সেই আশায় এসেছি।
বলা যায়, মৃৎশিল্পের ফুলদানি, ছাইদানি, টেবিল বা ড্রয়িংরুমে আলোকসজ্জার ছাউনিসহ নানা ধরনের তৈজসপত্র স’ান পেয়েছে এ মেলায়। মনের মাধুরি মেশানো রঙে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে মৃৎশিল্পের গড়ন। চোখ ধাঁধাঁনো নানা আইটেম দেখে আগেভাগে আসা ক্রেতাদের মাঝে গভীর আগ্রহ যেমন প্রকাশ পাচ্ছে তেমনি মেলা শুরুর আগেই বিক্রির অর্ডার দিচ্ছে নগরীর বিভিন্ন শপিং মলে থাকা দোকানিরা। এছাড়াও গৃহসজ্জার জন্য ছুটে আসছে তরুণী ও গৃহিণীরা।
শেষ মূহূর্তে লালদিঘী মাঠে মঞ্চের কাজ তদারকি করতে দেখা গেল মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি ও চসিক কাউন্সিলর জওহরলাল হাজারীকে। তার সাথে দেখা হতেই প্রস’তি নিয়ে বলেন, বলীখেলার মঞ্চ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে । আর বলীখেলার জন্য এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক বলী নাম নিবন্ধন করেছেন। তবে তেরোবার চ্যাম্পিয়ন দিদার বলীর মতো পেশাদার বলী আমরা এখনো পাইনি। ভবিষ্যতে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ব্যবসায়ী সাহাবুদ্দিনের পৃষ্ঠপোষকতায় বছরের অন্যসময়ে গ্রামগঞ্জ থেকে বলীদের এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস’া করা হবে। সেরকম একটা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মেলা শেষ করে আমরা এটা শুরু করব।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে প্রচলিত বলীখেলার প্রবর্তক ছিলেন আব্দুল জব্বার সওদাগর। তাঁর নামানুসারে একে জব্বারের বলীখেলা বলা হয়। আবদুল জব্বার ছিলেন নগরীর বদরপাতি এলাকার প্রভাবশালী সমাজসেবক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে দেশের যুবসমাজকে সংগঠিত, প্রেরণা দেওয়া এবং সংগ্রামী করে গড়ে তোলার লক্ষে এটির প্রবর্তন করেন তিনি। বাংলা ১৩১৫ সনের ১২ বৈশাখ আবদুল জব্বারের বলীখেলার প্রথম আসর বসে। নগরীর লালদীঘি মাঠে প্রতি বছরের ১২ বৈশাখ এ খেলা অনুষ্ঠিত হয়।
ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলার ১০৯তম আসর বসতে যাচ্ছে আজ থেকে। এ খেলাকে কেন্দ্র করে আজ সোমবার লালদীঘি মাঠে শুরু হয়েছে মেলা। যা বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় লোকজ উৎসব হিসেবে বিদেশের মাটিতেও পরিচিত পেয়েছে এরই মধ্যে। আর তাই আয়োজকেরা ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলা ও মেলাকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে স’ান দেয়ার জন্য এর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন। এবার তাই আয়োজকেরা আশা করছেন, ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ টিম সশরীরে এসে এর পরিধি ও বাস্তবতা অনুধাবন করে স্বীকৃতি প্রদান করবেন।