বসিত্মবাসী তথা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা ভাবতে হবে

রায়হান আহমেদ তপাদার

দারিদ্র্য বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিকৃষ্টতম উদাহরণ। গ্রামে হোক আর শহরে হোক; দারিদ্র্য বেদনাদায়ক এবং তা কাম্য নয়। গ্রামের তুলনায় শহরে হতদরিদ্রের সংখ্যা বেশি। দুই কারণে হতদরিদ্র মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসে। প্রথমত, শহরে কাজ পাওয়া যায় ও মজুরি বেশি। অন্যদিকে গ্রামে কাজের অভাব এবং নদীভাঙনসহ দুর্যোগ। মূলত হতদরিদ্রদের শহরে আসাকে নিরম্নৎসাহিত করতে শহরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ কম রাখা হয়। উলেস্নখ্য যে

৫০ হাজার মানুষের সম্পদ সারাদেশের মানুষের সমান হয়ে গেছে। এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; সারাবিশ্বের সমস্যা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এ রকম কয়েকজনের হাতে সম্পদ সীমাবদ্ধ। এছাড়া বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী দেখা যায়, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ কমছে। নারীদের বিশাল একটা অংশ এখনও শ্রমশক্তির বাইরে। বেকারত্বের মধ্যে আছে। কাজ খুঁজতে খুজতে তারা হাল ছেড়ে দিচ্ছে। অদড়্গতা, মানসম্মত শিড়্গার অভাবে বঞ্চিত এবং পরিবহন সমস্যার কারণে নারীরা কর্মসংস’ানের সুযোগ হারাচ্ছে। বিগত ১০ বছরে দারিদ্র্যের হার কমেছে। তবে শহরে তুলনামূলক দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ দেশের বেশিরভাগ সম্পদের মালিক। এটা স্পষ্ট- বছরের পর বছর কোনো সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এরা সম্পদের অধিকারী হয়নি।

বাংলাদেশের সকল বসিত্মর মোটামুটি একই রকম চেহারা। সরম্ন ঢোকার পথ, অসংখ্য অলি-গলি, অন্ধকার খুপরি, নোংরা গোসলখানা ও টয়লেট, এখানে সেখানে জমে আছে আবর্জনা। কোনরকমে একটা খাট বসালেই ঘরের জায়গা শেষ। এরই মধ্যে অর্ধ নগ্ন শিশুরাও অনেক। গত ৩০ বছর ধরে বসিত্মতে বসবাস করছেন এমন লোকও কম নয়। তারা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন এই দীর্ঘ দিনে বহুবার বসিত্ম ভেঙে দিতে দেখেছেন। কিন’ প্রতিবারই ঘুরে ফিরে আবার একই এলাকায় গজিয়ে গেছে নতুন বসিত্ম।

বেশিরভাগ ড়্গেত্রেই সরকারি কোন জমির উপরে স’ানীয় প্রভাবশালীরা জায়গা দখল করে ঘর তুলে সেগুলো ভাড়া দিয়ে থাকেন। বসিত্ম ভাইঙ্গা দিছে। এসব বসিত্মতে মূলত যারা বাস করেন তারা পেশায় বেশিরভাগই পোশাক কর্মী, গৃহকর্মী, দিনমজুর, রিকশা চালক অথবা কেউ হয়ত কোন খুচরা ব্যবসার সাথে জড়িত।

দারিদ্র্য বিমোচনে মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করে তার স’ায়ী সমাধান করতে হবে। তা না হলে আপাতদৃষ্টিতে দারিদ্র্য বিমোচন হবে অনেকটা কসমেটিক সার্জারির মতো। এ ধরনের দারিদ্র্য বিমোচন কখনোই টেকসই হবে না। তবে একসময়ের খাদ্যঘাটতির দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ খাদ্যে স্বাবলম্বী হয়েছে, এটি নিঃসন্দেহে আনন্দের খবর। কিন’ সেই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে যে আমরা খাদ্যে স্বাবলম্বী হলেও পুষ্টির ড়্গেত্রে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডবিস্নউএফপি) যৌথভাবে পুষ্টিসংক্রানত্ম যে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে, তাতে দেখা যায়, দেশের প্রতি আটজনের মধ্যে একজনের, অর্থাৎ ২ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষের পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। আর সুষম খাবার কেনার সামর্থ্য নেই অর্ধেকের বেশি মানুষের। সদ্য প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে পুষ্টিসম্মত খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং মানুষের তা কেনার সামর্থ্য কতটুকু আছে, তাও বিবৃত হয়েছে।

সরকারি হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২২ শতাংশ এবং অতিদারিদ্র্যের হার ১২ শতাংশ। এ কথা সত্য যে গত কয়েক বছরে দারিদ্র্যের হার বেশ কমেছে। কিন’ জনসংখ্যা বাড়ার কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেনি।

অতিদরিদ্র মানুষ ভাত, রম্নটি ও কম পুষ্টিকর খাবার দিয়ে কোনোরকমে ড়্গুধা নিবৃত্তি করলেও পুষ্টির প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে পারছে না। আবার নীলফামারী ও কুড়িগ্রামের মতো দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকার বাসিন্দারা তিন বেলা ঠিকমতো খেতেও পারছে না। তবে পুষ্টির ড়্গেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যও আছে। ১৯৯৭ সালে যেখানে দেশে ৬০ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির ছিল, ২০১৮ সালে তা কমে ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে। সার্বিকভাবে পুষ্টি পরিসি’তির উন্নতি হলেও নারীর পুষ্টি পরিসি’তি এখনো নাজুক অবস’ায় আছে। এমনকি ১০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রতি তিনজনের একজন নারী প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার পায় না। এ তথ্য খুবই উদ্বেগজনক।

আগের থেকে আমরা কতটা ভালো করেছি, তার চেয়ে জরম্নরি হলো, কত দ্রম্নত বর্তমান অবস’া থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে তৈরি করার কথা বলেন। কিন’ বিপুলসংখ্যক মানুষকে অপুষ্টিতে রেখে সেটি সম্ভব নয়। এ কারণে সরকারের সব উন্নয়ন কর্মসূচিতে পুষ্টিকে গুরম্নত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে দরিদ্র মানুষের মধ্যে চাল ও গম বিতরণ করছে, যার ‘লাভের গুড়’ পিঁপড়াই বেশি খেয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। এ অবস’ায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় চাল বা গম না দিয়ে তাদের কাছে পুষ্টিকর খাবার পৌঁছাতে পারলে সেটি অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে বলে সংশিস্নষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন। সরকার বিদ্যালয়ের শিড়্গার্থীদের মধ্যে দুপুরের খাবার হিসেবে পুষ্টিকর বিস্কুট দিচ্ছে, যাতে শিড়্গার্থীদের পুষ্টির চাহিদা অনেকটাই পূরণ হচ্ছে।

শিশুদের মতো দরিদ্র নারীদের জন্যও তৈরি খাবার সরবরাহের ব্যবস’া করা যেতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টির প্রয়োজন অনেক বেশি। মা অপুষ্টিতে ভুগলে তাঁর সনত্মানও অপুষ্ট ও রম্নগ্ন হবে। তবে শুধু সহায়ক কর্মসূচি দিয়ে দেশের পুষ্টি সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এর টেকসই সমাধানের জন্য প্রত্যেক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এবং দরিদ্র মানুষের আয় বাড়াতে হবে; যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারে। জিডিপি বাড়ানোর পরিসংখ্যানে তৃপ্ত না থেকে জনগণের পুষ্টির দিকে নজর বাড়াতে হবে।

উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে সমৃদ্ধ মানবসম্পদের বিকল্প নেই। দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান অনত্মরায় হিসেবে কাজ করে দুর্নীতি। দুর্নীতির লাগাম টানতে না পারলে ধনী-গরিব বৈষম্য কমানো যাবে না। উন্নয়ন বিষয়ে সরকারের পড়্গ থেকে যেটা বলা হয়, সেটা কিছু অবকাঠামো। কিছু বহুতল ভবন, ফ্লাইওভার হলেই উন্নয়ন হয়ে যায় না। মানুষের জীবনমানের কতটা উন্নয়ন হলো, দরিদ্রদের জীবনমানের কতটা উন্নয়ন হলো, সেটাই বিষয়। মাথাপিছু আয় বাড়লেই উন্নয়ন হয় না। একদিকে দরিদ্র তৈরি করে আরেকদিকে দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্প বানিয়ে দারিদ্র্য নিরসন করতে থাকলে দারিদ্র্য কমবে না। এসব সমাধানে প্রয়োজন জবাবদিহির রাজনীতি ও গণতন্ত্র।

বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, দিন দিন শহরকেন্দ্রিক দরিদ্র মানুষের বাস বাড়ছে। দরিদ্র মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হলেই নগর ও দেশের উন্নয়ন সম্ভব। বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন করা না গেলে উন্নত দেশের স্বপ্ন বাসত্মবায়নও সম্ভব নয়। দরিদ্র মানুষ যাতে নগরমুখী না হয়, সে ব্যবস’াও থাকতে হবে। তথ্যমতে ঝরে পড়াদের মধ্যে ৮০ শতাংশের পরিবারেরই শিড়্গার ব্যয় বহনে অড়্গম। এ ছাড়া অজ্ঞতা, পরিবারের উপার্জনে সাহায্য করা, পড়তে আগ্রহী না হওয়া, কাজ করতে বাধ্য হওয়াসহ বেশ কিছু কারণে প্রাথমিক শিড়্গা থেকে শিশুরা ঝরে পড়ে। আর সবচেয়ে বেশি ঝরে পড়ে দ্বিতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে। বেসরকারি সাহায্য সংস’া ব্র্যাকের গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। ৬৫ শতাংশ বসিত্মবাসী ভাড়া থাকেন। ২০১৪ সালের শুমারি অনুযায়ী সারা দেশে বসিত্মবাসীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২২ লড়্গ। তবে এসব সংখ্যা ও তথ্য উপাত্ত নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। ২০১৪ সালের পর এখন বসিত্ম বা বসিত্মবাসীর সংখ্যা কত তার কোন হিসেব কারো জানা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন সরকারি উপাত্তগুলোর উপরে ঠিক আস’া রাখতে পারছেন না। বসিত্মবাসীর সংখ্যা বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ১৯৯৭ সালের পর বসিত্ম শুমারি হয়েছে ২০১৪ সালে। সরকারি হিসেবেই এই সময়ের মধ্যে বসিত্মর সংখ্যা ছয়গুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশে কোন পরিকল্পনা যখন করা হয় তখন এই বিশাল জনসংখ্যার কথা খুব একটা মাথায় রাখা হয়না। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় রয়েছে কিন’ তাদের কাজে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। বসিত্মর মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব কার, কাজগুলো কিভাবে হবে? উন্নয়ন পরিকল্পনায় এদের ধরা হয়না। তাদের সেবা নিশ্চিত করবে কে? এমনকি বসিত্মতে বিভিন্ন সেবা পেতে তারাও কিন’ অর্থ খরচ করে। কিন’ সেটি সরকারের খাতায় হিসেব হয়না। তাই বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন, শুমারি করার সময় বসিত্মর সংজ্ঞা কিভাবে নির্ধারণ করা হয়?