ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক

কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না চলমান এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। গতকাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়া আট বিষয়ের সবকটিতে ফাঁস হয়েছে প্রশ্নপত্র। তবে পরীক্ষার শেষ প্রান্তে এসে এবার সরব হয়েছে প্রশাসন। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ব্যবহারকারীদের ধরতে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান চালিয়ে গতকাল বাসভর্তি শিক্ষার্থী আটক করা হয়। তাদের কাছে থাকা প্রশ্নপত্রের সাথে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল পাওয়া যাওয়ায় আটককৃতদের মধ্যে ১৮ জন শিক্ষার্থী ও একজন শিক্ষককের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। একই সাথে ফাঁস হওয়া এসব প্রশ্নপত্র ব্যবহারের কারণে আটককৃত ১৮ শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৩ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছে শিক্ষাবোর্ড। অপরদিকে আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত প্রকৃত হোতাদের বের করার ঘোষণা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী।
গতকাল নগরীর বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্র, পুলিশ লাইন ইনস্টিটিউশন ও ফটিকছড়ির হেঁয়াকো বনানী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে এসব শিক্ষার্থীদের আটক করা হয়।
যেভাবে চলে এই অভিযান :
আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজটি পটিয়া এলাকায় স’ায়ী ক্যাম্পাস ও জামালখানে শহর ক্যাম্পাস দেখিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটির স’ায়ী ক্যাম্পাস পটিয়ায় তাই পটিয়ার কোটায় শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পেয়ে আসছিল এবং গত বছর পর্যন্ত এখানকার শিক্ষার্থীরা পটিয়ায় গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে এসেছে। কিন’ গত বছর চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম তাতে আপত্তি তুলে বলেন, জামালখান ক্যাম্পাসের ছেলেরা গ্রামে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে পটিয়ার অনেক বৃত্তি পেয়ে আসছিল, এতে পটিয়ার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। তাই এবার আর তাদেরকে পটিয়ায় পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি। শহর ক্যাম্পাসের সুবিধায় শহরের মধ্যে পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস’া করা হয়। সেকারণে পটিয়ার স’ায়ী ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের শহরের কেন্দ্রে (বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুল এন্ড কলেজ) আনা নেয়ার জন্য বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি বাস দেয়া হয়। সেই বাসে করে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন শহরে পরীক্ষা দিতে আসে এবং পরীক্ষার পর আবার চলে যায়। কিন’ এই বাসটিতে প্রতিদিন পরীক্ষার আগে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র নিয়ে আড্ডা হয়। শিক্ষার্থীরা বাসের মধ্যে প্রশ্নপত্র দেখে পরীক্ষার হলে পরীক্ষা দিতে যায় বলে প্রশাসনের কাছে তথ্য ছিল বলে জানান জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী। সেই তথ্যের আলোকে গতকাল সেই বাসে অভিযান চালান জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ আলী। তিনি বলেন, শ্যামলী পরিবহনের বাসটি গতকাল সাড়ে আটটায় জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের সামনে এসে থামে। তখন থেকে তা আমি নজরদারি শুরু করি। বাসটি থামার কিছুক্ষণ পর সবাই একসাথে জটলা করে পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র মিলাচ্ছিল। পরবর্তীতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে বাসটিতে অভিযান চালিয়ে ৭টি মোবাইল ও ট্যাব এবং উত্তরপত্র লেখা দুটি খাতা জব্দ করি।
তিনি আরো বলেন, ওয়াটসঅ্যাপে আসা এসব প্রশ্ন ও উত্তরপত্র একসাথে দেখছিল শিক্ষার্থীরা। সব প্রশ্নই পদার্থবিজ্ঞান ‘খ’ সেটের নৈর্ব্যত্তিক ও সৃজনশীল। সেই বাসে ৫৬ জন শিক্ষার্থী থাকলেও ২৪ জন ছিল বিজ্ঞানের বাকি শিক্ষার্থীরা ছিল ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের। তাই আমরা ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দিয়েছি।
পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয় আটককৃত শিক্ষার্থীদের :
প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্রসহ আটককৃত শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুল এন্ড কলেজ (বাওয়া) নিয়ে যান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ আলী। এখন পরীক্ষার্থীদের কাছে থাকা প্রশ্নপত্র ও পরীক্ষার হলে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রশ্নপত্রের মধ্যে মিল আছে কিনা তা শনাক্ত করতে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেন্দ্রে পাঠানো হয় এবং তাদের পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। এ বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ আলী বলেন, আমরা তাদের কেন্দ্রের বাইরে থেকে শনাক্ত করেছি। কিন’ তাদের কাছে পাওয়া প্রশ্নপত্রের সাথে পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্র মেলানোর জন্য এই উদ্যোগ নেয়া হয়। আর আটককৃতদের ট্যাব ও মোবাইলে থাকা প্রশ্নপত্রের সাথে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হুবহু মিলে যায়। এমনকি ২৫টি নৈর্ব্যত্তিকের সবগুলোর উত্তরসহ মিলে গেছে।
জেলা প্রশাসকের উপসি’তিতে উন্মুক্ত শুনানি :
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ২৪ শিক্ষার্থী ও বাসের দায়িত্বে থাকা শিক্ষককে এনে হাজির করা হয় বাওয়া স্কুলের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে। সেই কক্ষে জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী, শিক্ষাবোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর শওকত আলম, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তাওয়ারিক আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও উন্নয়ন) হাবিবুর রহমান, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ আলী, কেন্দ্রসচিব আনোয়ারা বেগমের উপসি’তিতে উন্মুক্ত জিজ্ঞাসাবাদ চলে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সকল শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সাদা কাগজে লিখিত জবানবন্দি নেয়া হয়। সেই জবানিতে প্রত্যেক শিক্ষার্থী কীভাবে প্রশ্নপত্র পেয়েছে তা উল্লেখ করেছে।
এই ২৪ জনের মধ্যে নুরুল আলম নামের এক শিক্ষার্থীই ছিল প্রধান হোতা। কোনো একজনকে ৬০০ টাকা বিকাশ করার পর হোয়াইটস অ্যাপে প্রশ্নপত্র এসেছে। সেই প্রশ্নপত্র অন্যদের মোবাইলে ও ট্যাবে শেয়ার করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক নুরুল আলমকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তুমি কীভাবে-কার কাছ থেকে প্রশ্নপত্র পেয়েছো সেই তথ্য দিয়ে আমাদের সহায়তা করলে তোমার শাস্তি কম হবে।’ তখন নুরুল আলম বলে, ‘যে আমাকে প্রশ্নপত্র দিয়েছে তার মোবাইল নম্বর বাসায় রয়েছে।’ তখন জেলা প্রশাসক পুলিশকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এই ছেলের সাথে বাসায় গিয়ে সেই ব্যক্তির মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে তাকে আটক করতে হবে। আমরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূলহোতাদের শনাক্ত করতে চাই। একই সাথে যাদের ট্যাব ও মোবাইলে এবং খাতায় উত্তরপত্র পাওয়া গেছে সেই নয়জন শিক্ষার্থীকে আটক করে জেলে পাঠাতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হবে।’
এসময় বাওয়া স্কুলের অধ্যক্ষ আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘যেসব শিক্ষার্থী মোবাইল কিংবা ট্যাব ব্যবহার করেনি তারা তো নির্দোষ। তাই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া যায়।’
এর জবাবে জেলা প্রশাসক শিক্ষার্থী নুরুল আলমকে উদ্দেশ করে বলেন, তুমি দাঁড়িয়ে বল তো এখানকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে কারা তোমার কাছ থেকে উত্তর নেয়নি বা প্রশ্নপত্রের খোঁজ নেয়নি। তখন নুরুল আলম বলে, আমি বলেছি আর সবাই শুনেছে। কেউ-বা উত্তর লিখেছে।
এসময় আনোয়ারা বেগমকে উদ্দেশ করে জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বাসের ভেতরে যখন প্রশ্নপত্র ও উত্তর এসেছে। তখন তা কেউ দেখেনি তা কি আপনি প্রমাণ করতে পারবেন? আপনি কি সেই বাসে ছিলেন? না দেখে কোনো মন্তব্য করবেন না। বাসে থাকা সব শিক্ষার্থী প্রশ্নের উত্তর জেনেছে। হ্যাঁ, যাদের মোবাইল ও ট্যাব ছিল এবং খাতায় উত্তরপত্র লেখা ছিল তারা প্রধান দোষী। আর যারা প্রশ্নপত্র শুনেছে এবং জেনে গিয়ে পরীক্ষার হলে পরীক্ষা দিয়েছে তারাও দোষী। তাই তাদেরকে ছাড়া যাবে না।’
এসময় জেলা প্রশাসক বাসের মধ্যে থাকা আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষিকা কোহিনুর আকতারকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি তো প্রতিদিন তাদের সাথে আসতেন। সকাল সাড়ে ৮টায় বাসটি জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে আসার পর সবাই নেমে যাওয়ার কথা। কিন’ তারা বাস থেকে না নেমে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র যে দেখতো, তা কি আপনি প্রশাসনের কাউকে বলেছেন? যেহেতু বলেননি তাই আপনিও দোষী। আপনার বিরুদ্ধেও মামলা হবে।
২৪ জনকে বহিষ্কার ও ১০ জন আটক :
১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা ও আটকের বিষয়ে সিদ্ধান্তের পর যাদের কাছে ট্যাব, মোবাইল বা খাতা পাওয়া যায়নি তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বোর্ড কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন জেলা প্রশাসক। রুদ্ধদার বৈঠকের পর জেলা প্রশাসক বলেন, ২৪ জন শিক্ষার্থীদের সবাইকে বহিষ্কার করা হলো। আর এদের মধ্যে ৯ শিক্ষার্থী (৭ জন ছেলে ও দুই জন মেয়ে) ও এক শিক্ষককে কারাগারে পাঠানো হবে। এদের বিরুদ্ধে পাবলিক পরীক্ষা অ্যাক্ট ও আইসিটি আইনে মামলা হবে।
এবিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর শওকত আলমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন আইনগত ব্যবস’া নেবে। আর আমরা তাদেরকে কেন্দ্রসচিবের রিপোর্টের ভিত্তিতে বহিষ্কার করছি।’
কিন’ পরীক্ষাবিধি অনুযায়ী কেন্দ্রের ভেতরের ঘটনার কারণে বহিষ্কার করা যায়, কেন্দ্রের বাইরে পাওয়া প্রশ্নপত্রের ভিত্তিতে কীভাবে বহিষ্কার করবেন, এমন প্রশ্ন করা হলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের অনুমোদনক্রমে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের কলেজ পরিদর্শক সুমন বড়-য়া বলেন, ‘কোনো শিক্ষার্থী যদি তার নিজের জবানিতে কেন্দ্রের বাইরে প্রশ্নপত্র পাওয়ার বা জানার কথা স্বীকার করে এবং কেন্দ্রের প্রশ্নপত্রের সাথে তা মিলে যায় তাহলে সেই ভিত্তিতে বহিষ্কার করা যায়।’
পুলিশলাইন স্কুল কেন্দ্র থেকে আটক বাওয়া স্কুলের ২ শিক্ষার্থী :
বাওয়া স্কুল কেন্দ্রের মতো দামপাড়া পুলিশ লাইন স্কুলে কেন্দ্রেও একই ঘটনা ঘটে। সেখানেও বাওয়া স্কুলের দুই শিক্ষার্থীর (মেয়ে) মোবাইলে পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্র পাওয়া যায়। পরীক্ষার পর জেলা প্রশাসক সেখানে উপসি’ত হয়ে বাওয়া স্কুলের আদলে দুই শিক্ষার্থীকে আটক ও বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত দেন। একই সাথে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরেরও আদেশ দেন।
ফটিকছড়িতে ৭ জন আটক ও বহিষ্কার :
এদিকে আমাদের ফটিকছড়ি প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীর মতো ফটিকছড়ির হেঁয়াকো বনানী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে ৭ পরীক্ষার্থীকে গতকাল সকালে পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে থেকে সাদা পোষাকধারী পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এসময় মোবাইলে প্রশ্নপত্র আদান-প্রদানে ব্যবহৃত ৩টি মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়। আটককৃতরা চিকনছড়া উচ্চ বিদ্যালয়, বাগানবাজার উচ্চ বিদ্যালয় ও গজারিয়া জেবুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। এবিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু হাসনাত মুহাম্মদ শহিদুল হক বলেন, পরীক্ষা শুরুর আগে আটককৃত ৭ পরীক্ষার্থী কেন্দ্রের বাইরে মোবাইল ফোনে প্রশ্নপত্র আদান-প্রদান করার সময় সাদা পোষাকধারী পুলিশ তাদের আটক করে। পরে তাদের বহিষ্কার করা হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এসএসসি পরীক্ষা শুরুর দিন থেকে একধরনের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ফাঁস করা হচ্ছিল প্রশ্নপত্র। গতকাল চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িতদের আটক করার ঘটনা ঘটেছে।