বদির স্বজনসহ ১০২ জনের আত্মসমর্পণ

ইয়াবা ব্যবসায়ীরা ছাড় পাবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার

বহুল আলোচিত সীমানত্ম উপজেলা টেকনাফে ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এ সময় তারা ৩০টি দেশীয় অস্ত্র ও ৩ লাখ ৫০ হাজার ইয়াবা জমা দেয়। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে টেকনাফ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন বিপিএমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। প্রধান আলোচক ছিলেন আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বিপিএম।
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইয়াবার সাথে সংশিস্নষ্ট কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। শেখ হাসিনার বাংলায় ইয়াবাবাজদের নিসত্মার নাই। যারা আত্মসমর্পণ করেছে তাদেরকে সাধুবাদ জানাই। আর যারা আত্মসমর্পণ করবে না, তাদেরকে শীঘ্রই খুঁজে বের করা হবে।
তিনি বলেন, যে ইয়াবা সেবন করলে এত ড়্গতি হচ্ছে, সে ইয়াবা কেন আমরা প্রতিরোধ করবো না। অবশ্যই ইয়াবা প্রতিরোধ করবো। আমরা ২০৪১-এর স্বপ্ন দেখছি। আমরা ২০২১-এর স্বপ্ন বাসত্মবায়নের পথে। উন্নয়ন রোলমডেল হিসেবে বাংলাদেশ সারাবিশ্বের কাছে বিস্ময় হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা থমকে যেতে চাই না। এতে কেউ বাধা দিলে আমরা তাকে প্রতিহত করবো।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারম্নক বিপিএম-বার, পিপিএম, অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন এন্ড ক্রাইম) মোহাম্মদ আবুল ফয়েজ, কক্সবাজার জেলার চারটি আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম, আশেক উলস্নাহ রফিক, সাইমুম সরওয়ার কমল, শাহীন আক্তার চৌধুরী, বিজিবি’র রিজিওনাল চিফ, ব্যাটালিয়ন চিফ, জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এডভোকেট সিরাজুল মোসত্মফা ও সাধারণ সম্পাদক মুুজিবুর রহমান। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সত্মরের নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সত্মরের বিপুল সুধীবৃন্দ উপসি’ত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে মাদকের বিরম্নদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। ইয়াবা এখন দেশকে গ্রাস করেছে। তাই যাবজ্জীবন কারাদ-ের আইন করে ইয়াবা প্রতিরোধের উদ্যোগ নিয়েছি। একই সাথে ইয়াবাবাজদের প্রতিহত করতে সরকার জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। তাই বলতে চাই, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই ছাড় পাবে না। কেউ রেহাই পাবে না। সবাইকে ধরা দিতেই হবে। যারা আত্মসমর্পণ করেনি তাদের ব্যাপারে তথ্য নেয়া হচ্ছে। তাদের খুঁজে বের করবে আমাদের বাহিনী।
জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছে। তাদের মধ্যে ২৯ জন গডফাদার।
আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীর হাতে ৩ লাখ ইয়াবা, ৩০টি অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে এসব ইয়াবা ব্যবসায়ী। তাদেরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী। আত্মসমর্পণের পর তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে।
এদের মধ্যে রয়েছে টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির চারভাই আবদুল আমিন, আবদুর শুক্কুর, মোহাম্মদ সফিক ও মোহাম্মদ ফয়সাল, ভাগ্নে সাহেদুর রহমান নিপু এবং বেয়াই শাহেদ কামাল, টেকনাফ সদরের এনামুল হক মেম্বার, ছৈয়দ হোসেন মেম্বার, শাহ আলম, আবদুর রহমান, মোজাম্মেল হক, জোবাইর হোসেন, নূরম্নল বশর নুরশাদ, কামরম্নল হাসান রাসেল, জিয়াউর রহমান, মোহাম্মদ নুরম্নল কবির, মারম্নফ বিন খলিল ওরফে বাবু, মোহাম্মদ ইউনুছ, ছৈয়দ আহমদ, রেজাউল করিম, নুরম্নল হুদা মেম্বার, দিদার মিয়া, জামাল হোসেন মেম্বার, মোহাম্মদ শামসুসহ অনেকে।
কারাগারে যাবে আত্মসমর্পণকারীরা : পুলিশের দায়ের করা দুটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হবে আত্মসমর্পণকারী ১০২জন ইয়াবা ব্যবসায়ীকে। এছাড়া যেসব আত্মসমর্পণকারীদের বিরম্নদ্ধে পুরাতন মামলা রয়েছে, সেগুলোও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলবে।
আত্মসমর্পণের দিনই তাদের নামে দুটি মামলার প্রসত্মুতি নিয়েছে পুলিশ। টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করবেন। এর একটি ইয়াবা মামলা, অন্যটি অস্ত্র আইনে। তবে দুটি মামলার ড়্গেত্রেই সরকারি আইনি সহায়তা পাবে তারা। আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় সংশিস্নষ্ট সূত্র এমনটি জানিয়েছেন।
আত্মসমর্পণকারীদের প্রতিক্রিয়া : আত্মসমর্পণের পর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন দুই শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী। তারা হলেন টেকনাফ সদরের বহুল আলোচিত ইউপি সদস্য এনামুল হক ও মো. সিরাজ।
প্রতিক্রিয়ায় তারা বলেন, ইয়াবা পুরো দেশের যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এতে দেশের নতুন প্রজন্ম চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এ অপরাধের জন্য আমরা দায়ী। অন্যদিকে ইয়াবা ব্যবসার কারণে টেকনাফসহ পুরো কক্সবাজার জেলার মানুষ সারাদেশের মানুষের কাছে ছোট হয়ে আছে। যেখানে যাই, টেকনাফের মানুষ পরিচয় দিলে আমাদের ঘৃণা করা হয়। এমন কি কোথাও কোনো হোটেল বা বাসাভাড়া নিতে গেলে আমাদের প্রতি অনীহা প্রকাশ করা হয়। আমাদের সনত্মানদের স্কুল-কলেজে ভর্তি করাতে গেলে ভর্তি করা হয় না। এটা বড়ই কষ্টের এবং লজ্জার। এসব কিছু বুঝতে পেরে আমরা দেশকে ইয়াবার আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছি। যারা এখনো আত্মসমর্পণ করেনি, তাদেরও আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানাচ্ছি। একই সাথে আমাদের ড়্গমা করে স্বাভাবিক জীবনের ফেরার সুযোগ দেয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
তারা আরো বলেন, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে কাজ করলে ইয়াবার আগ্রাসন বন্ধ হয়ে যাবে। সীমানেত্ম যৌথভাবে টহল দেয়া হলে কোনোভাবেই ইয়াবা বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে না। ’
আত্মসমর্পণকারীদের প্রতি ৯ শর্ত
নিজের হেফাজতে থাকা সকল ইয়াবা ও অবৈধ অস্ত্র পুলিশের কাছে হসত্মানত্মর করতে হবে, আত্মসমর্পণের আগে দায়ের হওয়া মামলা ও বিচার কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মে চলবে, ইয়াবা ব্যবসায় নিজের এবং পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়স্বজনের নামে-বেনামে অর্জিত সকল সম্পদ দুদক, সিআইডির মানি লন্ডারিং শাখা ও এনবিআরের মাধ্যমে যাচাই করে আইনগত ব্যবস’া নেয়া হবে, আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় দায়ের হওয়া মামলায় সরকারের অনুমতি সাপেড়্গে সহায়তা প্রদান করা হবে, যে সকল মাদক ব্যবসায়ী এখনো সক্রিয়, তাদের ব্যাপারে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে, আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত হলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকায় মাদকবিরোধী কর্মকা-ে অংশ নিতে হবে, ভবিষ্যতে কখনো মাদক ব্যবসা সংক্রানত্ম অপরাধে জড়িত হওয়া যাবে না, আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় তাদের বিরম্নদ্ধে যে মামলাটি রম্নজু হবে, সরকারের অনুমতি সাপেড়্গে তাদেরকে আইনগত সুবিধা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজনের নামে ও বেনামে অর্জিত সকল স’াবর-অস’াবর সম্পত্তি যাচাইয়ের জন্য দুদক, সিআইডি (মানিলন্ডারিং শাখা) ও এনবিআরসহ সংশিস্নষ্ট সরকারি সকল সংস’ার নিকট তাদের তথ্যাদি প্রেরণ করা হবে, সংশিস্নষ্ট সংস’ার মাধ্যমে তাদের অর্জিত সকল স’াবর-অস’াবর সম্পত্তি যাচাই সাপেড়্গে আইনগত ব্যবস’া গ্রহণ করা হবে।
উলেস্নখ্য, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় কক্সবাজার জেলার ১ হাজার ১৫১ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। এদের বেশির ভাগ সীমানত্ম উপজেলা টেকনাফের বাসিন্দা। ভয়াবহ মাদক ইয়াবার বিরম্নদ্ধে গত বছরের ৪ মে থেকে শুরম্ন হয়েছে বিশেষ অভিযান। এ পর্যনত্ম সীমানেত্ম ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে ৪২ কারবারি। এর মধ্যে ৩৭ জনই টেকনাফের। তবে স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ৭৩ জন গডফাদারের মধ্যে চারজন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে।