প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার বাংলাদেশ

বিনয় দত্ত

নতুন বছর, নতুন সরকার, নতুন প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা ঘিরেই আমাদের বেঁচে থাকা, নতুন দিনের স্বপ্ন দেখা। ২০১৮ সাল অনেক আলোচিত বছর হলেও ২০১৯ যে আলোচনার বাইরে থেকে যাবে তা বলা যাচ্ছে না। গত বছর আমি মুক্তিযুদ্ধ, নারী ও শিশু অধিকার, মানবাধিকার, তরম্নণদের সমস্যা ও সুবিধা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার সহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে লিখেছিলাম। আশা করি নতুন সরকার সেইসব বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে নজর দেবেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন। ১৮-৩৫ বছরের মধ্যে তরম্নণ ভোটারের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ২০ লাখ। এসব তরম্নণের বড় অংশ, প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ এবারই প্রথম ভোট দিয়েছেন। নতুন সরকার এই বিশাল তরম্নণদের মনসত্মত্ত্ব ও তাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়টি বেশ গুরম্নত্বের সঙ্গে দেখবেন। যদিও সারা দেশে প্রায় ২৭ লাখ তরম্নণ এখনও বেকার। এই বিশাল সংখ্যক তরম্নণ বেকারদের কর্মসংস’ানের বিষয়টি হয়তো বিশেষভাবে জোর দেওয়া হবে বা তাদের কর্মসংস’ানের বিষয়ে নতুন সরকার আলাদাভাবে ভাববেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গবেষণা সংস’া ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’এর তথ্যমতে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে বিদেশি কর্মকর্তারা পারিশ্রমিক হিসেবে ২০০ কোটি ডলারের বেশি নিজেদের দেশে নিয়ে গিয়েছেন। টাকার অংকে হিসাব করলে দাঁড়ায় ১৪ হাজার কোটি টাকার মতো। এই সব বিদেশি কর্মকর্তার বেশিরভাগই চীন দেশের। আমাদের দেশে দড়্গ কর্মশক্তি তৈরি হচ্ছে না দেখে বাইরের দেশ আমাদের টাকা নিয়ে যেতে পারছে। নতুন বছরে সরকার এই বিষয়ে আরও জোর পদড়্গেপ নেবেন আশা করি। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, শস্নীলতাহানি, যৌন নির্যাতনের শিকার, উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যাসহ অনেক মর্মস্পর্শী খবর আমাদের জানতে হয়েছে, শুনতে হয়েছে।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ত্রিশোর্ধ্ব এক নারীকে ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় কারণে চরজব্বার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য স’ানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রম্নহুল আমিন তার দলবল নিয়ে গণধর্ষণ করে। আমি জানি না এই ধর্ষণের বিচার কখনও হবে কিনা।আমাদের পাশের দেশ ভারতে ‘নির্ভয়া’ ধর্ষণের জন্য সুপ্রিম কোর্ট ধর্ষকদের মৃত্যুদ- দেয়। এই একটি ঘটনা যেমন ভারতকে নারী বা শিশু ধর্ষণের ব্যাপারে সতর্ক করে তোলে, তেমনি গোটা বিশ্বের কাছে তা আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা এইরকম কোনও দৃষ্টানেত্মর জায়গায় যেতে পারিনি। হয়তো নতুন বছরে যেতে পারবো আশা করি। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারিতে রাজধানীর মালিবাগে বাসচাপায় নাহিদ পারভীন পলি ও মিম নামের দুইজন তরম্নণী মারা গিয়েছেন। পরিবহন শ্রমিকদের দৌরাত্ম্য সারা বছর ঢাকা সহ গোটা দেশবাসী ভয়ংকর ভোগানিত্মতে ফেলেছে। এখনও পর্যনত্ম কোনও পরিবহন শ্রমিকদের বিচার হয়নি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরের সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পরও সেই পরিবহন শ্রমিককে আদালত থেকে শাসিত্ম দেওয়ার পরে সারা দেশের মানুষ কী ভোগানিত্মতে পড়েছিল তা নিশ্চয় আর কাউকে মনে করিয়ে দিতে হবে না। শুধু সিটিং বাসের দৌরাত্ম্যের কারণে ঢাকার জনগণকে দফায় দফায় ভোগানিত্মতে ফেলেছে এই পরিবহন শ্রমিকরা। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল আমাদের কোমলমতি শিশুরা। যেই পরিবহন শ্রমিক নিয়ে এতো অসনেত্মাষ সেই পরিবহন শ্রমিক সহ গোটা সড়ক, যোগাযোগ ও পরিবহন খাত নিয়ে আশা করি সরকার নতুন কিছু ভাববেন। আমাদের দেশে চিকিৎসা খাত নিয়ে নতুন করে ভাবার আছে। শিশু রাইফার মৃত্যু বা গর্ভবতী পারভীনের নবজাতক সনত্মানের অর্থাভাবে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা আমাদের খুব পীড়িত করেছে। দেশের অলিতে, গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো প্রাইভেট মেডিক্যাল ও ক্লিনিক গড়ে ওঠা কোনও ভালো লড়্গণ নয়। প্রথমত এইসব প্রাইভেট মেডিক্যাল ও ক্লিনিকে কোনও সুনির্দিষ্ট তদারকি করা হয় না। দ্বিতীয়ত স্বাস’্যসেবা দিনকে দিন ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে, এসব বিষয় সরকার নতুন কিছু ভাববেন আশা করছি।
মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পাঠানো নিঃসন্দেহে আনন্দের খবর। তথ্যপ্রযুক্তিতে সার্বিক উন্নয়ন যেমন জরম্নরি তেমনি জরম্নরি গবেষণায় প্রচুর বিনিয়োগের। শুধুমাত্র গবেষণায় অর্থের বরাদ্দ না পেয়ে দেশে মেধাবী শিড়্গকরা বিদেশে পাড়ি জমিয়ে আর দেশে ফিরছেন না। এই বিষয় নিয়ে সরকার নতুন করে ভাববেন আশা করি। বহুল প্রত্যাশিত সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হয়েছে। দস্যুমুক্ত হওয়ার জন্য বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক মোহসীন-উল হাকিমের নিরলস চেষ্টা বৃথা যেতে পারে না। এখন সময় এসেছে সুন্দরবনকে আরো আকর্ষণীয় করে সাজিয়ে তোলার। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রড়্গা করার তথা সুন্দরবনের সার্বিক কল্যাণে নতুন যুগোপযোগী পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার। নতুন সরকার আশা করি এইদিকে সুদৃষ্টি দেবেন।
এই লেখার অর্থ পাঠকদের হতাশায় ফেলে দেওয়া নয়, এই লেখার অর্থ পাঠক সহ সচেতন নাগরিকদের আরও সচেতন করে তোলা। আমাদের দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এই এগিয়ে যাওয়াকে অড়্গুণ্ন রাখতে নতুন সরকারের উচিত গঠনমূলক ও সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা নেওয়া। যাতে করে মুক্তিযুদ্ধের বিপড়্গের শক্তি দেশের এগিয়ে যাওয়াকে রোধ করতে না পারে, যাতে যুদ্ধাপরাধীরা দিনের আলোয় জেগে ওঠে ‘জয় বাংলা’ শেস্নাগানকে কলুষিত করতে না পারে।