বসন্তের রঙে রঙিন চবি ক্যাম্পাস

সিফায়াত উল্লাহ

কবির শংকা ছিল, ফুল ফুটবে কিনা। তাই তিনি বলেছেন, ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক, আজ বসন্ত। কিন’ প্রকৃতিতে ফুল ফুটেছে। কৃষ্ণচূড়ার ডালে লেগেছে আগুন, বাতাসে দুলছে ফাগুন। গাছে গাছে মেলেছে শিমুল। শীতকে হার মানিয়ে দক্ষিণা হাওয়ার গুঞ্জনও লেগেছে। বাতাসে ফুলের গন্ধ ভেসে এসেছে।
অন্যদিকে বিদায় নিয়েছে প্রকৃতির রুক্ষ ঋতু শীতকাল। ধরায় ডানা মেলেছে ঋতুরাজ বসন্ত। কৃষ্ণচূড়া আর শিমুল গাছগুলো সাজতে শুরু করেছে রক্তিম লালে। জীর্ণ পাতার মর্মর শব্দ ছাপিয়ে গাছে গাছে নতুন পাতার জন্ম হতে শুরু করেছে। পঞ্জিকার হিসেবে সময়ের আপন নিয়মে বছর ঘুরে আবার এসেছে বসন্ত।
গতকাল মঙ্গলবার ছিল ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। আর এই বসন্তকে বরণ করতে মেতেছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ফাগুনের প্রথম দিনটিকে বরণ করে নিতে আয়োজনের কোনো কমতি ছিল না ক্যাম্পাসে। দিনের শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাধভাঙা উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসজুড়ে। বইতে শুরু করে ফাগুনের হাওয়া। উৎসবপ্রিয় মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বাসন্তী রঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে তরুণ-তরুণীরা দিনভর মাতিয়ে রাখে ক্যাম্পাস। শাড়ি, খোঁপায় বাসন্তী ফুল আর উৎসবের পাঞ্জাবি-ফতুয়া মনে করিয়ে দেয় ধরায় বসন্ত এসেছে। সেই সঙ্গে গোলাপ, গাঁদা, ডালিয়াসহ নানান ফুলে ক্যাম্পাসের গাছেও যেন বসন্ত জানান দিচ্ছে। শীতের রিক্ততা মুছে প্রাণের স্পন্দনে একটু একটু করে জেগে উঠেছে প্রকৃতি, ঠিক তেমনি করে বসন্তের ফুলে সেজে উঠেছে নিঝুমপুরীর এ বিদ্যাপীঠ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন নবীন শিক্ষার্থী আফরিন, আফরোজ ও সুমাইয়া । ২০১৭-১৮ সেশনে ভর্তি হন তারা। ভর্তির পর থেকে একসঙ্গে থাকছেন এক বাসায়। বসন্ত বরণের অনুষ্ঠানকে ঘিরে প্রায় দুই মাস ধরে প্রস’তি নিয়েছেন। অনুষ্ঠানে তাদের অভিন্ন শাড়ি আর সাজ নজর কাড়ে সবার। জানতে চাইলে আফরিন বলেন, ‘কয়েক মাস আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলাম। বড় জায়গা। নিজেদের মানিয়ে নিতে হচ্ছে। এরমধ্যে চলে আসলো বসন্ত বরণের মতো বড় অনুষ্ঠান। তাই আমরা ভালোভাবে প্রস’তি নিয়েছি।’ আফরোজ বলেন, ‘আগে শুধু পত্রিকায় বা টিভিতে দেখতাম। এখন নিজেরাই উদ্যাপন করছি।’ অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী মামুন রবিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে কখনো বসন্ত বরণের এতো আয়োজন প্রত্যক্ষ করিনি। তাই বন্ধুদের সঙ্গে চলে এসেছি। ক্যাম্পাসের নানা উৎসবে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি। প্রাণভরে উপলব্ধি করছি আজকে ক্যাম্পাসের আনন্দ।’
তবে বসন্ত আসলেও অনেকের মনেই বাজছে বিদায়ের সুর। কারণ পড়াশোনা শেষ করছেন তারা। ক্যাম্পাস জীবনে এটাই তাদের শেষ বসন্ত। তাই বন্ধুরা মিলে যতটুকু পারা যায় প্রাণ ভরে নিচ্ছেন বসন্তের স্বাদ। কথা হয় এমনই একজন শিক্ষার্থী ওমর ফারুকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসের বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন আমাদের কাছে সবসময় উপভোগ্য। দীর্ঘদিন এ ক্যাম্পাসের ছিলাম। তাই যাওয়ার আগে ক্যাম্পাসের শেষ বসন্তকে স্মরণীয় করে রাখতে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলে রাখছি।’
এদিকে প্রতিবারের মতো এবারও ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে আয়োজন করা হয় বসন্ত বরণের অনুষ্ঠান। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের উদ্যোগের এ অনুষ্ঠান আয়োজন হয়। সকালে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। এছাড়াও অতিথি ছিলেন উপ-উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার, বাংলা বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. মহিবুল আজিজ, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি ও একুশে পদকপ্রাপ্ত মাহমুদ সেলিম ও ডা. চন্দন দাশ।
বসন্ত বরণের অনুষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণ করে। দিনভর গান, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি, একক সংগীত, দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।