ফ্লোরিডার পথে

বিমল গুহ
klo

মানুষ জন্মগতভাবেই ভ্রমণপিপাসু। ঘরে বসে থাকতে ছোট্ট শিশুটিও চায় না; বাবা-মা’র হাত ধরে সেও বেড়াতে চায় ঘরের বাইরে। এই দেখার নেশাই মানুষকে দেশভ্রমণে আহ্বান করে! মহা উত্তেজনা নিয়ে আমরা রাত কাটালাম। রাত পোহাতেই ভোরের আকাশ হাতছানি দিয়ে ডাকলো। ভোর-সূর্যের রক্তিম আভা অপরূপ লাবণ্য নিয়ে ছড়িয়ে পড়লো দিকে দিকে। আমরা যাচ্ছি রূপের রাণী বলে-খ্যাত ফ্লোরিডা ভ্রমণে।
উপমা আমার মেজমেয়ে। গাড়ি চালাতে খুব পছন্দ করে। ও মিনি ট্রাকও চালিয়েছে, বাসা বদলের সময়- এক স্টেট থেকে আরেক স্টেটে। ওর গাড়ি-চালনার গল্প বলতেই পুরানো প্রসঙ্গ টেনে আনলাম। ওর পছন্দ কখনো কখনো আমার অস্বস্তিরও কারণ হয়ে যায়, যখন গাড়ি চলতে শুরু করে ঘণ্টায় ৮০-১০০ মাইল গতিতে। চালায় আর রাস্তা দেখিয়ে দেখিয়ে যায়। সবটা ভালো, কিন’ বিপত্তি আমাদের মানসিক অবস’ানের। বাংলাদেশে আমিও গাড়ি চালাই। আমাদের চালনা আর ওখানকার চালনা এক নয়। আমরা অভ্যস্ত ৪০-৫০ মাইলে। এর বেশি হলেই অস্বস্তি। তবে কেউ ইচ্ছে করলেও ওখানে গতি কমাতে পারে না। রাস্তারও নিজস্ব গতি থাকে! উপমা আমাদের নিয়ে চললো বহু দূরপথে ফ্লোরিডায়। তার প্রস্তাবে রাজীও হলাম। বললো গাড়িতে যাবে। আমি বললাম প্লেনে যেতে। তার যুক্তি ছিলো নিজস্ব গাড়ি না হলে ইচ্ছেমতো ঘোরা যায় না। আমাদের গন্তব্য ফ্লোরিডা, তবে পথে বিশ্বখ্যাত বিনোদন স’ান অরলান্ডোতে অবসি’ত ইউনিভার্সাল স্টুডিও দেখে যাওয়ার ইচ্ছেও পোষণ করেছি মনে মনে। উপমা টের পেলেই হলো- সে আমাদের কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রাখতে দেবে না। যেভাবে আলাপ সেভাবেই ব্যবস’া।
এটা ২০১২ সালের গল্প। উপমা তখন থাকতো সাউথ কেরোলিনায়। পড়তো ইউনিভার্সিটি অব সাউথ কেরোলিনা আরনল্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এ। ফ্লোরিডার গল্প অনেকবার শুনিয়েছে আমাকে। আমেরিকার সর্ব দক্ষিণে অবসি’ত স্টেট। এখানেই আমেরিকার দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। আবহাওয়া বাংলাদেশের মতো উষ্ণভাবাপন্ন, আমাদের জন্য উপযোগী। এটি পৃথিবীর ক্রান্তিরেখায় অবসি’ত এলাকা। জ্যের্তিবিজ্ঞানের ভাষায় কর্কটক্রান্তি আর মকরক্রান্তি রেখার মাঝামাঝি অবসি’ত। তাই নয় ঠাণ্ডা, নয় গরম- নাতিশীতোষ্ণ। আমাদের উদ্দেশ্যই ভ্রমণ। সেখানে আমার এক বন্ধু ড. নেছারউদ্দিন আহমেদ সপরিবারে থাকেন। তিনি বেশ আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। এখন ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ডিপার্টমেন্ট অব এপিডেমিয়োলজি এন্ড বায়োস্টাটিসটিক্স-এর চেয়ারপার্সন। মিসেস মনিরা আহমেদও আমাদের পারিবারিক বন্ধু। আগেই তাঁদের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছি আমরা।
আমরা সাউথ কেরোলিনা থেকে ২ জানুয়ারি দুপুর ১২টায় ফ্লোরিডার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি। পথের দূরত্ব অনেক। আজ যাবো অর্ধেক পথ। আমরা কলাম্বিয়া স্টেট পার হয়ে ঢুকলাম জর্জিয়া স্টেটে। পথে জর্জিয়ার সাভান্না শহরের পাশ দিয়ে চলে এলাম। জানা যায় সাভান্না নাকি আমেরিকার আদি শহর। সর্বত্রই ঐতিহাসিক নিদর্শন। সাভান্না এক সময় জর্জিয়ার রাজধানীও ছিলো। এর পর অন্য অন্য শহর, গড়ে উঠেছে বিশাল বিশাল শহর। দশ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে রাত ১০টায় এসে পৌঁছেছি আরমন্ড বীচ এলাকায়। এটি আটলান্টিক মহাসমুদ্রের তীরবর্তী একটি পর্যটন কেন্দ্র। ডেটোনা বীচের মধ্যবর্তী স’ান। এখানে আমরা রাতে থাকবো ডেজ্-ইন রেস্টহাউসে। দশ ঘণ্টার ধকল সইতে হচ্ছে সকলকে। তারপরও ক্লান্তি নেই। ঘুরে বেড়ানোর মধ্যেই আনন্দ পাচ্ছি।
আমেরিকায় গাড়ি চালানো এক অর্থে সহজ, সবাই নিয়ম মেনে চলে। কঠিন হচ্ছে এক টানা হাজার হাজার মাইল! রাস্তা গেছে নাক বরাবর। কত আগের তৈরি রাস্তা। এসব রাস্তা যখন তৈরি করে সেই শত বছর আগে, তারা মাথায় রেখেছিলো আগামীকে। তখন জনবসতি এতো ছিলো না। তাই নাক বরাবর গেছে রাস্তা সব! ট্যুর বাসে লাস-ভেগাস থেকে গ্রান্ড-কেনিয়ন দেখতে গিয়েছিলাম একবার। বিশাল বাস। চলছে শত মাইল বেগে। দেখি চালক স্টিয়ারিং-ই ধরে না। মাঝে মাঝে যেন হাত রাখে রেস্টের জন্য, এমনটিই মনে হচ্ছিলো। গাড়ি চলছে গাড়ির মতো। ছয় লাইনের মহাসড়ক। এক/দুই মাইল নয়, শত শত হাজার হাজার মাইল। গাড়ি চলছে ৮০-১০০ মাইল গতিতে। সব গাড়ি। রেস্ট-হাউসে থাকার ব্যবস’া মোটামুটি ভালো। এখানে দীর্ঘযাত্রার ট্যুরিস্টেরাই ওঠে। আমাদের জন্য বরাদ্ধ ১২৫নং কক্ষ। নিচতলা। কক্ষের সামনে গাড়ি পার্ক করা হয়েছে।
পরদিন ৩/২/১২ সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠেছি। একে একে তৈরি হওয়ার পালা। সকালের নাস্তা সেরে আজ আবার রওনা হচ্ছি ‘ইউনিভার্সেল স্টুডিও-অরলানডো’ দেখতে। পৃথিবীখ্যাত জায়গা। মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য মজার জায়গা। শিশু-কিশোরদের স্বর্গ। আমরা দুপুর ১২টায় এখানে এসে পৌঁছলাম। বিশাল স’াপনা। বাছাই করে করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। হ্যারিপটার, স্পাইডার ম্যান, লষ্ট কন্টিন্যান্ট, রোলার কোস্টার মন ভরে উপভোগ করলাম মিথিলা ও উপমাসহ। তবে রোলার কোস্টারে আমি উঠিনি। আমাদের মত বড়দের ভীষণ ভীতিকর রাইড। বুক কেঁপে ওঠে ভাবলেই। মুহূর্তেই যেন মাঠ থেকে আকাশে উঠে যাচ্ছে। মজার অভিজ্ঞতা হলো হ্যারিপটার ও স্পাইডার ম্যান দেখে। ফোর ডাইনেশন সিনেমা। স্পাইডার ম্যান তো এক লাফে আমার হাতের উপর এসে দাঁড়ালো। সবই আলোছায়ার খেলা। কালো চশমা পড়েই এসব দৃশ্য দেখতে হয়েছে। তীর্যক আলো এসে চোখে পড়ছে। স্পাইডার ম্যান নিউইয়র্ক সিটির একটি বহুতল ভবন এক ঘুষিতে ভেঙে ফেললো। বাস্তবেই যেন দেখছি- ইটের টুকরো আমাদের দিকে দ্রুত বেগে ছুটে আসলো। গায়ে এসেও লেগেছে। কিন’ ব্যথা পায়নি। কারণ যা কিছু দেখেছি সব চোখের ভ্রম, সব আলোর খেলা! ভীতির সঞ্চার হওয়া স্বাভাবিক। সাহস করে বসে থাকলে কিছইু না। ভাবতে হবে সবই চোখের ভ্রম।
সন্ধ্যা ৭টায় শো বন্ধ হয়ে যায়। আমার ৭টাতেই বের হয়ে এলাম। এতো বড় জায়গা শেষ হবার নয় এতো অল্প সময়ে। কিছু তৃপ্তি, কিছুটা অতৃপ্তি নিয়েই ফিরে এলাম। অরলানডো থেকে আমরা চললাম ফ্লোরিডা সিটির উদ্দেশ্যে। তিন ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে এবার এসে পৌঁছলাম আরেক রেস্ট হাউজে। তখন রাত বাজে ১০টা। এখানে রাত কাটাবো। সকালে উঠে আবার ফ্লোরিডার উদ্দেশ্যে যাত্রা। পৃথিবীখ্যাত ফ্লোরিডার মিয়ামি বীচ। বলে রাখা ভালো যে, যেখানে এ মুহূর্তে আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে হিমশীতল ঠাণ্ডা, ফ্লোরিডায় তখন বসন্তকাল। খুব ভালো আবহাওয়া। এশিয়ানদের জন্য বড় উপযোগী।
পরের দিন ৪/২/১২ সকাল ৯টায় আমরা আবার যাত্রা করেছি। ঘন্টায় ৮০ মাইল গতিতেই গাড়ি চলে, ২৪০ মাইল বা তার কিছু বেশি দূরত্ব। পৌঁছতে সময় লেগেছিলো ৩ ঘন্টা। ড. নেছারউদ্দিনের বাসায় পৌঁছতেই তাঁরা সপরিবারের সবাই আমাদের স্বাগত জানালেন। খুব সুন্দর দোতলা বাড়ি। লেকের পাড়ে। বৈঠকখানায় বসে হাঁসের, বকের চলাচল দেখা যায়। ঘরের আঙিনায় এ সব প্রকৃতির সম্পদ। কেউ এদের মারতে পারে না। নেছার সাহেব ঠাট্টা করে বললেন, আমাদেরটাও হাঁস-বকেরই বাসা, আমরা তাদের সাথেই থাকি। লেকে মাছ ধরা যায়, কোন পাখি মারা যাবে না। আমাদের যত্নআত্তি করলেন খুব। বেলা তখন ২টা বাজে। আমরা খেয়েই রওনা দিলাম মিয়ামি সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশ্যে।
প্রায় ১ ঘন্টার পথ। যেতে যেতে অসম্ভব সুন্দর সাজানো বাড়িঘর, সুউচ্চ ভবন, রাস্তাঘাট, প্রাকৃতিক লেক দেখছিলাম। ছোট ছোট দ্বীপে থাকেন এলাকার ধনীরা। চারপাশে পানি, মাঝে এক একটা দ্বীপে শ’খানেক বাড়ি অর্থাৎ এক একটা পাড়া। প্রত্যেক দ্বীপের নাম দেয়া আছে। যেমন একটার নাম- স্টার আইল্যান্ড। পৃথিবীর খ্যাতিমান ব্যক্তিরা, অর্থাৎ নানা পেশার স্টারেরা থাকেন সেখানে। সাধারণ মানুষের কোনো বাড়ি নেই সেখানে।
আমরা পৌঁছে গেলাম মিয়ামি বীচে। আমাদের দলে ছিলেন মিসেস মনিরা আহমেদ, ড. নেছারউদ্দিন আহমেদ, আমি ও আমার দুই মেয়ে উপমা ও মুমু। বিশাল সৈকত।
ঘন্টাখানেক ছিলাম। দেখলাম দশতলা ভবনের সমান-উঁচু কয়েকটি জাহাজ রওনা দিলো আটলান্টিক মহাসাগরে। আটলান্টিকের পানি এসে আছড়িয়ে পড়ছে সৈকতে। নরনারী, বালক-বালিকা নির্বিশেষে বেলাভূমিতে শুয়ে আছে, কেউ পানিতে নেমে গেছে। প্রকৃতির সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই সৈকত! বীচসংলগ্ন এলাকা দেখে তা বলে উঠতে ইচ্ছে হচ্ছিলো- এটাই তো স্বর্গ!
ফ্লোরিডা হচ্ছে সৌন্দর্য-ভূমি, যেখানে ফুলে-ফলে ভরা থাকে বছরের বেশি সময়। অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ও শীতকালীন ফলমূলের জন্যও ফ্লোরিডা বিখ্যাত। এটি মহাসাগর তীরবর্তী আমেরিকার সর্ব দক্ষিণে অবসি’ত স্টেট- যার পূর্বে রয়েছে আটলান্টিক মহাসাগর, পশ্চিমে মেক্সিকো উপসাগর, দক্ষিণে ফ্লোরিডা প্রণালী। এটি একটি উপদ্বীপ। কেবলমাত্র উত্তরে রয়েছে মূল ভূমির সংযোগ, জর্জিয়া ও আলাবামা স্টেট। ফ্লোরিডা পৃথিবীর অন্যতম সেরা পর্যটন স’ান, স্বাস’্যকর স’ান হিসেবে পরিগণিত। ফ্লোরিডা স্পেনিস শব্দ, অর্থ ল্যান্ড অব ফ্লাওয়ারস।
বাংলায় দাঁড়াবে পুষ্পোদ্যান। ইংরেজি ছাড়াও প্রায় ২০% অধিবাসী স্পেনিস ভাষায় কথা বলে। জানা গেলো, ফ্লোরিডার সংস্কৃতিতে রয়েছে আফ্রিকান, ইউরোপীয়ান, লেটিন ও স’ানীয় আচার-আচরণের সংমিশ্রণ। ফ্লোরিডার অর্থনীতি কৃষি, জনপরিবহন ও পর্যটন শিল্পনির্ভর। মাথাপিছু আয় নাকি ৪০,০০০ ডলারের মতো, যা অন্য অনেক স্টেটের চাইতে বেশি। উল্লেখ করার বিষয় হলো ফ্লোরিডার নাগরিকদের ব্যক্তিগত আয়কর দিতে হয় না। আমাদের এই সংক্ষিপ্ত সফর শেষ করে মিয়ামির স্মৃতিকে বুকে নিয়ে একই পথে ফিরে এলাম সাউথ কেরোলিনায়।
দেখার যেন শেষ নেই! প্রকৃতির সৌন্দর্য মানুষের মনকে আনন্দে তৃপ্তিতে ভরে দেয়। যেন কোনকালেই শেষ হবে না এই অনুভব। আমরা এই প্রকৃতিরই অংশ। তাই জন্মগতভাবে মানুষ ভ্রমণপিপাসু হয়। মানুষই প্রাণিকুলের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, মেধাবান। দেখার-জানার নেশা তার মজ্জাগত। জানতে হলে চতুর্দিকে চোখ মেলে তাকাতে হয়। ছুটে যেতে হয় প্রান্ত থেকে প্রান্তে। তা না হলে ঘরের মধ্যেই তো আবদ্ধ হয়ে থাকা! সেন্ট অগাস্টিনের একটি উক্তি স্মরযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ‘পৃথিবী একটি বইয়ের মতো- যারা ভ্রমণ করে না তারা বইয়ের একটি পৃষ্ঠাই কেবল পাঠ করে। পুরো বইটি আর খুলে দেখার সুযোগ হয় না’। দেখার এই নেশাই মানুষকে দেশভ্রমণে আহ্বান করে! আর এই ভ্রমণের জন্য দরকার সময়ের, সুযোগের। ইচ্ছে থাকতে হয়- তবেই একসময় উপায় হয়ে যায়। তারপরও কথা থাকে।
ভ্রমণের উপায় সময়মত না হলেও জানার উপায় তো আর বন্ধ থাকে না এই যুগে। পৃথিবীটাই তো এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। ভ্রমণের তৃষ্ণা বই পড়েও অনেকটা মেটানো যায়। আজ যা আমি লিখেছি, তা তো পাঠকের জন্যই। আমার দেখা পৃথিবীকে সবার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি এখানে। বই পড়ে জানার মধ্যেও এক ধরনের তৃপ্তি আছে, আনন্দ আছে।