প্রাণের টানে রক্তদান

সিফায়াত উল্লাহ

মিরসরাইয়ের মিঠানালা এলাকার গৃহবধূ সায়মা আলম বলেন, ‘আমার প্রথম সন্তান আরিয়ান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল। তখন রক্তের বন্ধনে মিরসরাইয়ের দুজন রক্তদাতা আমার রক্তের প্রয়োজন মিটিয়েছেন। আমার সন্তানের দিকে তাকালে ওদের কথা মনে পড়ে।’
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় জাহিদ পারভেজের মা কিডনী জটিলতায় ভুগছেন দীর্ঘদিন। ডায়ালাইসিসের জন্য রক্ত প্রয়োজন হয় তাঁর। কিন’ ও-নেগেটিভ রক্তের যোগান তুলনামূলক কম। এজন্য তিনি হাটহাজারী সম্মিলিত রক্তদাতা পরিষদের সাহায্য নেন। জাহিদ পারভেজ বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ১০ ব্যাগ রক্ত লেগেছে আমার মায়ের। এসব রক্ত জোগাড় করে দিয়েছে হাটহাজারী সম্মিলিত রক্তদাতা পরিষদ।
সাতকানিয়ার দুই সহোদর তানভির ও তাসমির থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। প্রতি মাসে নিয়মিত রক্ত দিতে হয় তাদের। দীর্ঘদিন তারা থ্যালাসেমিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। এ পর্যন্ত দুই ভাইকে রক্ত দিতে হয়েছে প্রায় শতবার। তাদের মা হাছিনা আকতার বলেন, ‘যখন আমার সন্তানদের মুখের দিকে তাকাই, তখনই মনে পড়ে সাতকানিয়া ডোনারস অ্যাসোসিয়েশনের কথা। ওদের দেওয়া রক্তে আমার সন্তানেরা বার বার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে।’
বোয়ালখালীর বাসিন্দা শিপনও ২০১৬ সাল থেকে কিডনি রোগে ভুগছেন। তাঁর ডায়ালাইসিসের সময় রক্ত প্রয়োজন হলে বোয়ালখালীর কল্যাণে আমরা নামে ডোনার গ্রুপটি রক্ত সংগ্রহ করে দেয়।
চট্টগ্রাম নগরীতে রক্ত সংগ্রহের জন্য ‘সিটিজি ব্লাড ব্যাংক’র বেশ সুনাম রয়েছে। সংগঠনটি ২০১২ সাল থেকে নগরী ছাড়াও চট্টগ্রাম জুড়ে রক্ত সংগ্রহ করে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে শুরু হওয়া সংগঠনটির অনলাইনে সদস্য সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ। এডমিন রয়েছেন ২১ জন।
এ রকম অসংখ্য সংকটগ্রস’ রোগীকে স্বেচ্ছায় রক্ত দেওয়ার ব্রত নিয়ে কাজ করে চলেছেন চট্টগ্রামে অনেকগুলো ডোনার গ্রুপ। এসব সংগঠনের সদস্যদের মানুষ চেনেন ‘রক্তসৈনিক’ হিসেবে। যে কোনো মুহুর্তে রোগীকে রক্ত দিয়ে তাঁরা জায়গা করে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়ে।
আজ ১৪ জুন বৃহস্পতিবার বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। যাঁরা স্বেচ্ছায় ও বিনামূল্যে রক্তদান করে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচাচ্ছেন, এসব রক্ত সৈনিকদের রক্তদানে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ২০০৪ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বিশ্ব স্বাস’্য সংস’ার সদস্য দেশগুলোতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে দিনটি উদ্যাপন করা হয়।
চিকিৎসকরা বলছেন, শারীরিকভাবে সুস’ ১৮ থেকে ৫৭ বছর বয়সের মধ্যে কোনো পুরুষ ও নারী রক্ত দিতে পারবে। এ ক্ষেত্র পুরুষের ওজন থাকতে হবে অন্তত ৪৮ কেজি এবং নারীর ওজন অন্তত ৪৫ কেজি। ১২০ দিন পর পর, অর্থাৎ চার মাস পর পর রক্ত দেওয়া যাবে। তাই রক্তদানে কোনো সমস্যা হয় না। কেননা, একজন মানুষের শরীরে সাড়ে চার থেকে ছয় লিটার রক্ত থাকে। রক্তদান করা হয় সাধারণত ২৫০ থেকে ৪০০ মিলিলিটার। এটি শরীরে থাকা মোট রক্তের মাত্র অল্প ভাগ। স্বাস’্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বছরে আট থেকে নয় লাখ ব্যাগ রক্তের চাহিদা থাকে। রক্ত সংগ্রহ করা হয় ছয় থেকে সাড়ে ছয় লাখ ব্যাগ। বাকি তিন লাখ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন জনগণকে সচেতন করা।

সিটিজি ব্লাড ব্যাংক
১২ ডিসেম্বর ২০১২ সালে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়-য়া ১২ জন তরুণ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে অনলাইনে সদস্য সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করে সংগঠনটি। এডমিন রয়েছেন ২১ ও কার্যকরী সদস্য ৫০ জন।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইমাম হোসেন বলেন, রক্তের চাহিদা মেটানোর দায় থেকে আমরা কাজ করি। নগরীর বাইরেও আমাদের সদস্যরা রক্ত সংগ্রহের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

হাটহাজারী সম্মিলিত রক্তদাতা পরিষদ
২০১৭ সালে উপজেলার প্রায় ১০টি ডোনার গ্রুপের সমন্বয়ে সংগঠনঠির পথচলা শুরু। প্রথম বছর ৭ হাজার ৮৬১ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে সংগঠনটি আলোচিত হয়। বর্তমানে ২৫ জন সদস্য সক্রিয়ভাবে রক্ত সংগ্রহ কাজ করছে। অনলাইনে সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। রক্তদাতা পরিষদ সদস্য খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, হাটহাজারী উপজেলায় প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ ব্যাগ রক্ত আমরা সংগ্রহ করি। এলাকায় কারো রক্ত প্রয়োজন হলে আমাদের কাছে কল আসবেই।

সাতকানিয়া ডোনারস অ্যাসোসিয়েশন
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা মো. নাছির সিটিজি ব্লাড ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। নগরীর পাশাপাশি নিজ এলাকায় রক্তদাতা সংগ্রহের লক্ষে তিনি এটি প্রতিষ্ঠা করেন। মো. নাছির বলেন, সাতকানিয়া-লোহাগড়ায় প্রতিদিন ৫ থেকে ৮ ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন হয়। এলাকায় আরো কিছু ডোনার গ্রুপ রয়েছে। সবাই মিলে চেষ্টা করছি রক্তের চাহিদা পূরণের।

বোয়ালখালীর কল্যাণে আমরা
২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠা হয় সংগঠনটি। যাতায়াতের অসুবিধার কারণে বোয়ালখালীর রক্তের চাহিদা পূরণে হিমশিম খেতে হয় বাসিন্দাদের। এলাকা থেকে শহরে আসতে যানজটে পড়তে হয় প্রতিনিয়ত। এজন্য জরুরি মুহুর্তে রক্তের প্রয়োজন সর্বদা প্রস’ত থাকে সংগঠনটি।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মো. হাছান বলেন, বোয়ালখালীতে অনেকগুলো ডোনার ক্লাব আছে। আমরা চেষ্টা করি নতুন নতুন ডোনার তৈরি করতে। রক্ত সংগ্রহের পাশাপাশি বোয়ালখালীতে গ্রুপ নির্ণয় কাজ করি।
রক্তের বন্ধনে মিরসরাই
মিরসরাই উপজেলায় প্রতিমাসে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ ব্যাগ রক্তে প্রয়োজন হয়। উপজেলায় অনেকগুলো সংগঠনটি থাকলেও সবচেয়ে বেশি পরিচিত এই সংগঠনটি। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ৪৫ জন। অনলাইনে বেশ এক্টিভ সংগঠনটির কার্যক্রম। সেখানে মেম্বারও রয়েছেন ৩০ হাজার। রক্তের বন্ধনে মিরসরাইয়ে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মো. কাউছার বলেন, প্রতি সপ্তাহে উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় রক্তের গ্রুপের নির্ণয়ের মাধ্যমে নতুন ডোনারদের রক্ত দিতে উৎসাহী করা হয়। কারণ নতুন ডোনার না থাকলে রক্ত সংগ্রহ বন্ধ হয়ে যাবে।

কত রক্ত প্রয়োজন চট্টগ্রামে
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ব্লাড সঞ্চালন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক থেকে বছরে প্রায় ৫০ হাজার ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করা হয়। বিভাগের সহকারি রেজিস্ট্রার সুশান্ত প্রসাদ দাশ তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতি মাসে প্রায় দুই থেকে তিন শতাধিক অপারেশন হয় বিভিন্ন রোগীর। হেমাটোলজি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ব্লাড ক্যান্সার আক্রান্তদেরও অনেক রক্তের প্রয়োজন হয়। এছাড়াও বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতেও সমপরিমান অপারেশন হয়। সেই হিসেবে বছরে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন চট্টগ্রামে। বিষয়টি নিশ্চিত করে চমেক হাসপাতালের হেমাটোলজি ওয়ার্ডের প্রধান ডা. গোলাম রব্বানী বলেন, রক্ত ছাড়া একজন মানুষ বাঁচতে পারে না। তাই রক্ত দেয়ার অর্থ হচ্ছে একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা। বর্তমানে এই মহৎ কাজটি করতে অনেক তরুণ এগিয়ে এসেছে। আমি মনে করি, এ ধরণের সংগঠন থাকলে চট্টগ্রামের রক্তের সংকট কখনো তৈরি হবে না।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, রক্ত কেউ বানাতে পারে না। তাই কারো রক্তের প্রয়োজন হলে আরেকজনকে এগিয়ে আসতে হবে। আমার জানামতে চট্টগ্রাম অনেকগুলো ব্লাড ডোনার গ্রুপ রয়েছে। যারা রক্তের অভাব পূরণ করছে। এ ধরণের সংগঠনের পাশে বিত্ত্ববানদের সহায়তার আহবান জানান তিনি।
গড়ে উঠেছে আরও ডোনার ক্লাব
উল্লেখিত সংগঠনের পাশাপাশি চট্টগ্রামের উপজেলা ও থানাগুলোতে অনেকগুলো ডোনার ক্লাব ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে। এসব সংগঠন বেশিরভাগ ফেইসবুক কেন্দ্রিক। কারো রক্তের প্রয়োজন হলেও ফেইসবুকে পোস্ট দিলে সদস্যরা ডোনার খুঁজে বের করে দেন। অন্যদিকে রক্তদাতা যোগাড় করা ছাড়াও বিশেষ দিনগুলোতে এবং ধর্মীয় উৎসবগুলোতে সামাজিক কার্যক্রম করে থাকে সংগঠনগুলো। প্রতিবছর ঈদ-উল-ফিতরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ঈদ সামগ্রী বিতরণ করে। এ ছাড়াও প্রতি বছর রক্তদাতা দিবস, ক্যান্সার দিবসসহ বিশেষ দিনগুলোতে সংগঠনগুলো বিভিন্ন কার্যক্রমের আয়োজন করে থাকে।