প্রেমিকের আত্মহত্যায় কবিতারাজ্যের দুয়ার খোলা নারী

মাইনুল ইসলাম মানিক

আমার মাংসমজ্জা মিশে যাক তোমার শরীরে / থেমে যাক উদ্বেগ, বুকের কম্পন / তোমাতেই মুদে যাক আমার চক্ষুদ্বয় / আমার হৃদয়, সেও ঘুমিয়ে যাক তোমার ভিতর। (অপ্রসন্ন জননী: গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল)
মেটাসাইকোসিস তত্ত্বকে হৃদয়ে ধারণ করা প্রতিটি মানুষের আপাদমস্তক শিরায়-উপশিরায় প্রবাহিত হয় প্রেমের ধারা। গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল প্রেমে পড়েছিলেন। সতেরো বছর বয়সে। প্রেমের বয়স তিন বছর হতে না হতেই আত্মহত্যা করলেন প্রেমিক যুবক রোমিও উরেতো। মৃত্যুর সময় তার পকেটে মিস্ত্রালের লেখা একটি চিঠি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। রোমিও চলে গেলেন মিস্ত্রালের সমূহ আবেগকে ভূমিকম্পের মতো নাড়া দিয়ে। হৃদয়ে সুপ্ত যে কবিতার আগ্নেয়গিরি, মিস্ত্রাল তার উদগিরণ ঘটালেন ‘মৃত্যুর সনেট’ কাব্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এরপরই তাঁর জীবনে নেয় এক নাটকীয় মোড়। লাতিন আমেরিকা তথা পুরো দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দেন তাঁর কবিতার শৈলী দিয়ে। প্রথম লাতিন কবি হিসেবে নোবেল পুরস্কারের পাশাপাশি অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেন এই কবি ও শিক্ষাবিদ।
মিস্ত্রালের সাথে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের একটি বিষয়ে দারুণ সাদৃশ্য ছিলো। হেমিংওয়ে স্বীকার করেছিলেন, প্রতিটি লেখাকে তিনি বারবার সংশোধন করতেন। তাঁর ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ উপন্যাসের শেষ অংশটি ছাপা হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি মোট ছত্রিশ বার সংশোধন করেছিলেন। মিস্ত্রালও তাঁর লেখার উৎকর্ষতার ব্যাপারে ছিলেন আপোষহীন। লেখা শেষ করার পর সেটিকে তিনি বারবার সংশোধন করতেন। যখন সেটিকে প্রকাশ উপযোগী মনে হতো, শুধুমাত্র তখনই সেটিকে ছাপতে দিতেন। তিনি প্রায় আটশত কবিতা লিখেছিলেন, অথচ জীবদ্দশায় ছাপতে দিয়েছিলেন মাত্র ৩৭৯টি। অবশিষ্ট কবিতাগুলো প্রকাশের যোগ্য মনে না হওয়ায় তিনি সেগুলো ছাপতে দেননি। যদিও তাঁর মৃত্যুর পর সেসব কবিতা অপ্রকাশিত থাকেনি।
কবি যেটুকু প্রত্যক্ষ করেন, ধারণ করেন অন্ত্রে ও তন্ত্রে; কলমের কালিতে অঙ্কন করেন তারই প্রতিরূপ। জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা স’ান করে নেয় তাঁর কবিতার বিষয়বস’তে। প্রকৃতি, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, মাতৃস্নেহ, দুঃখবোধ এবং তা থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে তাঁর কবিতার অনুষঙ্গ। তিনিই প্রথম দেশীয়, আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান প্রভাবের মিশ্রনযুক্ত কবিতাকে বিশ্বের সাথে পরিচিত করে তোলেন। যাদের হাত ধরে লাতিন কবিতা আধুনিকতার যুগে প্রবেশ করে মিস্ত্রাল তাদের অন্যতম। পাবলো নেরুদা কৈশোরে মিস্ত্রালের কবিতা দ্বারা ব্যাপক প্রভাবিত হয়েছিলেন। নেরুদা অবশ্য সেসব অকপটে স্বীকারও করেছিলেন। নেরুদার মতো লাতিন আমেরিকার অনেক আধুনিক কবিরই রোল মডেল ছিলেন মিস্ত্রাল।
কবিতা লেখার অপরাধে সেকেন্ডারী স্কুলে পড়তে দেয়া হয়নি মিস্ত্রালকে। স্কুল কর্তৃপক্ষের ভয় ছিলো, জ্ঞান অর্জনের সাথে সাথে তিনি প্রকৃতিপ্রেমিক হয়ে উঠতে পারেন এবং যীশুর প্রতি তাঁর আস’া হারিয়ে যেতে পারে। ষোল বছর বয়স পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ঘরে তাঁর শিক্ষিকা বোনের কাছে পড়াশোনা করতে হয়েছিলো। অথচ উপেক্ষিত মিস্ত্রালই একদিন চিলির জাতীয় শিক্ষক হয়েছিলেন এবং চিলি, মেক্সিকোসহ অসংখ্য দেশের শিক্ষার পলিসি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। তিনি শৈশবে শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত হয়েছিলেন, পিতৃস্নেহ বঞ্চিত হয়েছিলেন। তাই শিশুদের বঞ্চনায় তিনি মর্মাহত হতেন। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত কাজ করে গেছেন সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্যে, উৎসাহিত করেছেন চারপাশের মানুষকে। তিনি বলতেন,‘শিশুর কল্যানে কিছু করবার উদ্দেশ্যে আগামিকালের জন্য অপেক্ষা করা উচিৎ নয়, আগামিকাল খুব কাছাকাছি নয়, সেটা অনেক দূরে, যা করার তা আজই শুরু করতে হবে, এখনই, এই মুহূর্তেই।’
তরুণ প্রেমিকের মৃত্যুর পর জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতে আর কোনো পুরুষের সাথে সখ্য গড়ে ওঠেনি মিস্ত্রালের। বিয়ে না করলেও লালন করতেন ইয়েন নামের এক পালক শিশুকে। বিশ বছরের ইয়েন একদিন আর্সেনিক খেয়ে আত্মহত্যা করে। এতে খুব ভেঙে পড়েন মিস্ত্রাল। তিনি এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে কখনোই বিশ্বাস করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিরুদ্ধবাদীরা তাঁর সন্তানকে হত্যা করেছেন। ইয়েনের মৃত্যুতে তিনি এতোটা ঘোরের মধ্যে চলে যান যে, তিনি বাস্তবতার পাশাপাশি এক ঘোরের জগতেও বসবাস করতে শুরু করেন। এরপর থেকে তাঁর শাররীক অবস’ার অবনতি হতে থাকে। এর কিছুদিন পর প্যানক্রিয়াসে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে ৬৭ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী ত্যাগ করেন।