বইয়ের ঘুণ পোকা হয়েই কাটিয়েছি অনুপম শৈশব

ড. মাহবুবুল হক, শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, ও গবেষক
ড. মাহবুবুল হক, শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, ও গবেষক

ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করার পর রংপুর, তারপর সৈয়দপুরের বাঙালিপুর ঘুরে শৈশব শুরু করি চট্টগ্রাম নগরীতে। নগরীর বাঘঘোনা মনিরাম বালক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করি। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটির ৪৭টি বিদ্যালয় মধ্যে পঞ্চম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করি।
১৯৫৮ সালে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। আমার আজও মনে আছে ভর্তি পরীক্ষার রোল নাম্বার ছিল ৮৮। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে আমার স্মরণীয় শৈশব শুরু হয়। গল্প-কবিতা লেখার খুব আগ্রহ ও লেখার মান দেখে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের বাংলার শিক্ষক ওহিদুল আলম বলেছিলেন, আমি যেন কখনো কবিতা লেখা ছেড়ে না দিই। কিন্তু কালের পরিক্রমায় আর কবিতা লেখা হয়নি। তবে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের বাংলার শিক্ষক ওহিদুল আলমকে খুব ভালোবাসতাম। যেমনটা ভালোবাসতাম ড্রইং শিক্ষক মোখলেছুর রহমান, ড্রিল টিচার মাহবুবুল হককে।
ড্রিল শিক্ষক মাহবুবুল হক ছিলেন আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং খুব কড়া। সব ছাত্ররাই তাঁকে ভয় পেতেন। তবে ড্রইং শিক্ষক মোখলেসুর রহমান ছিলেন খুব মজার। সবসময় ছন্দ মিলিয়ে মিলিয়ে কথা বলতেন, ছড়া কাটতেন। প্রথম দিকে বাঘঘোনা থেকে কলেজিয়েট স্কুলে যেতাম কিছু পথ পায়ে হেঁটে ও বাকি পথ বাসে চড়ে। কিন্তু পরবর্তীতে পুরো পথ পায়ে হেঁটে যাতায়াত করে গাড়ি ভাড়া বাবদ দৈনিক যে দুই আনা পেতাম তা দিয়ে বই কিনতাম। প্রতি বৃহস্পতিবার শ্রেণিকক্ষে পুরাতন বই নিয়ে নতুন বই ইস্যু করা হতো। স্কুলে কোনো লাইব্রেরিয়ান না থাকায় বাংলার শিক্ষক ওহিদুল আলম এ দায়িত্ব পালন করতেন। আমার হাতের লেখা সুন্দর থাকায় আমাকে ক্লাসের এ দায়িত্ব দেয়া হয়। এজন্য অনেক বই দেখার ও পড়ার সুযোগ পাই। প্রতি বৃহস্পতিবার কলেজিয়েট স্কুলে সাংস্কৃতিক চর্চা হতো। আমি নাটক ও আবৃত্তি করতাম। সে সুবাদে বাংলার খ্যাতিমান ঔপনাসিক ও কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সাথে আমার পরিচয় হয়। একবার স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে সাহিত্যশিল্পী আবুল ফজল প্রধান অতিথি হয়ে আসেন। আমি ও হুমায়ূন আহমেদ কবি জসীমউদ্দিনের ‘কবর’ কবিতা পাঠ করি। হুমায়ূন আহমেদ নিচের ক্লাসের ছাত্র হলেও আমার খুব ঘনিষ্ট ছিল। আমার বৃত্তি থেকে পাওয়া টাকা ও জমানো টাকা দিয়ে বই কিনে ঘরে তৈরি করেছিলাম একটি লাইব্রেরি। হুমায়ূন আহমেদের সাথে ভালো সম্পর্ক হওয়ার সুবাদে সে প্রতিদিনই বই পড়তে আমাদের বাসায় আসতো।
শিক্ষাকে পুঁজিবাদের একটি পণ্য করার প্রস্তাবে ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন হয়। আমি যোগ দিই। এটিই ছিল আমার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে পদার্পন। তারপর স্কুলের সাইকোলস্টাইল যন্ত্রের সাহায্যে ‘নবদিগন্ত’ নামের একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করি। এভাবে বইয়ের ঘুণ পোকা হয়েই কাটিয়েছি আমার অনুপম শৈশব।
অনুলিখন: শুভ্রজিৎ বড়ুয়া