প্রেমিকা

জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ

সহকর্মী হিসেবে মিতু ম্যাডামকে খুব বেশি জানি না বললেই চলে। যতটুকু জানি; এ অফিসে তার পদবিটা উচ্চমার্গীয় এবং এই বয়সে এসেও সে দিব্যি একা। তাকে দেখে যতটা না ব্যথিত হই তারচে বেশি অবাক হই। মন ভার থাকে সারাক্ষণ। সময়ে সময়ে অবশ্য মন ভালোও দেখা যায়। ঠিক পূর্ণিমার চাঁদের মতই। তবে সেটা দিনে একবার হতে পারে; সপ্তাহে একবার হতে পারে; মাসে একবার হতে পারে; আর খুব বেশি করে যদি বলি তবে সেটা বছরেও একবার হতে পারে। তার এমন স্বভাব কাকতালীয় বটে।
এই বয়সে এসে একটা নারী স্বামী-সন্তান নিয়ে কি দারুণ সময় কাটাবে, অথচ- মিতু ম্যাডাম তার সম্পূর্ণ বিপরীত। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে; তার কাছে গিয়ে দু’দণ্ড কথা বলি কিন্তু সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারি না। আর এমন শুকনো স্বভাবের; মন খারাপি মানুষের সাথে কথা বলতেও এক ধরনের দ্বিধা কাজ করে মনে; ভয় লাগে; যদি অন্য কিছু হয়ে যায়। তারপরও মিতু ম্যাডামকে জানতে ইচ্ছে করে। তার সময়; ব্যক্তিত্ব; জীবন; কেন এমন ?
এই বয়সের পুরুষ হলে অন্য কথা ছিল কিন্তু সে তো পুরুষ না; একজন নারী। তার সময়কাল এমন হবে কেন ! অবশ্য সৃষ্টিকর্তা; তার সৃষ্টির ভেতর এমন অদ্ভুত কিছু রেখে দেয়; যা দেখে মানুষ শিখতে পারবে; জানতে পারবে; বুঝতে পারবে। মূলত- মানুষকে তার প্রতি অবগত করতেই এমন অভিনব উদাহরণ।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিল আজ। শুক্রবার। বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে পড়েছিলাম কোনো এক বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে। পুরো সপ্তাহের কাজের চাপটাকে যেন একটু হলেও হালকা মনে হয়। একঘেয়ে সময় যেন কাছে না ঘেঁষে। ছুটির দিনের বিশেষ রুটিন আমার। নিজেকে চাপমুক্ত আর স্বতঃস্ফূর্ত রাখতে ভালোবাসি।
বন্ধুদের কাছ থেকে সাময়িকভাবে বিদায় নিয়ে রিকশায় উঠে বসি। ভেতরে এক ধরনের ভালো লাগা চেপে বসেছে। আমি চাই; এই ভালোলাগা; এই ভালো থাকা; দিনমান থাকুক।
হুডতোলা রিকশায় নিজেকে মনে হলো ডানাভাঙা শঙ্খচিল। অনর্থক সব ভাবতে ভাবতে পথ ছুটছি। চোখ বন্ধ করে কিছু একটা ভাবার বৃথা চেষ্টা করলাম; আর কিছু নয়; চিন্তার চর জুড়ে মিতু ম্যাডামের আনাগোনা। সাথে সাথে চোখ খুলেই তাকাতে থাকি চারপাশ। হঠাৎ চোখে পড়ে রঙ্গপুলের এক পাশে মিতু ম্যাডামের আবছায়া। রিকশাওয়ালাকে ওদিকেই যেতে বলি। চোখের দেখা আর মনের দেখা দুটোই বেশ সামঞ্জস্য রেখে গেল। এতো সত্যি সত্যি মিতু ম্যাডাম !
সন্ধ্যার আকাশে মিতু ম্যাডাম উদাস দৃষ্টি ছড়িয়েছে। তার অভিমুখে দাঁড়ানোর সাহস হলো না। বেশ দূরত্ব নিয়ে নির্জীব দাঁড়িয়ে রইলাম। সে যখন আমাকে দেখবে তখন না হয় কথা বলা যাবে; ততক্ষণ নিজেকে নিরব রাখার চেষ্টায় থাকি।
খুব বেশি অপেক্ষা করতে হলো না। ভেবেছিলাম; আমাকে দেখে হয়ত চমকে যাবে কিন্তু না; অবাক; বিস্ময়ের কোনো ছায়া তার মুখ জুড়ে নেই।
‘কি ব্যাপার ইমন সাহেব, আপনি এখানে ?
‘রিকশা নিয়েই যাচ্ছিলাম; আপনাকে দেখে নেমে পড়লাম। কি করছেন এখানে ?
‘রাতের আকাশে তারাদের ছোটাছোটি দেখছিলাম।
‘রাত হয়ে এলো বাসায় ফিরবেন না ?
বাসায় ফেরার কথা শুনে তার ঠোঁটে ভেসে ওঠে কালো বর্ণের হাসি।
‘বাসার কথা বলছেন, হুম; ফিরব; মন যখন চাবে; এখানে দাঁড়িয়ে বেশ লাগছে। আপনি তো বাসায় ফিরছিলেন; গেলেই পারতেন।
‘না; ভাবলাম; একা দাঁড়িয়ে আছেন আপনি, একটু কথা বলে যাই।
‘কি কথা বলবেন ? বলুন।
কি কথা বলব ভেবে পাই না।
‘না; ম্যাডাম, তেমন কিছু না।
‘ও আচ্ছা।
‘আপনি অভয় দিলে একটা কথা জানতে চাই।
‘কি কথা বলুন?
‘অবশ্যই আপনার ব্যক্তিগত কথা।
আমার কথা কিছুটা নাড়িয়ে দিল তাকে। জায়গা বদল করে নেয়।
‘ব্যক্তিগত ! আমার ব্যক্তিগত বলে কিছু নেই ইমন সাহেব। যা আছে; তার সব আপনাদের নিয়েই।
‘বললে; ভীষণ খুশি থাকব আপনার প্রতি।
‘জ্বী বলুন।
‘জীবনের এত সময় পেরিয়েও একা কেন আপনি ? সংসারী হননি কেন ?
‘ইমন সাহেব; আপনি তো আমার কলিজায় হাত দিয়ে ফেলেছেন।
এমন প্রশ্ন শুনে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল মিতু ম্যাডাম।
‘কিছু মনে না করলে; আমি শুনতে চাই আপনার ব্যক্তিক বৈভব।
‘খুব স্বাদ নিয়ে ভালোবেসেছিলাম একজনকে। কোনো এক সন্ধ্যারাতে আমার সব নিয়ে গেছে সে।
‘তার জন্য জীবনের উপর এমন নিখাদ অভিমান; মন থেকে তাড়িয়ে দিলেই পারতেন তাকে ?
‘সে একা চলে গেলে আমার কোনো অভিযোগ ছিল না। আমার রূপ, রস; আমার দেহের ভাঁজ খুলে গোলাপ ফুলের গন্ধ শুকে গেছে। তাই ভেবেছি নিয়েছি; জীবনের বাকি সময়টা একা কাটিয়ে দেব; একদম একা।
মিতু ম্যাডামের কথা শুনে পাথর হয়ে যাওয়ার উপক্রম আমার। নিজেকে সহজ রাখার চেষ্টায় থাকি। তার পুরোনো ক্ষতটাকে আবার জাগিয়ে তুললাম।
নিজেকে অপরাধী মনে হলো কিছুটা।
‘তারপরও তো পারতেন গুছিয়ে নিতে নিজেকে।
‘আর ইচ্ছে হয়নি নিজেকে গোছানোর। তাই সকল কাজের মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে রাখি। যেন কিছু হলেও মুক্তি মেলে।
কথা না বাড়িয়ে বিকারগ্রস্ত মনে খোলা হাইওয়ে রাস্তার মাঝখানে দিয়ে অকস্মাৎ হাঁটতে থাকে মিতু ম্যাডাম।
কোনো জনমানব নেই। কোনো যান নেই। আমি তার চলে যাওয়া দেখি। ফেরাতে পারি না। ল্যাম্পপোস্টের নিয়ন ছেড়ে আঁধারের শরীরের মিলিয়ে যায় সে। আকাশের নিচে দাড়িয়ে আকাশ দেখি। ভাবতে থাকি; জগতে এমন মিতু ম্যাডাম কত আছে; কজন খোঁজ রাখে এদের।